মেডিকেল ছাত্রীর দ্বিধা: পিতামাতার আনুগত্য না দ্বীন? পুরুষ রোগীর শরীর স্পর্শের হুকুম কী?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Questioner: Binte Tahsin
Question Asked: 04 Jun 2026, 09:51 AM
Reviewed & Published: 04 Jun 2026, 10:10 AM
Views: 68
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম
আমি একটা সরকারী মেডিকেল কলেজের ৩য় বর্ষের ছাত্রী। প্রথম থেকেই এই পড়াশুনা বাদ দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি। কিন্তু এখন ওই পরিবেশ আমার জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছে।মা কে বলেছি বাবাকে বলার সাহস হয়নি।রাজি না হওয়ায় কয়েকদিন মায়ের সাথে কথা বলিনি, খাবার ঠিকমতো খায়নি।এতেই মনে হচ্ছে হিতের বিপরীত হচ্ছে। সবসময় বকা দিতে থাকে। আমার উপর খুব বিরক্ত।আর বলে এটা কি খুব ভালো বাবা মায়ের কথা না শুনা, অবাধ্য হওয়া। এটা কি আখলাক? আল্লাহ কি এসব দেখেছেন না। আমার আচরণে অসন্তুষ্ট মা। তাই ভয় ও হচ্ছে খুব।আমি নিজেও এমন চায় না সবসময় চায় তাদের অনুগত হতে যাতে তারা খুশি থাকেন। আবার কি করা উচিত তাও বুঝতে পারছি না।

আমাকে বলেছে এমবিবিএস কমপ্লিট করতেই হবে।এরপর যদি না করো কিছু বলব না । কিন্তু পরে যদি কিছু না করি তাহলে এখন পড়া চালিয়ে যাওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত?

আরেকটা প্রশ্ন এক্সামিনেশনের জন্য,হিস্টোরি নেওয়ার জন্য পুরুষের গায়ে হাত দেওয়া, ওয়ার্ড ফাইনালে হার্নিয়া এজাতীয় যে বিষয়গুলো আছে সেগুলোর অনুমোদন কি ইসলাম দেয়? স্টুডেন্ট থাকাকালীন অবস্থায় তো অ্যাভয়েড করা যাবে না বলা যাবে না করব না কারণ পাশ হবে না ।
আমার কি করা উচিত জানাবেন দয়া করে। খুবই মেন্টাল প্রেশারে আছি সবকিছু নিয়েই ভয় হচ্ছে।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة

প্রথমেই আপনার মনের কষ্ট ও দ্বিধাদ্বন্দ্বের জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত। আপনি একজন দ্বীনদার মেয়ে, যে পিতামাতার আনুগত্য ও ইসলামী বিধান মেনে চলতে চান, কিন্তু বাস্তবতার চাপে পড়েছেন—এমন অবস্থায় আল্লাহ তাআলা আপনার ধৈর্য ও সতর্কতার জন্য অবশ্যই সওয়াব দেবেন। আমরা দলীলভিত্তিক উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।


১. পিতামাতার আনুগত্য ও আপনার করণীয়

কোরআন ও হাদিসে পিতামাতার আনুগত্যের গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ বলেন:

“আর তোমার রব আদেশ করেছেন যে, তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।” (সূরা বনী ইসরাঈল, ২৩)

তবে এই আনুগত্য শর্তসাপেক্ষ—তা কেবল জায়েজ ও ভালো কাজের ক্ষেত্রে। যদি পিতামাতা কোনো হারাম কাজের আদেশ দেন, তবে তাদের কথা মানা জায়েজ নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“আল্লাহর নাফরমানীতে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য নেই।” (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত)

এখন আপনার ক্ষেত্রে, এমবিবিএস সম্পন্ন করা নিজে যদি কোনো হারাম কাজ না হয়, তাহলে পিতামাতার ইচ্ছা মানা আপনার জন্য কর্তব্য। কিন্তু আপনি যদি মনে করেন যে, এই পড়াশোনা চলাকালীন আপনাকে এমন কাজ করতে বাধ্য হতে হচ্ছে যা স্পষ্ট হারাম (যেমন, বেগানা পুরুষের গায়ে হাত দেওয়া ইত্যাদি), তাহলে পিতামাতার কথা না মানার অবকাশ আছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: আপনি কি নিশ্চিত যে এই পড়াশোনা সম্পূর্ণরূপে হারাম কাজ ছাড়া শেষ করা সম্ভব নয়? অনেক ক্ষেত্রে কিছু হারাম কাজ এড়িয়ে চলার উপায় থাকে (যেমন, ইমাম মহিলা হলে বা বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করলে), আবার কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা এত বেশি যে, তা এড়ানো অসম্ভব হয়।

