ফেসবুকে নিজের নিজের আইডতে অনেক সময় পা সহ নিজের ফুল ছবি দেই এরপর আবার সেই ছবির নিচে আরেকটা পোস্টে যদি ইসলামিক পোস্ট হয় তখন সেটা পোস্ট করি সেখানে কুরআনের আয়াত থাকে এমন হলে গুনাহ হবে?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
আপনার প্রশ্নটি দুটি ভাগে বিভক্ত:
১. ফেসবুকে নিজের পা-সহ সম্পূর্ণ ছবি পোস্ট করা।
২. সেই একই ফিডে (একই অ্যাকাউন্টে বা একই সিরিজে) পরে কুরআনের আয়াতসমৃদ্ধ ইসলামিক পোস্ট দেওয়া। এতে কি শিরক, কুফর বা শরিয়তের অসম্মান হবে?
নিম্নে প্রতিটি বিষয়ের উপর হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করছি।
১. নিজের পা-সহ ছবি পোস্ট করার হুকুম
মহিলাদের জন্য:
- মহিলাদের পা সতরের (অঙ্গ) অন্তর্ভুক্ত। কুরআন ও হাদিসের ভিত্তিতে মহিলার সমগ্র দেহ (হাত ও মুখমণ্ডল ব্যতীত) অপরিচিত পুরুষের কাছে ঢাকা ফরজ। বিশেষ করে পা ও পায়ের পাতা প্রকাশ করা জায়েজ নয়।
- সূরা নূর (২৪:৩১): "তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া..." (তাফসিরে মা’আরিফুল কুরআন, ৬/৪৫২)।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২১৯): "মহিলার পা সতরের অন্তর্ভুক্ত, তাই তা অপরিচিত পুরুষের সামনে প্রকাশ করা নাজায়েজ।"
- ফেসবুকে ছবি পোস্ট করা আরো বেশি নাজায়েজ, কারণ তা অসংখ্য অপরিচিত পুরুষের কাছে পৌঁছে যায়।
পুরুষদের জন্য:
- পুরুষের জন্য পা সতরের অংশ নয় (সতর নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত)। তবে সামগ্রিকভাবে ছবি তোলা ও পোস্ট করা ফটোগ্রাফির (তাসবির) হুকুমের আওতায় পড়ে।
- হানাফি ফিকহে, ছবি তোলা ও রাখা (প্রাণী বা মানুষের) নাজায়েজ এবং কবিরা গুনাহ। এটি শুধুমাত্র প্রয়োজনে (যেমন পরিচয়পত্র) সীমিত রাখা জায়েজ।
- রদ্দুল মুহতার (১/৬৪৭): "যে ছবি আঁকে বা তোলে, তাকে কিয়ামতে শাস্তি দেওয়া হবে।"
- ফাতাওয়া উসমানি (২/৪৮৬): "ডিজিটাল ছবিও তাসবিরের অন্তর্ভুক্ত।"
- হানাফি ফিকহে, ছবি তোলা ও রাখা (প্রাণী বা মানুষের) নাজায়েজ এবং কবিরা গুনাহ। এটি শুধুমাত্র প্রয়োজনে (যেমন পরিচয়পত্র) সীমিত রাখা জায়েজ।
- তাই পুরুষের জন্য নিজের ফুল বডি ছবি ফেসবুকে দেওয়া নাজায়েজ, যদিও পা ঢেকে থাকে।
২. কুরআনের আয়াত পোস্ট করার পরিস্থিতি
একই ফিডে ছবি ও কুরআনের আয়াত থাকলে:
- ছবির নিচে বা উপরে ভিন্ন পোস্টে কুরআনের আয়াত থাকলে সেটি শরিয়তের সরাসরি অসম্মান নয়, তবে অপবিত্র পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে।
- মা’আরিফুল কুরআন (৮/৫৪৪): "কুরআনের আয়াতকে অপবিত্র স্থান বা অশালীন পরিবেশে রাখা মাকরূহ তাহরিমি।"
