মাজহাবের কোনো নিয়ম নিজস্ব বিবেচনার কারণে প্রত্যাখ্যান করা জায়েজ?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী শরী‘আতে মাজহাব অনুসরণ করার মূল উদ্দেশ্য হলো কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনা অনুযায়ী আমল করা, সহজীকরণ বা নিজস্ব বিবেচনার ভিত্তিতে ইচ্ছামতো নিয়ম বাছাই করা নয়। হানাফী মাজহাবের অনুসারীদের জন্য কিছু মৌলিক নীতি রয়েছে যা মেনে চলা আবশ্যক। নিচে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো:
১. মাজহাব অনুসরণের গুরুত্ব ও শর্তাবলী
ইসলামে সাধারণ মুসলিমের জন্য কোনো নির্ভরযোগ্য মাজহাবের অনুসরণ করা জরুরি। কারণ কুরআন-হাদীসের সঠিক ব্যাখ্যা ও ইজতিহাদ করার যোগ্যতা শুধু বিশেষজ্ঞ আলেমদের রয়েছে। ইমাম আবূ হানীফা (রহ.)-এর মতে, তার অনুসারীদের জন্য তার ফতোয়া মেনে চলা আবশ্যক, তবে যদি কেউ নিজে ইজতিহাদ করতে সক্ষম হয়, তবে সে নিজস্ব দলীল অনুযায়ী আমল করতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য নিজস্ব বিবেচনার ভিত্তিতে মাজহাবের নিয়ম প্রত্যাখ্যান করা জায়েজ নয়।
(আল-হিদায়া, ১/৪৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১১)
২. নিজস্ব বিবেচনায় মাজহাবের নিয়ম প্রত্যাখ্যানের বিধান
যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট মাজহাব (যেমন হানাফী) অনুসরণ করেন, কিন্তু কিছু বিষয়ে তার নিজস্ব বিবেচনায় তার মাজহাবের মতামত পছন্দ না হয়, তাহলে তিনি সরাসরি সেই নিয়ম প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন না। কারণ মাজহাবের নিয়মগুলো ফকীহদের ইজতিহাদের ফল। সাধারণ মানুষের জন্য নিজস্ব যুক্তি বা পছন্দের ভিত্তিতে ইজতিহাদ করা হারাম। যদি তিনি মনে করেন যে তার মাজহাবের কোনো নির্দিষ্ট মত দলীলের ভিত্তিতে দুর্বল, তাহলে তিনি সেই বিষয়ে অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য মাজহাবের মত গ্রহণ করতে পারেন, তবে শর্ত হলো তা সহজীকরণ বা সুবিধাভোগের উদ্দেশ্যে নয় বরং দলীলের ভিত্তিতে হতে হবে।
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/১৪০; ফাতাওয়া উসমানী, ১/২২)
৩. তালফীক (মাজহাব মিশ্রণ) এর নীতি
হানাফী ফিকহে তালফীক (দুই মাজহাবের মধ্যে সমন্বয়) তখনই জায়েজ বলে গণ্য হয় যখন তা দলীলের ভিত্তিতে হয় এবং সুবিধা গ্রহণের উদ্দেশ্যে না হয়। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন, “তালফীক শুধুমাত্র তখনই জায়েজ যখন তা ইজতিহাদী দুর্বলতার কারণে হয়, লোভ-লালসার কারণে নয়।”
(রদ্দুল মুহতার, ১/৮৫)
৪. নিজস্ব বিবেচনার সীমাবদ্ধতা
প্রশ্নকারী উল্লেখ করেছেন যে তিনি সহজীকরণ বা সুবিধাভোগের জন্য মাজহাবের নিয়ম প্রত্যাখ্যান করছেন না, বরং তার নিজস্ব বিবেচনায় সেটি ইচ্ছা না হওয়ার কারণে এড়িয়ে যাচ্ছেন। ইসলামী শরী‘আতে নিজস্ব বিবেচনাকে (রায়) প্রাধান্য দেওয়া তখনই জায়েজ যখন তা কুরআন-হাদীসের দলীল দ্বারা সমর্থিত হয় এবং ইমামদের ইজতিহাদের বিপরীতে চলে না। কারণ ইমামদের ইজতিহাদ কুরআন-হাদীসের গভীর জ্ঞানের আলোকে গঠিত। সাধারণ মুসলিমের জন্য নিজস্ব বিবেচনা সঙ্গত কারণ হতে পারে না। তাই এ ধরনে কোনো নিয়ম প্রত্যাখ্যান করা জায়েজ নয়।
(শারহু মা‘আনিল আছার, ২/২৪৫; উসুলুশ শাশী, ১/৬৫)
৫. করণীয়
- যদি কোনো মাসআলায় সন্দেহ হয়, তাহলে হানাফী মাজহাবের কোনো নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে গিয়ে মাসআলা জিজ্ঞাসা করুন এবং তার ফতোয়া অনুযায়ী আমল করুন।
- নিজস্ব বিবেচনার ভিত্তিতে মাজহাবের নিয়ম বাদ দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। কারণ এটি ফিকহের মৌলিক নীতির পরিপন্থী এবং অমূলক বিদ‘আতের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
- যদি কোনো বিশেষ মাসআলায় অন্য মাজহাবের দলীলকে বেশি শক্তিশালী মনে করেন, তবে সেই মাজহাবের আলেমের ফতোয়া অনুযায়ী আমল করতে পারেন, তবে এজন্য একজন আলেমের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
উপসংহার:
মাজহাবের কোনো নিয়ম নিজস্ব বিবেচনার কারণে প্রত্যাখ্যান করা জায়েজ নয়। বরং নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে গিয়ে সমস্যার সমাধান করতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক পথে চলার তাওফীক দান করুন।
সূত্র:
- কুরআন: “তোমরা যদি না জান, তবে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর।” (সূরা নাহল: ৪৩)
- হাদীস: “যে ব্যক্তি নিজের রায়ের ভিত্তিতে কুরআন ও হাদীস ব্যাখ্যা করে, সে জাহান্নামে যাবে।” (আবু দাউদ, হা. ৪৬০০)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১১
- রদ্দুল মুহতার, ১/৮৫
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/১৪০
- ফাতাওয়া উসমানী, ১/২২
আল্লাহু আলাম।
(প্রশ্নকারীকে পরামর্শ):
আপনার নিজস্ব বিবেচনায় কোনো বিষয় না মানার আগে একজন হানাফী আলেমের সঙ্গে পরামর্শ করুন। আপনার সন্দেহ দূর হবে এবং সঠিক পথে চলতে পারবেন, ইনশাআল্লাহ।