আপনার করণীয়:

  • পিতামাতার সাথে নরমভাবে, যুক্তি ও দ্বীনি দলীল দিয়ে কথা বলুন। বলুন আপনি তাদের অসন্তুষ্ট করতে চান না, কিন্তু আল্লাহর হুকুমও পালন করতে চান। আপনার মা বর্তমানে খুব বিরক্ত, তাই কিছুদিন সময় দিন—তিনি যেন আপনার অবস্থা বুঝতে পারেন। আপনার খাবার না খাওয়া, কথা না বলা ঠিক হয়নি; এতে করে তারা আরও কটু কথা বলছেন, যা আপনার মানসিক চাপ বাড়িয়েছে। ধৈর্য ও মিষ্টভাষায় তাদের বোঝানোর চেষ্টা করুন।
  • আপনি যদি সত্যিই মনে করেন এই পথে আপনার ঈমান ও দ্বীন বিপন্ন হবে, তাহলে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে দৃঢ় থাকুন। কিন্তু পিতামাতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন না; বরং তাদের সন্তুষ্টির জন্যই এমন কোনো পথ বেছে নিন যা দ্বীনি নিয়ম মেনে চলে (যেমন, স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হওয়া, বা পরবর্তীতে শুধু নারী রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া)।

২. পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া বা ছেড়ে দেওয়া

আপনার মা বলেছেন: “এমবিবিএস কমপ্লিট করতেই হবে, তারপর যা ইচ্ছে করো।” এটি একটি শর্ত। কিন্তু আপনি যদি এখনই পড়া বাদ দেন, তাহলে পিতামাতার সাথে সম্পর্ক আরও খারাপ হবে, যা আপনার জন্য আরও কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, যদি আপনি বাধ্য হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান, তবে পরবর্তীতে এই ডিগ্রি ব্যবহার না করে আপনার ইচ্ছামতো কাজ করতে পারবেন। প্রশ্ন হলো এই পথে চলতে গিয়ে বর্তমানে আপনাকে কী পরিমাণ হারাম কাজ করতে হচ্ছে? যদি তা খুব বেশি হয় এবং আপনার ঈমানের জন্য ক্ষতিকর হয়, তাহলে এখনই পরিবর্তন আনা উচিত।

সমঝোতার পথ: আপনি মাকে বোঝাতে পারেন যে, আপনি এমবিবিএস শেষ করবেন, কিন্তু ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় পুরুষ রোগীদের হাত দেওয়ার বিষয়টি আপনার ধর্মে নিষিদ্ধ। তাই আপনি চাইলে:

  • ইমাম মহিলা ক্লিনিকে বা মহিলা ওয়ার্ডে কাজ করার সুযোগ নিতে পারেন।
  • পরীক্ষার সময় বিকল্প পদ্ধতি (যেমন, মডেল, বা নারী পেশেন্ট) ব্যবহারের অনুমতি চাইতে পারেন। অনেক মেডিকেল কলেজে এখন ‘হাই-ফিডেলিটি সিমুলেটর’ বা ‘প্র্যাকটিস মডেল’ থাকে, যা দিয়ে হার্নিয়া ইত্যাদি পরীক্ষা করা যায়।
  • বাড়তি চেষ্টা করুন যাতে আপনাকে পুরুষ রোগীদের স্পর্শ করতে না হয়।

ইস্তিখারা করুন: আল্লাহর কাছে সাহায্য চান, তিনিই ভালো জানেন আপনার জন্য কোন পথ কল্যাণকর। সালাতুল ইস্তিখারা পড়ার পর যেদিকে আপনার মন শান্তি পায়, সেটাই করুন।


৩. পুরুষ রোগীর গায়ে হাত দেওয়া (হিস্ট্রি নেওয়া, হার্নিয়া পরীক্ষা ইত্যাদি)

