মোবাইলে গ্যালারিতে নিজের মানুষের ছবি ও কুরআনের ছবি থাকলে কি ঈমানে কোনা সমস্যা হবে?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
আপনার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। মোবাইলের গ্যালারিতে নিজের ব্যক্তিগত ছবি (ফুল বডি, পা সহ) এবং কুরআনের আয়াতের ছবি একই স্থানে থাকলে তা কুরআনের অসম্মান, গুনাহ, শিরক বা কুফরী হবে কিনা—এ সম্পর্কে নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. শিরক বা কুফরী হওয়ার বিষয়টি
এভাবে ছবি রাখার কারণে শিরক বা কুফরী হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। শিরক হলো আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা বা তাঁর কোনো গুণ অন্য কারো জন্য সাব্যস্ত করা। কুফরী হলো ঈমানের মৌলিক বিষয় অস্বীকার করা। এখানে সেটির কোনো সম্পর্ক নেই। তাই এটা কখনো কুফরী বা শিরক নয়। (সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ১/২৫৪; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/১২৪)
২. কুরআনের অসম্মান (বে-আদবী) হওয়ার বিষয়টি
কুরআনের আয়াতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা ফরজ। ডিজিটাল মাধ্যমেও কুরআনের আয়াতকে সম্মান করা ওয়াজিব। তবে মোবাইলের গ্যালারিতে ব্যক্তিগত ছবির সাথে কুরআনের ছবি থাকা সরাসরি অসম্মান নয়, যতক্ষণ না সেই ছবিগুলো নোংরা, অশ্লীল বা শারীরিকভাবে লজ্জাস্থান প্রকাশকারী হয়।
- যদি ব্যক্তিগত ছবিগুলো শরীয়তসম্মত হয় (যেমন: সাধারণ পোশাকে, অশ্লীল না, এবং মাহরামের সামনে প্রদর্শনযোগ্য), তাহলে গ্যালারিতে থাকায় কোনো গুনাহ নেই। তবে কুরআনের ছবি আলাদা ফোল্ডারে রাখা উত্তম।
- কিন্তু যদি ব্যক্তিগত ছবিতে সতরের খেলাফ কিছু থাকে (যেমন: নারীর পা, হাতের কব্জি, চুল ইত্যাদি অমাহরামের সামনে খোলা অবস্থায় ছবি তোলা), তাহলে সেই ছবি রাখা নিজেই গুনাহ। আর কুরআনের ছবির সাথে সেগুলো থাকলে দ্বিগুণ বে-আদবী হয়। বিশেষ করে কুরআনের ছবি যদি নিচে অবস্থান করে বা অযৌক্তিকভাবে দেখা যায়, তবে তা কুরআনের প্রতি অসম্মানজনক।
ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন: কুরআন মাজীদকে অপবিত্র স্থানে রাখা বা নোংরা বস্তুর সংস্পর্শে আনা হারাম। (রদ্দুল মুহতার, ১/২৫৬) আধুনিক যুগে ডিজিটাল মাধ্যমেও এই বিধান প্রযোজ্য। তাই ব্যক্তিগত ছবি যদি অশালীন বা অযৌক্তিক হয়, তবে কুরআনের ছবির সাথে রাখা কঠোরভাবে অনুচিত।
৩. গুনাহের পরিমাণ
- যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআনের ছবিকে অপমানজনক স্থানে রাখে, তবে তা বড় গুনাহ।
- যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে থাকে, তবে গুনাহ কম। কিন্তু সচেতনভাবে ঠিক না করে রাখলে তা অবহেলা। হাদিসে এসেছে, আল্লাহর কিতাবের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনকারী ব্যক্তি ধ্বংসের মুখে পতিত হতে পারে। (সুনানে তিরমিজী, হাদিস: ২৯২৭)
৪. করণীয় কী?
- মোবাইলে কুরআনের ছবি বা আয়াতসমূহ একটি আলাদা ফোল্ডারে সেভ করুন।
- ব্যক্তিগত ছবিগুলো যেন শরীয়তের সীমার মধ্যে থাকে (পূর্ণ পোশাক, সতর ঢাকা)।
- গ্যালারি থেকে কুরআনের ছবিগুলো যদি কোনো অপবিত্র ছবির সাথে থাকে, তবে দ্রুত সেগুলো আলাদা করে দিন।
- কুরআনের ছবি দেখার সময় যেন পবিত্র অবস্থা (ওযু/গোসল) থাকে, তা নিশ্চিত করা উচিত। অবশ্য শুধু গ্যালারিতে থাকার জন্য পবিত্রতা শর্ত নয়, কিন্তু সম্মানের দৃষ্টিতে উত্তম।
৫. হানাফী কিতাবের উদ্ধৃতি
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/১১১): কুরআন বা তার আয়াতকে অপবিত্র স্থানে রাখা বা অসম্মানজনক কাজে ব্যবহার করা জায়েয নেই। ডিজিটাল মাধ্যমেও একই বিধান দেওয়া যায়।
- ফাতাওয়া উসমানী (১/১২৩): মুবাইল ফোনে কুরআনের সফটওয়্যার বা ছবি রাখলে সেটা সম্মানের সাথে রাখতে হবে, এবং অন্যান্য ছবি (বিশেষত অশ্লীল) থেকে আলাদা করতে হবে।
- রদ্দুল মুহতার (১/২৫৪-২৫৬): কুরআনকে অশুদ্ধ স্থানে রাখা, যেমন টয়লেটের কাছে বা অশ্লীল ছবির সাথে রাখা, হারাম। গুনাহের কাজ।
৬. সারসংক্ষেপ
- এটি শিরক বা কুফরী নয়।
- এটি গুনাহ বা অসম্মান হতে পারে যদি ব্যক্তিগত ছবি অশ্লীল হয় বা কুরআনের ছবিকে নিচু স্থানে রাখা হয়।
- সাধারণ ছবির সাথে যদি কুরআনের ছবি থাকে, তাহলে তেমন গুনাহ না হলেও তা যথাযথ সম্মানের পরিপন্থী। তাই আলাদা ব্যবস্থা করুন।