জামাতে ফরজ নামাজ মিস হয় গেলে কিভাবে জামাত করা যাবে
Salah-Prayer · Hanafi
Question
এ সম্পর্কিত হাদীছে বা সাহাবী বা তাবে তাবেইনের উল্লেখিত ঘটনা থাকলেও বলতে পারও।
উত্তরগুলো অবশ্যই সব মাজহাবের দিক থেকেই দিতে হবে আলাদাভাবে।
Answer
প্রশ্নের উত্তর:
নিম্নে আপনার প্রশ্নগুলোর বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো কুরআন, হাদীস এবং নির্ভরযোগ্য হানাফি কিতাবের রেফারেন্সসহ, পাশাপাশি অন্যান্য মাজহাবের মতামত পৃথকভাবে উল্লেখ করা হলো।
প্রথম পরিস্থিতি:
জামাত শেষ হওয়ার পর কেউ এসে দেখে যে কিছু মুক্তাদি নিজেদের ছুটে যাওয়া রাকাত পড়ছে। এই ব্যক্তি কি তাদের কাউকে ইমাম বানিয়ে নামাজ পড়তে পারবে?
হানাফি মাজহাবের মত:
না, এটি জায়েয নয়। কারণ যেসব মুক্তাদি নিজেদের ছুটে যাওয়া রাকাত আদায় করছে, তারা ইমামের সালামের পর নিজের নামাজ পৃথকভাবে সম্পন্ন করছে। তাদের নামাজ ইমামের সাথে সম্পৃক্ত নয়; বরং তারা মুক্তাদি হিসেবে নয় বরং এককভাবে (মুনফারিদ) নামাজ পড়ছে। তাই অন্য কেউ এসে তাদের ইমাম বানিয়ে জামাত করতে পারবে না, এমনকি তারা ইমাম হওয়ার নিয়ত করলেও তা শুদ্ধ হবে না।
দলিল:
- রদ্দুল মুহতার (২/১০৮)-এ এসেছে:
"যখন ইমাম সালাম ফিরায় এবং মাসবুক (যে রাকাত ছুটে গেছে) তা পূরণের জন্য দাঁড়ায়, তখন অপর ব্যক্তির পক্ষে তার ইকতিদা করা সহীহ নয়, কারণ সে ইমাম নয়। আর যদি সে ইমাম হওয়ার নিয়ত করে, তবুও তা সহীহ নয়, কারণ তার নামাজ একাকী নামাজের মতো।" - ফাতাওয়া উসমানী (২/১২৫)-এও একই রকম বর্ণিত আছে।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/২৯০)-এ শাহ আব্দুল আজিজ দেহলভী ও মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) স্পষ্টভাবে বলেছেন:
"মাসবুক ব্যক্তি যখন কাযা আদায় করছে, তখন অপর কেউ তার সাথে জামাতে মিলিত হতে পারবে না।"
কারণ:
মাসবুকের নামাজ মূল জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন এবং তা সম্পূর্ণ নিজস্ব। তাকে ইমাম বানানো মানে একটি নতুন জামাত সৃষ্টি করা, কিন্তু মাসবুকের নামাজের শুরুতে ইমাম হওয়ার নিয়ত ছিল না এবং তার বর্তমান নামাজও জামাতের জন্য নির্ধারিত নয়। তাই এই পদ্ধতি হানাফি মাজহাবে নাজায়েয (গুনাহ) এবং যদি কেউ করে তবে নামাজ পুনরায় পড়তে হবে।
শাফেয়ি মাজহাবের মত:
শাফেয়ি মাজহাবে মাসবুককে ইমাম বানানো জায়েয, তবে শর্ত হলো মাসবুক ব্যক্তি ইমাম হওয়ার নিয়ত করবে এবং আগন্তুক তার সাথে শামিল হবে। তবে আগন্তুক শুধুমাত্র মাসবুকের বর্তমান রাকাতের শুরু থেকে ইকতিদা করতে পারবে, মাঝপথে নয়। দলিল: হাদীসে ইবনে উমর (রা.) এসেছেন নবী (সা.)-এর নামাজের মধ্যে, তখন তিনি ইমামতির নিয়ত করেন। কিন্তু এখানে মাসবুকের ক্ষেত্রে মতানৈক্য আছে; অধিকাংশ শাফেয়ি আলেম বলেছেন, মাসবুকের কাযা সমাপ্তকারী অবস্থায় ইমাম হওয়া জায়েয, তবে মাকরুহ বলে অভিমতও আছে।
