নিষিদ্ধ সময়ে ফরজ সালাত
Salah-Prayer · Hanafi
Question
২. যদি সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি সূর্যদয় শুরু হয়েছে তাহলে ফজর সালাত তখনই পড়ব নাকি সূর্যদয় শেষে পড়ব?
৩. যদি এমন সময় হায়েজ থেকে পবিত্র হই যে গোসল শেষে বের হলে সূর্যদয়/সূর্যাস্ত শুরু হয়ে যায় সেই ফজর/আসর সালাত কি আদায় করতে হবে? হলে কখন?
৪. নিষিদ্ধ সময়ে কোন সালাত পড়া যায় কি না? গেলে কোন কোন সালাত?
Answer
প্রশ্নোত্তর: সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত ও নিষিদ্ধ সময়ে সালাত
১. সূর্যদয়/সূর্যাস্ত কতক্ষণ ধরে হয়? নিষিদ্ধ সময় কতক্ষণ?
উত্তর:
হানাফি মাযহাব মতে, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময়কাল এবং নিষিদ্ধ সময়ের পরিমাণ সম্পর্কে বিস্তারিত নিম্নরূপ:
ক. সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময়কাল:
-
সূর্যোদয়: সূর্যের প্রথম কিরণ প্রকাশ থেকে শুরু করে পুরো গোলক দিগন্তের ওপর এসে যাওয়া পর্যন্ত সময়কে সূর্যোদয় বলে। এই সময়কাল সাধারণত ২-৩ মিনিট থেকে শুরু করে ৫-৬ মিনিট পর্যন্ত হতে পারে, যা ঋতু ও ভৌগলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে।
(রদ্দুল মুহতার ১/৩৭০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/৫১) -
সূর্যাস্ত: সূর্যের পুরো গোলক দিগন্তের নিচে চলে যাওয়া পর্যন্ত সময়কে সূর্যাস্ত বলে। এটিও প্রায় একই রকম সময় ধরে হয়।
খ. নিষিদ্ধ সময়ের পরিমাণ:
হানাফি মতে, তিনটি সময়ে নফল সালাত আদায় করা মাকরুহ তাহরিমি (নিষিদ্ধ) এবং ফরজ সালাত আদায় করা জায়েজ নয় (যদি কোনো কারণে কাযা হয়ে থাকে তো সেটাও এই সময়ে পড়া জায়েজ নয়)।
নিষিদ্ধ সময়গুলো হলো:
- সূর্যোদয়ের সময়: সূর্যের প্রথম কিরণ প্রকাশ থেকে পুরো সূর্য উদয় হওয়া পর্যন্ত (প্রায় ২-৫ মিনিট)।
- সূর্য ঠিক মাথার ওপর থাকার সময় (যাওয়ালের সময়): সূর্য মধ্যাকাশে স্থির হয়ে দাঁড়ানোর পর থেকে পশ্চিম দিকে হেলে না পড়া পর্যন্ত (প্রায় ২-৩ মিনিট)।
- সূর্যাস্তের সময়: সূর্যের রং বিবর্ণ হওয়া শুরু থেকে পুরোপুরি অস্ত যাওয়া পর্যন্ত (প্রায় ২-৫ মিনিট)।
মোট নিষিদ্ধ সময়: প্রতিদিন প্রায় ৬-১৫ মিনিট (ভৌগলিক অবস্থানভেদে তারতম্য হয়)।
(সহীহ মুসলিম ১/৫৬৮; রদ্দুল মুহতার ১/৩৭১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/৫১; ফাতাওয়া উসমানি ১/২২৪)
২. যদি সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি সূর্যদয় শুরু হয়েছে তাহলে ফজর সালাত তখনই পড়ব নাকি সূর্যদয় শেষে পড়ব?
