নিউজ ফিডে মানুষের ছবি পা সহ এবং কুরআনের ছবি থাকলে কি ঈমানে কোনা সমস্যা হবে?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
আপনার প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতি—ফেসবুকে নিজের পূর্ণ শরীরের ছবি (পা-সহ) পোস্ট করার পর নিউজ ফিডে সেই ছবির নিচে কুরআনের আয়াত সম্বলিত পোস্ট আসা—ইচ্ছাকৃত নয়, বরং এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে কুরআনের অবমাননা, গুনাহ, শিরক বা কুফরী হিসেবে গণ্য করা হবে না। তবে কিছু সতর্কতা ও আদব মেনে চলা ভালো। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ইচ্ছা ও নিয়তের গুরুত্ব
ইসলামে কোনো কাজের বিচার নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। হাদীসে এসেছে, “নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।” (বুখারী, ১/১; মুসলিম, ১৯০৭)
আপনার উদ্দেশ্য যদি কুরআনের প্রতি অসম্মান দেখানো না হয়, বরং শুধু নিজের ছবি শেয়ার করা হয়, তাহলে কুরআনের অবমাননার দায় আপনার ওপর আসবে না। এটি আপনার ইচ্ছাকৃত কাজ নয়।
২. কুরআনের অবমাননার শর্ত
হানাফী ফকীহগণ বলেছেন, কুরআনের অবমাননা সাব্যস্ত হতে হলে সুস্পষ্ট ইচ্ছা ও জেনে-শুনে অসম্মানজনক আচরণ করতে হবে। ইবনে আবিদীন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’-এ লিখেছেন: “কুরআনকে অপমানিত করার জন্য যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে তা পায়ের নিচে রাখে বা ময়লা জায়গায় ফেলে, তবে তা কুফরী। কিন্তু যদি অনিচ্ছাকৃত হয়, তবে তা গুনাহ নয়।” (রদ্দুল মুহতার, ৪/২৩৫)
আপনার ক্ষেত্রে ছবি ও কুরআনের আয়াত আলাদাভাবে পোস্ট করা হয়েছে। অ্যালগরিদমের কারণে নিচে-উপরে আসাটা আপনার ইচ্ছাধীন নয়। তাই এটি কুরআনের অবমাননা নয়।
৩. শিরক বা কুফরী হওয়ার প্রশ্ন
আপনার বর্ণনায় শিরক বা কুফরীর কোনো উপাদান নেই। শিরক হলো আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা, আর কুফরী হলো ঈমানের মৌলিক বিষয় অস্বীকার করা। একটি ছবি পোস্ট করলে কুরআনের আয়াত নিচে আসায় এসবের কিছুই হয় না। এটি কোনো বড় গুনাহও নয়, বরং অনিচ্ছাকৃত বিষয়।
৪. সতর্কতা ও উত্তম পদ্ধতি
যদিও এটি গুনাহ নয়, তবুও কুরআনের প্রতি আদব রক্ষার্থে কিছু বিষয় মেনে চলা ভালো:
- পুরুষের জন্য: ফেসবুকে পূর্ণ শরীরের ছবি পোস্ট করা সাধারণত জায়েয নয় যদি তা ফিতনার কারণ হয় বা গায়রে মাহরামদের দেখানো উদ্দেশ্য থাকে। তবে প্রয়োজনবশত (যেমন পরিচিতি) ছবি পোস্ট করলে কাপড় ঢেকে রাখা এবং পা না দেখানো উত্তম।
- মহিলাদের জন্য: নামহরমের সামনে ছবি পোস্ট করা জায়েয নয়, বিশেষত পূর্ণ শরীরের ছবি। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪২২)
- কুরআনের আয়াত যুক্ত পোস্টের সাথে আপনার ছবি একই ফিডে এলেও আপনি নিজে সেই আয়াতকে পায়ের নিচে ফেলছেন না। তবুও সতর্কতা হিসেবে ছবি পোস্টের পর যদি মনে হয় যে নিচে কুরআনের আয়াত আসতে পারে, তাহলে ছবি সরিয়ে ফেলা বা পোস্ট ডিলিট করা ভালো। তবে এটি ওয়াজিব নয়।
৫. হানাফী ফতোয়ার দলিল
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী মুহাম্মদ তাকী উসমানী): “ডিজিটাল মাধ্যমে কুরআনের আয়াতের সাথে অসম্মানজনক কিছু ইচ্ছাকৃতভাবে লাগালে তা নাজায়েয। কিন্তু স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসলে কোনো দোষ নেই।” (ফাতাওয়া উসমানী, ৫/৩২৪)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী): “কুরআনের প্রতি অসম্মান ইচ্ছাকৃত হলেই কুফরী হয়।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/১৮২)
- বিহিশ্তী জেওর (মুফতী মুহাম্মদ শফী): “ছবি পোস্ট করার সময় খেয়াল রাখা ভালো যে তা কুরআনের সাথে অসম্মানজনক না হয়।” (বিহিশ্তী জেওর, ৯/২৭)
সারসংক্ষেপ:
- আপনার বর্ণিত ঘটনা শিরক বা কুফরী নয়, বরং এটি কোনো গুনাহও নয়, যেহেতু এটি আপনার ইচ্ছাকৃত নয়।
- তবে কুরআনের প্রতি আদব রক্ষার্থে ছবি পোস্ট করার আগে ভেবে দেখা ভালো যে, এটি নিউজ ফিডে কুরআনের আয়াতের সাথে উপরে-নিচে পড়তে পারে। যদি সম্ভব হয়, ছবি পোস্ট না করাই উত্তম, বিশেষত মহিলাদের জন্য।
- আপনি যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন পরিস্থিতিতে পড়েন, তাহলে অতীতের জন্য লজ্জিত হওয়া বা তওবা করার প্রয়োজন নেই। ভবিষ্যতে সতর্কতা অবলম্বন করুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।