ঝগড়া করে স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাপের বাড়ি গেলে কি তালাক হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
এরই প্রেক্ষিতে তার দুদিন পরেই আমাকে তারা ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেয়।
আমার প্রশ্ন সেদিন ওমন পরিস্থিতিতে স্বামীর বাড়ি থেকে বাপের বাড়ি চলে আসাটা আল্লাহর দেওয়া সীমারেখা লঙ্ঘন করেছি কি না? তালাকের জন্য কি আমিই দায়ী?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة
প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করে নেওয়া জরুরি: ইসলামী শরীয়তে স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি ব্যতীত (অবৈধ সম্পর্ক বা জোরপূর্বক নির্যাতনের মতো চরম পরিস্থিতি ছাড়া) নিজ ইচ্ছায় বাড়ি থেকে বের হওয়া বা পিতৃগৃহে চলে যাওয়া নাপসন্দ (নিষিদ্ধ না হলেও মাকরূহ) এবং এটি দাম্পত্য জীবনে নুশূজ (অবাধ্যতা) এর শামিল হতে পারে। তবে আপনার বর্ণিত পরিস্থিতিতে কিছু বিবেচ্য বিষয় রয়েছে, যা নিচে উল্লেখ করা হলো।
১. স্বামীর অনুমতি ও বাপের বাড়ি যাওয়ার হুকুম
আপনার বিবরণ অনুযায়ী:
- আপনি স্বামীকে অনুরোধ করেছিলেন বাপের বাড়ি রেখে আসতে।
- স্বামী বলেন: “তুমি যাচ্ছো, আমার তাতে অনুমতি নাই” (অর্থাৎ তিনি স্পষ্টভাবে অনুমতি দেননি, কিন্তু বাধা দেননি)।
- তিনি আপনার চলে যাওয়ার সময় দাঁড়িয়েছিলেন, থামানোর বা আটকানোর কোনো চেষ্টা করেননি।
- আপনি মানসিক বিপর্যয় ও শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনের কারণে চলে আসেন।
হানাফি ফিকহের নীতিমালা:
(ক) স্বামী যদি স্ত্রীকে বাধা না দিয়ে নীরব থাকেন বা থামানোর চেষ্টা না করেন, তাহলে তা অপ্রকাশিত সম্মতি হিসেবে গণ্য হয়। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ) এর মতে, স্বামী যদি স্পষ্টভাবে নিষেধ না করে এবং স্ত্রী চলে যায়, তাহলে তা নুশূজ (অবাধ্যতা) হবে না। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৪৫; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩৮৬)
(খ) তবে স্বামীর “আমার অনুমতি নাই” বলা একটি অস্পষ্ট বক্তব্য। হানাফি ফিকহে এটিকে স্পষ্ট অনুমতি না দিলেও নিষেধ হিসেবে গণ্য করা হয় না, কারণ তিনি চাইলে আটকাতে পারতেন কিন্তু আটকাননি। (শরহু মা'আনি আল-আসার, ৩/২৩০)
(গ) আপনার মানসিক বিপর্যয় ও শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনের কারণে বাড়ি ছেড়ে আসা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ হতে পারে। যদি স্বামী ও তার পরিবার আপনাকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করে, তাহলে আপনি বাধ্য হয়ে বাড়ি ছেড়ে আসতে পারেন। আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর তোমরা (স্বামীরা) তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে সহবাস কর।" (সূরা নিসা: ১৯) যদি সদ্ভাব না থাকে, তাহলে স্ত্রীর জন্য নির্যাতনের স্থান ত্যাগ করা জায়েজ। (মাআরিফুল কুরআন, ২/৪৩১)
সুতরাং, আপনার বাপের বাড়ি চলে আসা সরাসরি আল্লাহর সীমারেখা লঙ্ঘন নয়, বরং পরিস্থিতির কারণে এটি গ্রহণযোগ্য। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আগে স্থানীয় আলেম বা সালিশের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা উচিত।
২. তালাকের জন্য আপনি কি দায়ী?
তালাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্বামীর ইচ্ছা ও কর্ম। কারণ তালাক দেওয়ার ক্ষমতা স্বামীর হাতে (যদি স্ত্রীর কাছে তালাকের অধিকার না থাকে)। আপনার বাপের বাড়ি চলে আসা তালাকের কারণ হতে পারে, কিন্তু দায়িত্ব আপনি নন, যতক্ষণ না আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে স্বামীকে উত্তেজিত করে তালাক আদায়ের চেষ্টা করেন।
- ইসলামী শরীয়তে তালাকের জন্য স্ত্রীকে দায়ী করা হয় না, যদি না তিনি তালাক চান বা স্বামীকে তালাক দিতে বাধ্য করেন।
- আপনার ক্ষেত্রে আপনি শুধু মানসিক যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে বাপের বাড়ি গিয়েছেন, তালাক চাননি। বরং দুদিন পর স্বামী নিজে তালাক লেটার পাঠিয়েছেন। সুতরাং তালাকের জন্য আপনি দায়ী নন। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৩৪; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২১৫)
তবে হ্যাঁ, আপনি যদি স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাপের বাড়ি যাওয়ার সময় তাকে উত্ত্যক্ত করেন বা তালাকের ইঙ্গিত দেন (যেমন "আমি তালাক চাই"), তাহলে ভিন্ন কথা। আপনার বিবরণে তা নেই।
৩. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও উপদেশ
(ক) আপনার বাপের বাড়ি চলে আসা মানসিক চাপ ও শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনের কারণে জায়েজ হয়েছে। এটি আল্লাহর সীমারেখা লঙ্ঘন নয়। (খ) তালাকের দায় সম্পূর্ণরূপে আপনার স্বামীর ওপর, কারণ তিনি নিজ ইচ্ছায় তালাক দিয়েছেন। আপনি শুধু তালাকের একটি অনৈচ্ছিক কারণ হয়েছেন, দায়ী নন।
উপদেশ:
- এখন থেকে ধৈর্য ধারণ করুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তালাক হয়ে গেলে ইদ্দত পালন করুন।
- ভবিষ্যতে নতুন জীবন শুরু করলে শরীয়তের বিধান মেনে চলার চেষ্টা করুন।
- দাম্পত্য সমস্যা সমাধানে সবসময় সালিশ বা আলেমের শরণাপন্ন হোন, নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনার কষ্ট লাঘব করুন এবং আপনার ভবিষ্যতকে কল্যাণময় করুন।