মেয়েরা কি পরিপূর্ণ পর্দার পোশাক পড়ে প্রাইমারি তে চাকরি করতে পারবে।

Business and Job · Hanafi

Questioner: Sumaya Siddika
Question Asked: 03 Jun 2026, 12:22 AM
Reviewed & Published: 03 Jun 2026, 12:46 AM
Views: 59
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

মেয়েরা কি পরিপূর্ণ পর্দার পোশাক পড়ে প্রাইমারি তে চাকরি করতে পারবে। সেখানে তো পুরুষরাও চাকরি করে। পরিপূর্ণ পর্দার পোশাক পড়ে সেখানে চাকরি করা কি জায়েজ আছে?

Answer

উত্তর (Answer)

সংক্ষিপ্ত উত্তর

পরিপূর্ণ পর্দার পোশাক (অর্থাৎ শরয়ী পর্দা: মুখমণ্ডল, হাত ও পা ব্যতীত সমগ্র শরীর আবৃত, এবং চাদর বা বোরকা দ্বারা মুখ ও হাতও ঢাকা) পড়ে প্রাইমারি স্কুলে চাকরি করা জায়েজ আছে কিনা তা নির্ভর করে কঠোর শর্তের ওপর। সাধারণত, যদি নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ হয়, তবে তা জায়েজ হতে পারে; অন্যথায় এড়িয়ে চলা উচিত:

  1. প্রয়োজনীয়তা: আর্থিক অক্ষমতা।
  2. পুরুষের সাথে মুক্ত মেলামেশা না হওয়া: পুরুষ সহকর্মীদের সাথে অনাবশ্যক দেখা-সাক্ষাৎ, কথাবার্তা ও একান্তে মিলিত হওয়া (খলওয়াত) থেকে বিরত থাকতে হবে।
  3. পর্দার পূর্ণতাঃ মুখমণ্ডল ও হাত (মোজা ও নেকাবসহ) এবং গোটা শরীর ঢাকা থাকতে হবে, যাতে কোনো পুরুষের সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ না পায়।
  4. স্থান ও পরিবেশঃ বিদ্যালয়ে নারী-পুরুষের পৃথক কক্ষ ও অন্যান্য ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে পুরুষ শিক্ষকদের সাথে অনিবার্য মেলামেশা না ঘটে।

হানাফি ফিকহের মতানুসারে, নারীর জন্য বাড়ির বাইরে কাজ করা মূলত জায়েজ নয়, তবে প্রয়োজন বা জরুরি অবস্থায় কিছু শর্তে অনুমতি আছে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, নারীরা প্রয়োজনে বের হতে পারেন, তবে পর্দা ও শালীনতা বজায় রাখা আবশ্যক (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭৫)। মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন, নারীদের জন্য শিক্ষকতা শুধু মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্যই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত; ছেলে শিক্ষার্থী বা পুরুষ সহকর্মীদের সাথে মেলামেশা জায়েজ নয় (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৫২৫)।

সারকথা: পরিপূর্ণ পর্দার পোশাক (যাতে মুখ ও হাতও ঢাকা) পরিধান করেও যদি পুরুষ সহকর্মীদের সাথে অনিবার্য মেলামেশা (যেমন একই কক্ষে কাজ, দৈনন্দিন কথা বলা, একান্তে সাক্ষাৎ) না হয়, এবং কাজটি সত্যিকার অর্থে প্রয়োজনীয় হয়, তবে তা জায়েজ হতে পারে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ প্রাইমারি স্কুলে নারী-পুরুষ একসাথে কাজ করেন এবং অনিবার্যভাবে মেলামেশা হয়, তাই সাধারণত এটিকে উলামায়ে কেরাম নিরুৎসাহিত করেন এবং পরিহার করাকে উত্তম বলেন।


বিস্তারিত আলোচনা ও দলিল

১. নারীর কাজের মূলনীতি:

  • কোরআনে বলা হয়েছে, "তোমরা তোমাদের ঘরে অবস্থান করো এবং জাহেলিয়াতের যুগের মতো প্রদর্শন করো না" (সূরা আহযাব: ৩৩)। ইবনে আব্বাস (রা.)-এর তাফসীর অনুযায়ী, এ আয়াত নারীদের বাড়ির বাইরে অপ্রয়োজনে বের হওয়া থেকে নিষেধ করে (মাআরিফুল কোরআন, ৭/১৫৭)।
  • হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "মহিলারা পুরুষদের নিকটবর্তী স্থানে নামায পড়লে তা তাদের জন্য উত্তম" (আবু দাউদ, ৫৭০)। অর্থাৎ তারা যত সম্ভব পুরুষের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকবেন।

