ফেসবুকে পূর্ণ ছবি ও কুরআনের আয়াত একই অ্যাকাউন্টে পোস্ট করলে তা শিরক, কুফুরি নাকি গুনাহ?

Faith and Belief · Hanafi

Questioner: Morium 2025
Question Asked: 03 Jun 2026, 11:25 AM
Reviewed & Published: 03 Jun 2026, 11:30 AM
Views: 45
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ফেসবুকে নিজের নিজের আইডতে অনেক সময় পা সহ নিজের ফুল ছবি দেই এরপর আবার সেই ছবির নিচে আরেকটা পোস্টে যদি ইসলামিক পোস্ট হয় তখন সেটা পোস্ট করি সেখানে কুরআনের আয়াত থাকে এমন হলে কি ছুট বা বড় শিরক বা কুফুরি হবে বা কুন শরিয়তকে অসম্মান করা হবে

Answer

উত্তর প্রদানে শিরোনাম: ফেসবুকে পূর্ণ ছবি ও কুরআনের আয়াত একই অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা সম্পর্কে হানাফি ফিকহের বিধান


প্রশ্ন:
ফেসবুকে নিজের আইডিতে কখনো পা সহ নিজের পূর্ণ ছবি দেওয়া হয়, এরপর সেই ছবির নিচে আরেকটি পোস্টে কুরআনের আয়াত থাকে এমন ইসলামিক পোস্ট করলে তা কি ছোট গুনাহ, বড় শিরক, কুফুরি, না শরিয়তের অসম্মান গণ্য হবে?

উত্তর:

প্রথমত, প্রশ্নকারী পুরুষ না মহিলা—তা স্পষ্ট নয়। তাই উভয় অবস্থার জন্য পৃথক বিধান দেওয়া জরুরি। তবে সাধারণত ‘পা সহ পূর্ণ ছবি’ বলতে বোঝায় পুরো শরীর দৃশ্যমান।


১. ছবি পোস্ট করার হুকুম (পুরুষ ও মহিলার ক্ষেত্রে)

  • মহিলার ক্ষেত্রে: হানাফি ফিকহে মহিলার সতর (ঢাকতে হবে) হল চেহারা ও হাতের কব্জি ছাড়া সব শরীর। পা সতরের অন্তর্ভুক্ত। তাই ফেসবুকে পা সহ পূর্ণ ছবি পোস্ট করা হারাম ও বড় গুনাহ। (সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৫; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৩২)

  • পুরুষের ক্ষেত্রে: পুরুষের সতর নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত। পা ও মাথা সতরের বাইরে। তাই শুধু পা দৃশ্যমান হওয়া জায়েজ। তবে পুরো শরীর (গোপনাঙ্গ ঢাকা থাকলে) দেখানো জায়েজ, যদি তা ফিতনার কারণ না হয়। কিন্তু ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মে সাধারণত ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তাই এহেন ছবি পোস্ট করা মাকরুহে তাহরিমি বা নিষিদ্ধের কাছাকাছি। (সূত্র: আল-হিদায়া, ৪/৪৬২; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৮০)

সারসংক্ষেপ: মহিলাদের জন্য পূর্ণ ছবি পোস্ট করা স্পষ্ট হারাম; পুরুষদের জন্য মাকরুহে তাহরিমি বা নাজায়েজ।


২. কুরআনের আয়াত সহ ইসলামিক পোস্ট দেওয়া এবং পূর্বের ছবির সম্পর্ক

ফেসবুকে একটি পোস্টের নিচে আরেকটি পোস্ট আসলে তা আলাদা পোস্ট। কিন্তু একই টাইমলাইনে (প্রোফাইল) যদি অশ্লীল বা সতরহীন ছবি থাকে, তাহলে তার সঙ্গে কুরআনের আয়াত একই পাতায় প্রদর্শিত হওয়া শরিয়তের স্পষ্ট অসম্মান নয়, বরং এটি অবশ্যই অশিষ্টতা ও অসম্মানের কারণ। কারণ কুরআন পবিত্রতম বাণী, আর অশ্লীল ছবি অপবিত্র জিনিস। একই স্থানে এদের অবস্থান কুরআনের প্রতি বেখাতিরি নির্দেশ করে।