উত্তর:
যদি সূর্যোদয় শুরু হয়ে যায় (অর্থাৎ সূর্যের প্রথম কিরণ দেখা যায়), তাহলে ফজরের ফরজ সালাত তখন পড়া জায়েজ নয়। বরং সূর্যোদয় পুরোপুরি শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
কারণ: সূর্যোদয়ের সময় ফরজ সালাত আদায় করা মাকরুহ তাহরিমি এবং নাজায়েজ। সুতরাং সূর্যোদয়ের পর পুরো সূর্য উদিত হলে (যা সাধারণত ২-৫ মিনিটের মধ্যে হয়) তারপর ফজরের কাযা আদায় করতে হবে।
নির্দেশনা:
- ঘুম থেকে উঠে যদি দেখেন সূর্যোদয় শুরু হয়েছে, তাহলে অপেক্ষা করুন। পুরো সূর্য দিগন্তের ওপর উঠে গেলে (অর্থাৎ সূর্যের লালিমা চলে গেলে) ফজরের দুই রাকাত সুন্নত ও দুই রাকাত ফরজ কাযা পড়বেন।
- ফজরের সুন্নতও এই সময়ে পড়া জায়েজ নয়; তাই সুন্নতও পরে পড়ে নেবেন।
(রদ্দুল মুহতার ১/৩৭১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/৫১; সহীহ মুসলিম ১/৫৬৮; ফাতাওয়া উসমানি ১/২২৫)
৩. যদি এমন সময় হায়েজ থেকে পবিত্র হই যে গোসল শেষে বের হলে সূর্যদয়/সূর্যাস্ত শুরু হয়ে যায় সেই ফজর/আসর সালাত কি আদায় করতে হবে? হলে কখন?
উত্তর:
হায়েজ থেকে পবিত্র হওয়ার পর ওই দিনের যে ওয়াক্তের সালাত বাকি থাকে তা আদায় করা ওয়াজিব। তবে যদি পবিত্র হওয়ার পর গোসল করে বের হতে সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত শুরু হয়ে যায়, তাহলে সেক্ষেত্রে নিম্নোক্ত হুকুম:
ক. ফজরের সালাত:
- যদি পবিত্র হওয়ার পর গোসল শেষে সূর্যোদয় শুরু হয়: তাহলে ফজরের ফরজ সালাত সূর্যোদয়ের সময় পড়া জায়েজ নয়। আপনাকে সূর্যোদয় পুরোপুরি শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে (প্রায় ২-৫ মিনিট)। তারপর ফজরের ফরজ দুই রাকাত কাযা পড়বেন।
- সুন্নত: ফজরের সুন্নতও এই সময়ে পড়া জায়েজ নয়; সুন্নতও পরে পড়ে নিন।
খ. আসরের সালাত:
- যদি পবিত্র হওয়ার পর গোসল শেষে সূর্যাস্ত শুরু হয়: তাহলে আসরের ফরজ সালাত সূর্যাস্তের সময় পড়া জায়েজ নয়। আপনাকে সূর্যাস্ত পুরোপুরি শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে (প্রায় ২-৫ মিনিট)। তারপর আসরের চার রাকাত ফরজ কাযা পড়বেন।
- সুন্নত: আসরের আগের চার রাকাত সুন্নত ঘরের মধ্যে পড়া যায়, কিন্তু নিষিদ্ধ সময়ে পড়া যাবে না। তাই সূর্যাস্তের পর সুন্নত আর পড়ার সময় নেই; শুধু ফরজ কাযা পড়বেন।
গুরুত্বপূর্ণ:
- ফজর বা আসরের ওয়াক্তের শেষ প্রান্তে যদি হায়েজ থেকে পবিত্র হন, তাহলে ওই ওয়াক্তের ফরজ সালাত আপনার ওপর ওয়াজিব হবে না যদি ওয়াক্ত শেষ হয়ে যায়। কিন্তু যদি ওয়াক্তের ভেতরে পবিত্র হন এবং সালাতের সময় থাকে (যেমন ফজরের ওয়াক্ত শেষ হয় সূর্যোদয়ের আগে), তাহলে অবশ্যই আদায় করতে হবে।
(রদ্দুল মুহতার ১/২৯৪; আল-হিদায়া ১/৩৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/৪৮)
৪. নিষিদ্ধ সময়ে কোন সালাত পড়া যায় কি না? গেলে কোন কোন সালাত?