- ফাতাওয়া আলমগীরি (৫/৩২১): "যেখানে অশালীন ছবি বা সঙ্গীত চলে, সেখানে কুরআনের পুস্তক রাখা জায়েজ নয়।"
- ফেসবুক ফিডে একটির পর আরেকটি পোস্ট আসতে পারে। এটি স্পষ্টভাবে অসম্মান নয়, তবে যদি কুরআনের আয়াত এমন ছবির সাথে মিশে যায় যা অশ্লীল বা সতর উন্মুক্ত করে, তাহলে তা অসম্মানের সম্ভাবনা তৈরি করে।
শিরক, কুফর বা অসম্মানের বিধান:
- এই কাজ বড় শিরক বা কুফর নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআনকে অপমানিত না করছেন।
- রদ্দুল মুহতার (৪/২৬৪): "শিরক বা কুফর তখনই হয়, যখন কেউ আল্লাহ বা কুরআনকে সরাসরি অপমান বা অস্বীকার করে।"
- তবে এটি গুনাহ ও নাজায়েজ কাজ। এটি শরিয়তের প্রতি অবহেলা ও অশ্রদ্ধা হিসেবে গণ্য হতে পারে, যা তাওবা ও সংশোধনযোগ্য।
৩. হানাফি ফিকহের কিতাব থেকে দলিল
| গ্রন্থ | উদ্ধৃতি | |--------|---------| | রদ্দুল মুহতার (১/৬৪৭) | "মানুষ ও প্রাণীর ছবি তৈরি করা (আঁকা, তোলা) হারাম, তা ফটোগ্রাফি হোক বা চিত্র।" | | ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২১৯) | "মহিলার পা সতরের অন্তর্ভুক্ত, প্রকাশ করলে গুনাহ।" | | ফাতাওয়া উসমানি (২/৪৮৬) | "ডিজিটাল ছবিও তাসবিরের আওতায় পড়ে, সেটি রাখা ও প্রচার নাজায়েজ।" | | মা’আরিফুল কুরআন (৮/৫৪৪) | "কুরআনের আয়াতকে অশালীন পরিবেশে রাখা মাকরূহ।" | | ফাতাওয়া আলমগিরি (৫/৩২১) | "যে স্থানে অশ্লীল ছবি বা বাজে কাজ হয়, সেখানে কুরআন রাখা জায়েজ নয়।" | | উসুলুশ শাশি (ص ৩২) | "নিয়ত ও উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে গুনাহ বা না-গুনাহ নির্ধারিত হয়।" |
৪. আপনার করণীয়
১. ছবি পোস্ট করা বন্ধ করুন – নিজের বা অন্যের সতর উন্মুক্তকারী ছবি ফেসবুকে দেওয়া ত্যাগ করুন। বিশেষ করে মহিলাদের জন্য পা ও চেহারা (গায়রে মাহরামদের জন্য) প্রকাশ নাজায়েজ।
২. ইসলামিক পোস্টের পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন – কুরআনের আয়াত পোস্ট করলে আগে থেকে অতীতের সব অশালীন/নাজায়েজ ছবি মুছে ফেলুন অথবা আলাদা কোনো ইসলামিক পেইজ বা গ্রুপে পোস্ট করুন।
৩. তাওবা করুন – আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং ভবিষ্যতে সতর্ক থাকুন।
মনে রাখবেন: ফেসবুকের মাধ্যমে কুরআনের আয়াত প্রচার করা সওয়াবের কাজ, কিন্তু সেই প্ল্যাটফর্ম যদি নিজের গুনাহের ছবি ও অশালীনতায় ভরা থাকে, তাহলে তা সওয়াব কমিয়ে দেওয়ার কারণ হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের পথে চলার তাওফিক দান করুন।
যদি কোনো ভুল থাকে, আল্লাহই ক্ষমাশীল।