নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা অবস্থায় বছরজুড়ে সঞ্চয়ের কি পৃথক পৃথক বৎসর পূর্ণ হতে হবে? না কি সবগুলোর হিসাব পূর্বের নেসাবের সাথেই হবে?
Zakat and Charity · Hanafi
Question
এখন বছর শেষে যাকাত আদায়ের সময় কি আমার কাছে থাকা মোট সঞ্চিত অর্থের ওপর যাকাত দিতে হবে? নাকি বছরের মধ্যে যে বেতনের টাকা জমা হয়েছে, সেগুলোর ওপর আলাদা আলাদা এক বছর পূর্ণ হওয়ার পরই যাকাত ফরজ হবে?
অনুগ্রহ করে কুরআন, হাদিস ও ফিকহের আলোকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন।
Answer
যাকাতের বছর গণনার নিয়ম: বেতনের সঞ্চয়ের উপর যাকাত
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী বছরের শুরুতে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক ছিলেন এবং তার যাকাতের বছর (হাওল) শুরু হয়েছে। সারা বছর তিনি প্রতি মাসে বেতন পেয়েছেন এবং তার কিছু অংশ সঞ্চয় করেছেন। এখন বছর শেষে তিনি জানতে চান: (১) মোট সঞ্চিত অর্থের উপর যাকাত দিতে হবে, নাকি (২) প্রতিটি বেতনের অংশের জন্য আলাদাভাবে এক বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে?
উত্তর (হানাফী ফিকহ অনুযায়ী)
হানাফী মাযহাবের সুস্পষ্ট মত অনুযায়ী, যদি বছরের শুরুতে আপনার নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তাহলে সারা বছর ধরে যে অতিরিক্ত সম্পদ (যেমন: বেতনের সঞ্চয়) যোগ হয়, তা মূল সম্পদের সাথে একই হাওল (বছর) গণনা করবে। অর্থাৎ, বছর শেষে আপনার কাছে মোট যত সম্পদ থাকবে, তার উপরই যাকাত ফরজ হবে। প্রতিটি নতুন সম্পদের জন্য আলাদাভাবে এক বছর অপেক্ষা করতে হবে না।
কুরআন, হাদীস ও ফিকহের দলীল
১. কুরআনের সাধারণ নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর যারা সোনা-রূপা জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ দিন।" (সূরা আত-তাওবা: ৩৪)
এই আয়াতে সম্পদ জমা করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে এবং যাকাত প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাদীসে এই জমাকৃত সম্পদের উপর মৌলিক শর্ত হলো নেসাব ও হাওল পূর্ণ হওয়া।
২. হাদীসের দলীল
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:
"সেই সম্পদে যাকাত ফরজ নয়, যার উপর এক বছর অতিক্রান্ত হয়নি।" (সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ১৫৭৩; ইবনে মাজাহ, হাদীস: ১৭৯২)
এই হাদীসের অর্থ হলো, কোনো সম্পদ অর্জনের পর তার উপর এক বছর পূর্ণ হলে যাকাত ফরজ হয়। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও তার অনুসারীদের মতে, যার কাছে ইতিমধ্যে নেসাব পরিমাণ সম্পদ আছে, তার কাছে পরবর্তীতে যুক্ত সম্পদের জন্য পৃথক হাওলের প্রয়োজন নেই। বরং, তা মূল সম্পদের হাওলের সঙ্গেই যুক্ত হয়ে যায়।
৩. হানাফী ফিকহের বিস্তারিত ব্যাখ্যা
-
"রদ্দুল মুহতার" (৫/২২৪)-এ ইবনে আবেদীন (রহ.) লিখেছেন:
"যদি কারো কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে এবং বছরের মাঝে আরো সম্পদ আসে, তাহলে তা আগের সম্পদের সঙ্গে যুক্ত হবে এবং আগের সম্পদের হাওলই গণ্য হবে। এতে নতুন সম্পদের জন্য আলাদা হাওলের প্রয়োজন নেই।" -
"ফাতাওয়া হিন্দিয়া" (১/১৭৫)-এ উল্লেখ আছে:
"যার নেসাব পরিমাণ সম্পদ আছে, সে যদি বছরের মাঝে আরও সম্পদ লাভ করে, তবে সে সম্পদ মূল সম্পদের সাথে যুক্ত হবে। বছর শেষে সব সম্পদের উপর যাকাত ফরজ হবে।" -
"বেহেশতী জেওর" (৩/২২)-এ মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তির নেসাব আছে, তার সারা বছরের উপার্জন (চাকরি, ব্যবসা ইত্যাদি) সবই মূল সম্পদের সাথে মিলে যাবে। বছর শেষে যাকাত দিতে হবে মোট জমাকৃত অর্থের উপর।" -
"ইমদাদুল ফাতাওয়া" (২/৩২)-এ মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) লেখেন:
"বেতনভোগী ব্যক্তি যদি বছরের শুরুতে নেসাবের মালিক হয়, তবে সারা বছরের বেতনের জমাকৃত অর্থ তার মূল সম্পদের সাথে যুক্ত হবে। হাওল পূর্ণ হওয়ার পর এই মোট অর্থের উপর যাকাত ওয়াজিব হবে।"
আপনার ক্ষেত্রে প্রয়োগ
- আপনার বছরের শুরুতে নেসাব পরিমাণ সম্পদ ছিল, তাই আপনার যাকাতের বছর শুরু হয়েছে (যেমন: ১লা মে ২০২৪ থেকে হাওল গণনা শুরু)।
- সারা বছর আপনি বেতন পেয়েছেন এবং তার কিছু অংশ সঞ্চয় করেছেন।
- এখন বছর শেষে (যেমন: ৩০শে এপ্রিল ২০২৫) আপনার কাছে মোট যে পরিমাণ নগদ টাকা, ব্যাংক ব্যালান্স, সোনা-রূপা বা অন্যান্য যাকাতযোগ্য সম্পদ থাকবে, তার সবটুকুর উপরই যাকাত ফরজ হবে।
- প্রতিটি মাসের বেতনের জন্য আলাদাভাবে আর এক বছর অপেক্ষা করতে হবে না।
ব্যতিক্রম
যদি আপনার কাছে বছরের শুরুতে নেসাব না থাকে, তাহলে প্রতিটি বেতনের সঞ্চয়ের জন্য পৃথক হাওল গণনা করতে হবে। কিন্তু যেহেতু আপনার কাছে নেসাব ছিল, তাই উপরের নিয়মই প্রযোজ্য।
সারমর্ম
- বছরের শুরুতে নেসাব থাকলে: সারা বছরের যাবতীয় সঞ্চয় মূল সম্পদের সাথে যুক্ত হয় এবং বছর শেষে মোট সম্পদের উপর যাকাত দিতে হবে।
- বছরের মাঝে নেসাব অর্জিত হলে: তখন থেকে নতুন হাওল শুরু হবে এবং সে অনুযায়ী যাকাত গণনা করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের যাকাতের হক আদায় করার তাওফীক দিন। (আমীন)
উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত প্রধান কিতাবসমূহ:
- রদ্দুল মুহতার (৫/২২৪)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/১৭৫)
- বেহেশতী জেওর (৩/২২)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৩২)
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৩১)
- আল-হিদায়া (১/১০০)