মালিকি মাজহাবের মত:
মালিকি মতে, মাসবুক যখন কাযা পড়ার জন্য দাঁড়ায়, তখন তাকে ইমাম বানানো জায়েয নেই, যদি না সে ও আগন্তুক উভয়েই একই সময়ে একসাথে নামাজ শুরু করে (অর্থাৎ নতুন জামাত গঠন করে)। দলিল: ইমাম মালিক (রহ.)-এর মতে, ইমামের সালামের পর মাসবুকের নামাজ তার নিজস্ব এবং সে অন্যদের ইমাম হতে পারে না।
হাম্বলি মাজহাবের মত:
হাম্বলি মতে, মাসবুক ইমাম হতে পারে, কিন্তু শর্ত হলো সে নিজের কাযার শুরু থেকেই ইমাম হওয়ার নিয়ত রাখবে এবং আগন্তুক তার ইকতিদা করবে। তবে এটি মাকরুহ হিসেবে গণ্য।
সারসংক্ষেপ:
- হানাফি ও মালিকি: নাজায়েয।
- শাফেয়ি: শর্ত সাপেক্ষে জায়েয, তবে অধিকাংশের মতে মাকরুহ।
- হাম্বলি: জায়েয কিন্তু মাকরুহ।
দ্বিতীয় পরিস্থিতি:
কেউ যদি ফরজ নামাজ একাকী পড়ছে, তবে অন্য একজন কি তার সাথে জামাত করতে পারবে তাকে ইমাম বানিয়ে?
হানাফি মাজহাবের মত:
হ্যাঁ, জায়েয। তবে শর্ত হলো:
- যে ব্যক্তি একাকী নামাজ পড়ছে, সে যখন বুঝতে পারবে যে কেউ তার ইকতিদা করতে চায়, তখন তাকে ইমাম হওয়ার নিয়ত করতে হবে (অর্থাৎ নিয়ত পরিবর্তন বা নবায়ন)।
- আগন্তুক যেন ইমামের পিছনে দাঁড়ায় এবং ইমামের নামাজের বর্তমান রাকাতের শুরু থেকে শামিল হয় (যদি ইমামের আগের রাকাত শেষ হয়ে থাকে, তবে আগন্তুক পরবর্তী রাকাত থেকে শুরু করবে এবং ইমামের সালামের পর ছুটে যাওয়া রাকাত পূর্ণ করবে)।
- ইমাম যেন এখনও সালাম না ফিরিয়ে থাকেন।
দলিল:
- হাদীস: হজরত জাবের (রা.) বর্ণনা করেন, নবী (সা.) একাকী নামাজ পড়ছিলেন, তখন আবু বকর (রা.) এসে তার পিছনে দাঁড়ালেন। নবী (সা.) ইমাম হওয়ার নিয়ত করেন এবং নামাজ চালিয়ে যান। (মুসলিম, বাবুল ইমামাহ)
- হিদায়া (১/৪০৬)-এ বলা হয়েছে:
"যদি কেউ একাকী ফরজ পড়তে থাকে, আর আরেকজন এসে তার সাথে জামাতে শামিল হতে চায়, তাহলে সে ইমাম হওয়ার নিয়ত করলে জায়েয।" - ফাতাওয়া আলমগীরী (১/৯০)-এ আছে:
"কোনো ব্যক্তি যদি একাকী ফরজ নামাজ পড়ে এবং অপর ব্যক্তি এসে ইকতিদা করে, তবে ইমামের জন্য নিজের নিয়তে ইমামিয়াত শামিল করা ওয়াজিব, অন্যথায় নামাজ ফাসিদ হবে না, তবে মাকরুহ হবে।" - বেহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.: নামাজ অধ্যায়) এও উল্লেখ আছে যে, একাকী পড়া ব্যক্তিকে ইমাম বানিয়ে জামাত করা যায় এবং এটি অনেক ফজিলতের কাজ।
পদ্ধতি:
আগন্তুক ইমামের ডান পাশে দাঁড়াতে পারে বা পেছনে একা দাঁড়াতে পারে। ইমাম নিজের নামাজ চালিয়ে যাবেন এবং শেষে সালাম ফিরাবেন। আগন্তুক তার ছুটে যাওয়া রাকাত পরে পূর্ণ করবে।
শাফেয়ি মাজহাবের মত:
জায়েয। তবে শর্ত হলো ইমাম একাকী পড়ার সময় ইমাম হওয়ার নিয়ত না রাখলেও অবিলম্বে নিয়ত পরিবর্তন করতে পারবেন। দলিল: নবী (সা.)-এর হাদীসে এসেছে, তিনি একাকী নামাজ পড়ছিলেন, ইবনে উমর এসে ইকতিদা করলে তিনি ইমাম হওয়ার নিয়ত করেন।
মালিকি মাজহাবের মত:
জায়েয। কিন্তু ইমামকে অবশ্যই ইমাম হওয়ার নিয়ত করতে হবে; তা না করলে আগন্তুকের নামাজ শুদ্ধ হবে না। দলিল: মালিকি ফিকহে 'তানবীহ' গ্রন্থে বিস্তারিত বর্ণিত।
হাম্বলি মাজহাবের মত:
জায়েয এবং এটি মুস্তাহাব। ইমাম ইমামিয়াতের নিয়ত করবেন এবং আগন্তুক ইকতিদা করবে। কোনো সমস্যা নেই।
জামাত করার অন্যান্য পদ্ধতি শরীয়তে:
শরীয়তে জামাত করার বেশ কয়েকটি পদ্ধতি রয়েছে:
- দুই বা ততোধিক ব্যক্তি মিলে জামাত: দুইজনে হলে একজন ইমাম, অন্যজন মুক্তাদি। তিনজন বা তার বেশি হলে ইমাম সামনে, মুক্তাদিরা পেছনে কাতারবদ্ধ হয়।
- ইমামের নিয়ত: ইমামের জামাতের নিয়ত করা ওয়াজিব, আর মুক্তাদিরা ইমামের ইকতিদার নিয়ত করে।
- বর্তমান ইমামের পিছনে দেরিতে আসা (মাসবুক): দেরিতে আসা ব্যক্তি এক বা একাধিক রাকাত পেলে ইমামের সালামের পর সে বাকি রাকাত নিজে পূর্ণ করে নেয়।
- মহিলাদের জামাত: মহিলাদের জন্য আলাদা ইমামা জায়েয, তারা নিজেদের মধ্যে জামাত করতে পারে।
- সফরের জামাত: সফরে দুই রাকাত ফরজ আদায় করা যায়, এবং জামাত করা উত্তম।
- জামাতে ফজিলত: হাদীসে এসেছে, "একাকী নামাজ অপেক্ষা জামাতের নামাজ ২৭ গুণ বেশি ফজিলতপূর্ণ" (বুখারি, মুসলিম)।
উল্লেখযোগ্য হাদীস ও ঘটনা:
- নবী (সা.) একবার নিজ ঘরে নফল নামাজ পড়ছিলেন, ইবনে আব্বাস (রা.) এসে তার পিছনে দাঁড়ালেন। নবী (সা.) তাকে ডান পাশে এনে জামাত করেন। (বুখারি)
- সাহাবি হজরত আবু বকর (রা.) নবী (সা.)-এর পিছনে এসে জামাতে শামিল হন, নবী (সা.) ইমামতির নিয়ত করেন (মুসলিম)।
- তাবেয়ি ইবনে সিরিন (রহ.) বলেন, সাহাবারা (রা.) যদি কাউকে একাকী নামাজ পড়তে দেখতেন, তবে তাঁরা তার পিছনে দাঁড়িয়ে জামাত করতেন (সুনানে বায়হাকি)।
সতর্কতা:
- জামাতে আসার সময় ইমাম যদি সালাম ফিরিয়ে ফেলেন, তবে নতুন জামাত শুরু করার জন্য আলাদা ইমাম নির্ধারণ করাই উত্তম।
- একাকী পড়া ব্যক্তিকে ইমাম বানালে ইমামকে জানানো ভালো, যেন তিনি নিয়ত পরিবর্তন করেন।
- কোনো অবস্থাতেই নামাজের মধ্যে ইমামের সাথে শামিল হতে দেরি হলে "তাকবিরে তাহরিমা" ইমামের সাথে মিলিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পদ্ধতিতে নামাজ আদায় করার তৌফিক দান করুন। আমিন।