উত্তর:
হানাফি মতে, নিষিদ্ধ সময়ে (সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত ও যাওয়াল) কোনো প্রকার নফল সালাত আদায় করা মাকরুহ তাহরিমি (নিষিদ্ধ) এবং জায়েজ নয়। তবে কিছু বিশেষ সালাত এই সময়েও পড়া জায়েজ আছে। নিম্নে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
যে সালাত নিষিদ্ধ সময়ে পড়া যায়:
-
ফরজ ও ওয়াজিব সালাতের কাযা: কোনো ওয়াক্তের ফরজ বা ওয়াজিব সালাত যদি নিষিদ্ধ সময় ছাড়া অন্য সময়ে কাযা করার সুযোগ না থাকে, তাহলে নিষিদ্ধ সময়েও কাযা পড়া জায়েজ নয়। বরং নিষিদ্ধ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরই পড়তে হবে। তবে যদি একান্তই বাধ্য হয়ে পড়তে হয় (যেমন সূর্যাস্তের আগে আসর পড়ার সময় এক মিনিট বাকি থাকে) তাহলে সূর্যাস্তের সময় আসর পড়া জায়েজ হবে না; বরং সূর্যাস্তের পর কাযা পড়তে হবে।
-
জানাজার সালাত: জানাজার সালাত নিষিদ্ধ সময়ে পড়া জায়েজ আছে।
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/৫২; রদ্দুল মুহতার ২/২০৮) -
সিজদায়ে তিলাওয়াত ও সিজদায়ে শুকর: নিষিদ্ধ সময়ে সিজদা করা জায়েজ আছে।
(রদ্দুল মুহতার ২/২০৮) -
ইশরাক সালাত (সূর্যোদয়ের পর): এটি সূর্যোদয়ের সময় পড়া যায় না; বরং সূর্যোদয়ের ১৫-২০ মিনিট পর পড়তে হবে। এটি নিষিদ্ধ সময়ের অন্তর্ভুক্ত নয়।
-
সূর্যগ্রহণের সালাত: গ্রহণের সময় সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের সাথে মিলে গেলে সালাত আদায় করা জায়েজ আছে।
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/৫২)
যে সালাত নিষিদ্ধ সময়ে পড়া যায় না:
- কোনো নফল সালাত (যেমন তাহিয়্যাতুল মাসজিদ, দুখুল, নফল, ইশরাক প্রভৃতি)।
- কোনো ফরজ বা ওয়াজিবের কাযা (ক্ষেত্র বিশেষে তাও জায়েজ নয়)।
(সহীহ বুখারি ১/১২৪; সহীহ মুসলিম ১/৫৬৮; রদ্দুল মুহতার ১/৩৭১; ফাতাওয়া উসমানি ১/২২৫)
সারসংক্ষেপ:
- সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময়কাল সাধারণত ২-৫ মিনিট।
- নিষিদ্ধ সময়ে কেবল জানাজার সালাত, সিজদায়ে তিলাওয়াত, সূর্যগ্রহণের সালাত আদায় করা যায়।
- ফজর বা আসরের ফরজ সালাত সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের সময় পড়া যাবে না; অপেক্ষা করে পরে পড়তে হবে।
- হায়েজ থেকে পবিত্র হওয়ার পরও একই হুকুম প্রযোজ্য।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (১/৩৭০-৩৭১, ১/২৯৪)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৫১-৫২)
- আল-হিদায়া (১/৩৫)
- ফাতাওয়া উসমানি (১/২২৪-২২৫)
- সহীহ মুসলিম (১/৫৬৮)
- সহীহ বুখারি (১/১২৪)