ইসলামে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার এবং কবুল করা বা না করার নিয়ম কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
ইসলামে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার এবং কবুল বা না করার নিয়ম
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
ইসলামে বিবাহ একটি পবিত্র বন্ধন এবং ইবাদত। বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া ও নেওয়ার কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম-কানুন রয়েছে, যা নিম্নে কুরআন, হাদীস এবং হানাফী ফিকহের কিতাবের আলোকে বর্ণনা করা হলো:
১. প্রস্তাব দেওয়ার নিয়ম
ক) শুদ্ধ নিয়ত ও দ্বীনদারিতা: বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার সময় মূল বিবেচনা হওয়া উচিত দ্বীনদারিতা ও চরিত্র। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেনঃ
"কোনো নারীকে তার ধন-সম্পদ, বংশগত মর্যাদা, সৌন্দর্য এবং দ্বীনদারিতা — এই চারটি কারণে বিয়ে করা হয়। তুমি দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও, তোমার হাত ধূলিময় হোক।" (বুখারী ও মুসলিম)
খ) প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রস্তাব: কুরআনে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে প্রস্তাব দেওয়ার অনুমতি রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
"তোমরা নারীদেরকে ইঙ্গিতে বিবাহের প্রস্তাব দিলে বা নিজ মনে গোপন রাখলে তোমাদের কোনো পাপ নেই।" (সূরা বাকারা: ২৩৫)
গ) ইদ্দত অবস্থায় প্রস্তাব: ইদ্দতরত নারীকে সরাসরি প্রস্তাব দেওয়া নিষেধ, তবে ইঙ্গিত করতে পারেন। (কুরআন, সূরা বাকারা: ২৩৫)
ঘ) অন্যের প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব না দেওয়া: কোনো মুসলিম ভাই যদি কোনো নারীকে প্রস্তাব দিয়ে থাকে এবং এখনো চূড়ান্ত না হয়, তবে তার প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব দেওয়া নিষেধ। হাদীসে এসেছে:
"কোনো মুসলিম তার ভাইয়ের দামের উপর দাম বলবে না এবং তার বিবাহের প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব দেবে না।" (বুখারী ও মুসলিম) - (রদ্দুল মুহতার, ৩/৩৮)
ঙ) মাহরাম নারীদের প্রস্তাব না দেওয়া: যারা মাহরাম (যাদের সাথে বিবাহ হারাম) তাদেরকে প্রস্তাব দেওয়া জায়েয নয়।
২. প্রস্তাব কবুল করার নিয়ম
ক) ইজাব ও কবুল: বিয়ের প্রস্তাব কবুল করতে হলে স্পষ্টভাবে ইজাব (প্রস্তাব) ও কবুল (গ্রহণ) করতে হবে। হানাফী ফিকহ অনুযায়ী, আরবিতে বা স্থানীয় ভাষায় স্পষ্ট শব্দে বলতে হবে যেমন: "আমি কবুল করলাম"। (আল-হিদায়া, ২/২৯৬)
খ) সাক্ষীর উপস্থিতি: বিয়ের প্রস্তাব কবুলের সময় কমপক্ষে দুইজন পুরুষ সাক্ষী বা এক পুরুষ ও দুই নারী সাক্ষী থাকা আবশ্যক। (ফতোয়া আলমগীরী, ১/২৭৩)
গ) অভিভাবকের সম্মতি: নারীর জন্য তার অভিভাবকের (ওয়ালী) সম্মতি ছাড়া বিয়ে করা জায়েয নয়। হাদীসে এসেছে:
"যে নারী অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করে, তার বিয়ে বাতিল।" (আবু দাউদ, তিরমিজি)
৩. প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার নিয়ম
ক) স্পষ্ট ও ভদ্রভাবে প্রত্যাখ্যান: যদি কোনো প্রস্তাব গ্রহণ করতে না চান, তবে স্পষ্ট কিন্তু ভদ্রভাবে প্রত্যাখ্যান করা উচিত। কুরআনে নির্দেশ রয়েছে:
"তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো। আর যদি তাদেরকে অপছন্দ করো, তাহলে হয়তো তোমরা এমন এক জিনিসকে অপছন্দ করছো যাতে আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখেছেন।" (সূরা নিসা: ১৯)
খ) গিবত না করা: প্রত্যাখ্যান করার সময় প্রস্তাব দাতার দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করা বা গিবত করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
গ) সময়ক্ষেপণ না করা: যদি বিয়ে করার ইচ্ছা না থাকে, তাহলে প্রস্তাব নিয়ে অহেতাক সময় নষ্ট না করে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া ভালো।
৪. হানাফী ফিকহের বিশেষ দিকনির্দেশনা
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কোনো নারী নিজেই নিজের বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারে বা কবুল করতে পারে, তবে অভিভাবকের সম্মতি প্রয়োজন। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫)
- ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, নারীর নিজের বিবাহের জন্য তার ওয়ালী ছাড়া অন্য কারো মাধ্যমে প্রস্তাব দেওয়া উত্তম। (ফতোয়া আলমগীরী)
- ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) বলেছেন, নারী নিজে প্রস্তাব দিলে তা মাকরূহ নয়, তবে পুরুষেরই এগিয়ে আসা অধিক সম্মানজনক।
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) ফতোয়ায় বলেছেন, "বিয়ের প্রস্তাবে কোনো পক্ষ থেকেই লজ্জা করা উচিত নয়, বরং দ্বীনি দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।" (মা'য়ারিফুল কুরআন, ২/৫২২)
৫. ব্যবহারিক নির্দেশিকা
- প্রস্তাব দেওয়ার আগে ভালোভাবে জেনে নিন এবং ইস্তেখারা করুন।
- কোনো মেয়েকে প্রস্তাব দেওয়ার আগে তার অভিভাবকের কাছে প্রস্তাব দিন।
- প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলে কেউ মনোকষ্ট পাবেন না, কারণ এটি আল্লাহর ইচ্ছা।
- বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণে বিলম্ব না করা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সুন্নত।
উপসংহার: ইসলামে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া ও নেওয়া একটি গুরুতর বিষয়। এটি সহজ-সরল, স্বচ্ছ এবং দ্বীনি মানদণ্ডে হওয়া উচিত। প্রস্তাব দেওয়ার সময় দ্বীনদারিতা ও চরিত্রকে প্রাধান্য দেওয়া এবং অন্যের অধিকার রক্ষা করা জরুরি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দ্বীনি পদ্ধতিতে বিবাহ করার তাওফিক দান করুন। (আমিন)
সূত্র:
- কুরআন (সূরা বাকারা: ২৩৫, সূরা নিসা: ১৯)
- সহীহ বুখারী ও মুসলিম
- রদ্দুল মুহতার (৩/৩৮, ৩/৫৫)
- আল-হিদায়া (২/২৯৬)
- ফতোয়া আলমগীরী (১/২৭৩)
- মা'য়ারিফুল কুরআন (২/৫২২)