২. পর্দার শর্ত:

  • হানাফি মাজহাব অনুসারে, নারীর জন্য অ-মাহরাম পুরুষের সামনে পূর্ণ পর্দা করা ফরজ। এর অন্তর্ভুক্ত: পুরো শরীর (মুখ ও হাতসহ) ঢাকা, কারণ মুখ ও হাতও ফেতনার উৎস (রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৭)।
  • ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবু ইউসুফের মতে, মুখমণ্ডল ও হাতের পাতা ঢাকা ওয়াজিব নয়; তবে ফেতনার সময় বা যেখানে পুরুষের দৃষ্টির ভয় থাকে, তখন ঢাকা আবশ্যক (রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৫)। তবে বর্তমান যুগে ফেতনা ব্যাপক হওয়ায় অধিকাংশ হানাফি আলেম মুখ ঢাকাকে ফরজ বা ওয়াজিব মনে করেন (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২২৪)।

৩. প্রাইমারি স্কুলে নারী-পুরুষের সহাবস্থান:

  • যদি বিদ্যালয়ে পুরুষ শিক্ষক বা কর্মচারী থাকে এবং নারী শিক্ষিকার সাথে তাদের অনিবার্য মেলামেশা হয় (যেমন একে অপরকে দেখা, কথা বলা, একই কক্ষে বসা), তবে তা পর্দার পরিপন্থী এবং জায়েজ নয়।
  • শুধু পর্দার পোশাক (বোরকা-নেকাব) পড়লেই যথেষ্ট নয়; বরং পুরুষের সাথে অনাবশ্যক কথা, দেখা, স্পর্শ ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে।
  • যদি বিদ্যালয়ে নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক বিভাগ বা শিফট থাকে, এবং নারী শিক্ষিকা শুধু মেয়ে ছাত্রীদের পড়ান এবং পুরুষ সহকর্মীদের সাথে কোনো প্রকার মেলামেশা না হয়, তবে তা জায়েজ হতে পারে।

৪. প্রয়োজনীয়তার শর্ত:

  • হানাফি ফিকহে জরুরি অবস্থায় নারীর বের হওয়ার অনুমতি আছে। যেমন: নিজের বা পরিবারের ভরণপোষণের জন্য কাজ করা, বা সমাজের বিশেষ প্রয়োজনে (যেমন নারী ডাক্তার, নারী শিক্ষিকার অভাবে মেয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা বিপন্ন হওয়া)।
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩৪৫) ও রদ্দুল মুহতার (৬/৩৭০)-এ বলা হয়েছে, নারীর জন্য প্রয়োজনে বের হওয়া জায়েজ, তবে শালীনতা ও পর্দা বজায় রাখতে হবে।
  • মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন, নারী শিক্ষকতা শুধু মেয়ে ছাত্রীদের জন্য এবং পুরুষ সহকর্মীদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক পরিবেশে করলে জায়েজ; অন্যথায় নয় (আপ কে মাসাইল, ২/২০০)।

৫. চূড়ান্ত বিধান:

  • যদি শর্ত পূরণ হয় (পরিপূর্ণ পর্দা, পুরুষ সহকর্মীদের সাথে কোনো অনিবার্য মেলামেশা নেই, কাজটি প্রয়োজনীয়), তবে তা জায়েজ।
  • বাস্তবক্ষেত্রে অধিকাংশ প্রাইমারি স্কুলে এই শর্তগুলো পূরণ করা কঠিন। তাই উলামায়ে কেরাম সাধারণত নারীদের প্রাইমারি স্কুলে (যেখানে পুরুষ সহকর্মী রয়েছে) চাকরি করতে নিরুৎসাহিত করেন।
  • উত্তম পন্থা হলো: নারীদের জন্য শুধু মেয়েদের স্কুল বা মাদরাসায় চাকরি করা, যেখানে পুরুষের কোনোরূপ উপস্থিতি নেই।

উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত গ্রন্থ:

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী)
  • ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকি উসমানী)
  • মাআরিফুল কোরআন (মুফতি শফী)
  • বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী)
  • আপ কে মাসাইল (মুফতি মুহাম্মদ শফী)

আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.