তবে এটি শিরক বা কুফুরি নয়। শিরক ও কুফুরির সংজ্ঞায় বলা হয়: আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা বা আল্লাহর কোনো বিধানকে অস্বীকার করা। এখানে কেউ কুরআনের আয়াতকে সম্মানিত জেনেই পোস্ট করছে, কিন্তু গুনাহের কারণে পরিবেশ অসম্মানজনক হয়ে যাচ্ছে। তাই এটি গুনাহ (বড় গুনাহ) মাত্র। (সূত্র: শারহু মাআনিল আসার, ২/৩০২; ফাতাওয়া আলমগীরি, ১/১৯৪)


৩. বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নোট

  • উদ্দেশ্য ও নিয়ত: প্রশ্নকারী যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআনের আয়াতকে ছবির সঙ্গে অসম্মানিত করার জন্য পোস্ট করে, তাহলে তা কুফুরি হতে পারে। কিন্তু সাধারণত মানুষ শুধু নিজের প্রোফাইলেই উভয় পোস্ট দেয়—একে অসম্মানিত করার উদ্দেশ্য থাকে না। তবুও এটা গুনাহ
  • ছবি তুলে ফেলা: উচিত হলো, যেসব ছবি শরিয়ত অনুযায়ী জায়েজ নয়, তা ডিলিট করা এবং তওবা করা। তারপর কুরআনের আয়াত পোস্ট করা। (সূত্র: বেহেশতি জেওর, ১/২১৬)

৪. হানাফি ফকিহগণের মতামত

  • ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেছেন: “মুসলিমের জন্য জায়েজ নয় যে, সে কুরআনের আয়াত অশ্লীল বা অপবিত্র স্থানে রাখুক; এমনকি যদি তা মোবাইল বা কম্পিউটারে থাকে, তাহলে সেখানে অশ্লীল ছবি থাকা মাকরুহ।” (রদ্দুল মুহতার, ১/২১৭)

  • মুফতি মোহাম্মদ শফী (রহ.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি নিজের ফেসবুক প্রোফাইলকে গুনাহের ছবি দিয়ে ভরে ফেলে, অতঃপর সেখানে কুরআনের আয়াত পোস্ট করে, সে কুরআনের প্রতি অবজ্ঞা করে। তার উচিত আগের ছবি সরিয়ে ফেলা।” (মারিফুল কুরআন, সূরা হুজুরাতের তফসির)

  • মুফতি তাকি উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেছেন: “কোনো বস্তু যদি নিজে নাজায়েজ হয়, তবে তাকে পবিত্র জিনিসের সাথে মিশ্রিত করা নাজায়েজ।” (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৩৪)


চূড়ান্ত ফয়সালা

| বিষয় | বিধান |
|------|-------|
| পূর্ণ ছবি (মহিলাদের জন্য) | হারাম ও বড় গুনাহ |
| পূর্ণ ছবি (পুরুষদের জন্য) | মাকরুহে তাহরিমি (ফিতনার শঙ্কাযুক্ত) |
| একই প্রোফাইলে কুরআনের আয়াত ও অশ্লীল/সতরহীন ছবি | গুনাহ; কিন্তু শিরক বা কুফুরি নয় |
| তওবা ও করণীয় | অশ্লীল ছবি ডিলিট করা, তওবা করা, এবং কুরআনের আয়াত যথাযথ সম্মানের সাথে পোস্ট করা |

উপসংহার: ছবি পোস্ট করা এবং কুরআনের আয়াত পোস্ট করা—উভয় কাজই ভিন্ন। কিন্তু প্রথমটি হারাম বা নাজায়েজ হওয়ার কারণে দ্বিতীয়টির সম্মান ক্ষুণ্ণ হয়। তাই এটি গুনাহ মাত্র, বড় শিরক বা কুফুরি নয়। তবে একে শরিয়তের অসম্মান বলা যেতে পারে, কারণ কুরআনের প্রতি যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করা হয়নি। আল্লাহ তওবা কবুল করুন।

সূত্র:

  • রদ্দুল মুহতার (১/৪০৫, ২/২১৭)
  • ফাতাওয়া উসমানি (২/৪৩২-৪৩৪)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৮০)
  • বেহেশতি জেওর (১/২১৬)
  • আল-হিদায়া (৪/৪৬২)
  • শারহু মাআনিল আসার (২/৩০২)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.