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফিকহি মাসআলা।

হানাফি মতে: কোন বেগানা (মাহরাম নয়) নারী-পুরুষের পরস্পরকে স্পর্শ করা, বিশেষ করে অঙ্গপ্রত্যঙ্গে হাত লাগানো, শরীয়তে নাজায়েজ ও হারাম।

সুতরাং আপনি কোনোভাবেই কোনো পুরুষ রোগীর শরীরে হাত দিতে পারবেননা। এটি নাজায়েজ।

৩. মানসিক চাপ ও ভয় কাটানোর উপায়

আপনি লিখেছেন, “সবকিছু নিয়েই ভয় হচ্ছে”। এটি খুবই স্বাভাবিক, কারণ আপনি ধর্ম ও পিতামাতার মাঝে দ্বন্দ্বে আছেন। তবে আল্লাহ তাআলা বলেন:

“আল্লাহ কারও ওপর তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না।” (সূরা বাকারা, ২৮৬)

আপনার ভয়টা কাটানোর জন্য করণীয়:

  • নিয়মিত সালাত ও দোয়া করুন। বিশেষ করে সিজদায় দীর্ঘ সময় কাঁদুন, আল্লাহর কাছে সঠিক পথ দেখাতে বলুন।
  • সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (২৮৫-২৮৬) ও আয়াতুল কুরসি বেশি পড়ুন। এতে মানসিক শান্তি আসে।
  • ইস্তিখারা সালাত পড়ুন। সাত দিন পর যেদিকে আপনার মন শান্তি পায়, সেটাই করুন। আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তার অন্তরে সঠিক পথের জন্য সুবিধা সৃষ্টি করেন।
  • পিতামাতার সাথে অতিরিক্ত বকা-ঝকা এড়িয়ে চলুন। তাদেরও বুঝতে দিন যে আপনি তাদের অবাধ্য হতে চান না, কিন্তু দ্বীনি কারণে কিছু কাজ করতে পারেন না।

সংক্ষিপ্ত পরামর্শ

  1. পিতামাতার সাথে কথা বলুন: মায়ের সাথে আরও নরমভাবে বসুন। তাকে বুঝান যে আপনি তাদের খুশি করতে চান, কিন্তু আল্লাহর অবাধ্যতা আপনাকে করতে দেবেন না। একান্ত যদি তারা না মানেন, তবে আপনি সালাত ও ইস্তিখারা করে নিজের সিদ্ধান্ত নিন। মনে রাখবেন, আল্লাহকে ভয় করা পিতামাতার আনুগত্যের থেকেও বড় ফরজ। (সুরা লুকমান, ৩১:১৫)

  2. পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া: আপনি যদি মনে করেন পুরো পথে হারাম কাজ খুব বেশি না, এবং শেষ করে আপনি নারী রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত হতে পারবেন, তাহলে বর্তমানে কিছু অনিবার্য পরিস্থিতি সহ্য করে পড়া চালিয়ে যাওয়া যেতে পারে। কিন্তু যদি প্রত্যেকদিনই আপনার দ্বীন নষ্ট হয়, তাহলে ছেড়ে দেওয়াই উত্তম। আল্লাহ বিকল্প ব্যবস্থা দেবেন।

সবশেষে: আপনার অবস্থা দেখে বোঝা যাচ্ছে আপনি একজন দ্বীনদার ও ভদ্র মেয়ে। আল্লাহ তাআলা আপনার ধৈর্য ও আপ্রাণ চেষ্টার মূল্য দেবেন। নিশ্চয়ই “যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন, এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা তার ধারণায় আসে না।” (সুরা তালাক, ২-৩)

আল্লাহ আপনার অবস্থা সহজ করুন এবং সঠিক পথ দেখান। আমিন।

প্রয়োজনীয় গ্রন্থসমূহ:

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন), ৬/৩৭২
  • ফতোয়ায়ে উসমানী (মুফতি তাকি উসমানী), ২/৪৫০-৪৫২
  • ইমদাদুল ফতোয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী), ৪/২৫০-২৫৫
  • বেহেশতী জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী), অংশ ৬, অধ্যায় ১১
  • ফতোয়ায়ে আলমগীরী (হিন্দিয়া), ৫/৩৫৪

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.