দরিদ্র কন্যার বিয়েতে সুদের টাকা ও যাকাতের টাকা দিয়ে আসবাবপত্র প্রদান করার শরয়ী বিধান।

Zakat and Charity · Hanafi

Question No: 1294
Questioner: Sofikul Mallick
Question Asked: 06 Jun 2026, 03:10 PM
Reviewed & Published: 06 Jun 2026, 03:26 PM
Views: 23
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমাদের এলাকায় একটি দরিদ্র পরিবারের মেয়ের বিয়ে হতে যাচ্ছে। এমন অবস্থায়, আমার কাছে থাকা সুদের টাকা এবং যাকাতের টাকা থেকে কিছু জিনিস (যেমন আলমারি, খাট ইত্যাদি) কিনে কি আমি ওই মেয়েকে বিয়ের উপহার হিসেবে দিতে পারি? শরিয়তের দৃষ্টিতে এর বিধান কী? সুদের টাকা ও যাকাতের টাকা এভাবে ব্যয় করা বৈধ হবে কি না, দয়া করে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জানিয়ে বাধিত করবেন।

Answer

উত্তর:
আলহামদুলিল্লাহ ওয়াসসালাতু ওয়াসসালামু আলা রাসূলিল্লাহ।

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দরিদ্র মেয়েটির বিয়ের জন্য আপনি দুটি ভিন্ন উৎসের টাকা ব্যবহার করতে চান: সুদের টাকাযাকাতের টাকা। নিচে প্রতিটির হুকুম কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে উল্লেখ করা হলো।


১. সুদের টাকা (রিবা) ব্যবহারের বিধান

কুরআনে আল্লাহ তাআলা সুদকে হারাম করেছেন এবং এর কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যে অংশ বাকি আছে তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা মুমিন হও।” (সূরা আল-বাকারা: ২৭৮)

হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সুদখোর, সুদদাতা, লেখক ও সাক্ষী সকলকে লানত করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮)

সুদের টাকা নাজিস (অপবিত্র)। এটি নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বা সওয়াবের নিয়তে ব্যবহার করা জায়েয নয়। তবে হারাম সম্পদ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তা গরিব-মিসকিনকে দান করা ওয়াজিব। এতে দাতার কোনো সওয়াব হয় না, তবে সম্পদ পবিত্র হয়।

হানাফি ফিকহের নির্দেশনা:

  • ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) বলেন: “সুদের টাকা গরিবদের দান করে দেওয়া ওয়াজিব। নিজে ব্যবহার করা বা স্বজনকে উপহার দেওয়া জায়েয নয়।” (আল-মাবসুত, ১৪/৩২; রদ্দুল মুহতার, ৪/২৮৪)
  • মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন: “সুদের টাকা যাকাত হিসেবে দেওয়া চলবে না, বরং তা সদকা হিসেবে নিয়ত না করে গরিবকে দিতে হবে।” (জাওয়াহিরুল ফিকহ, ২/৪৪)

আপনার অবস্থায় হুকুম:
আপনি যদি সুদের টাকা দিয়ে আলমারি-খাট কিনে ওই মেয়েকে উপহার দেন, তাহলে তা জায়েয নয়, কারণ:

  • উপহার দেওয়ার মধ্যে সওয়াবের নিয়ত লুকিয়ে থাকে, যা সুদের টাকায় বৈধ নয়।
  • বরং আপনি সুদের টাকা সরাসরি ওই মেয়েকে (অথবা তার অভিভাবককে) সদকা হিসেবে দিন—এভাবে ‘অর্থ’ বা ‘জিনিস’ তাকে দিয়ে দিন, কিন্তু সওয়াবের নিয়ত করবেন না। এতে সম্পদ পবিত্র হবে এবং মেয়েটি তার প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যয় করবে।

সতর্কতা:
সুদের টাকা যাকাত, কুরবানি, আকিকা, বা ওয়াজিব সদকার নিয়তে দেওয়া জায়েয নয়। বরং শুধু “হারাম সম্পদ থেকে নিষ্কৃতি”র নিয়তে দিতে হবে।


২. যাকাতের টাকা ব্যবহারের বিধান

যাকাত ইসলামের পঞ্চস্তম্ভ এবং একটি নির্ধারিত ফরজ ইবাদত। যাকাতের টাকা নির্দিষ্ট ৮ প্রকার খাতে ব্যয় করা আবশ্যক। (সূরা আত-তাওবা: ৬০)

একজন দরিদ্র মেয়ে (যার কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই) যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত। তিনি গরিব (ফকির/মিসকিন) শ্রেণিভুক্ত।

যাকাত দিয়ে কীভাবে সাহায্য করবেন:

  • আপনি যাকাতের টাকা থেকে আলমারি, খাট ইত্যাদি কিনে মেয়েটির মালিকানায় দিয়ে দিতে পারেন। শর্ত হলো কিনে দেওয়ার সময়ই মালিকানা হস্তান্তর করতে হবে এবং তা তার প্রয়োজন পূরণ করে।
  • হানাফি ফিকহ মতে, যাকাত নগদ টাকা বা প্রয়োজনীয় জিনিস উভয়ভাবেই দেওয়া জায়েয, তবে উত্তম হলো নগদ দেওয়া, যাতে সে নিজের পছন্দমতো ব্যয় করতে পারে। (রদ্দুল মুহতার, ২/৩৪৭)
  • তবে যাকাতের টাকা বিয়ের অনুষ্ঠানের খরচ বা ভোজের জন্য দেওয়া জায়েয নয়, কারণ সেটি সরাসরি মেয়েটির মালিকানায় যায় না। কিন্তু আপনি যদি মেয়েটিকে নিজেই সেই জিনিস কিনে দেন (উপহার হিসেবে নয়, বরং তার প্রয়োজন পূরণের জন্য), তাহলে তা যাকাত হিসেবে গণ্য হবে।

শর্ত:

  • মেয়েটি বা তার পরিবার যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত হতে হবে (অর্থাৎ তারা নেসাবের মালিক নয়)।
  • জিনিস কেনার সময় নিয়ত করবেন যে, এটি যাকাত হিসেবে দিচ্ছি।
  • মেয়েটি জিনিসগুলো নিজের মালিকানায় নেওয়ার পর ইচ্ছা করলে বিয়েতে ব্যবহার করতে পারবে।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত:
যাকাতের জিনিসের মধ্যে ত্রুটি থাকলে ফেরত দেওয়ার সুযোগ থাকে, তাই উত্তম হলো নগদ টাকা দেওয়া। কিন্তু জিনিস কিনে দেওয়াও জায়েয। (আল-হিদায়া, ২/২৭০)


৩. চূড়ান্ত নির্দেশনা

| উৎস | বিধান | করার মতো কাজ | |------------|-----------------------------------------------------------------------|------------------------------------------------------------------------------| | সুদের টাকা | হারাম; শুধু সদকা করে পবিত্র করা ওয়াজিব, সওয়াবের নিয়ত নিষিদ্ধ। | টাকা বা জিনিস দান করুন (উপহার নয়), নিয়ত করুন “এটি সুদের টাকা থেকে মুক্তি পাচ্ছি।” কোনো সওয়াব আশা করবেন না। | | যাকাতের টাকা | ফরজ; নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় ওয়াজিব। | জিনিস কিনে মেয়েটিকে যাকাত হিসেবে মালিক করে দিন। নিয়ত করুন “যাকাত আদায় করছি।” |

বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ:

  • সুদের টাকা ও যাকাতের টাকা একসাথে মিশিয়ে জিনিস কিনবেন না। কেননা এতে জিনিসের একটি অংশ অপবিত্র থেকে যাবে।
  • বরং প্রতিটি উৎস থেকে আলাদাভাবে টাকা নিন:
    • সুদের টাকা থেকে: মেয়েটিকে নগদ দান করুন (সদকা হিসেবে)।
    • যাকাতের টাকা থেকে: জিনিস কিনে তাকে মালিক বানিয়ে দিন অথবা নগদ দিয়ে দিন (যাকাত হিসেবে)।

উদাহরণ:
ধরুন, আলমারি ও খাটের দাম ২০,০০০ টাকা।

  • আপনার কাছে সুদের টাকা ৫,০০০ টাকা আছে → সেটি মেয়েটিকে সদকা হিসেবে দিন (বলবেন না এটি বিয়ের উপহার)।
  • বাকি ১৫,০০০ টাকা আপনার যাকাতের টাকা থেকে → তা দিয়ে জিনিস কিনে যাকাত হিসেবে মেয়েটির নামে রেজিস্ট্রি বা দখল দিয়ে দিন।

এতে শরিয়তের উভয় বিধান পালিত হবে ইনশাআল্লাহ।


৪. দলিলভিত্তিক রেফারেন্স

  • কুরআন:

    • সূরা আল-বাকারা: ২৭৫-২৭৯ (সুদ হারাম)।
    • সূরা আত-তাওবা: ৬০ (যাকাতের খাত)।
  • হাদিস:

    • জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সুদখোর, সুদদাতা ও লেখককে লানত করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮)
  • হানাফি ফিকহের কিতাব:

    • রদ্দুল মুহতার (৪/২৮৪): “সুদের টাকা গরিবকে সদকা করে দেওয়া ওয়াজিব, নিজে খাওয়া বা ব্যবহার করা জায়েয নয়।”
    • ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২৫৯): “যাকাতের টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে দেওয়া জায়েয, তবে উত্তম নগদ দেওয়া।”
    • ফাতাওয়া উসমানি (২/৩১২): “সুদের টাকা যাকাত বা নফল সদকার নিয়তে দেওয়া যায় না; শুধু ‘হারাম থেকে পবিত্রতা’র নিয়তে দিতে হবে।”

৫. সারসংক্ষেপ

  • যাকাতের টাকা দিয়ে দরিদ্র মেয়ের জন্য বিয়ের জিনিস কিনে দেওয়া জায়েয, তবে শর্ত হলো তা যাকাতের নিয়তে তার মালিকানা করে দেওয়া।
  • সুদের টাকা দিয়ে উপহার বা জিনিস কিনে দেওয়া জায়েয নয়। বরং তা সরাসরি সদকা হিসেবে (সওয়াবের নিয়ত ছাড়া) মেয়েকে দিয়ে দিন।
  • ✔️ শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি: যাকাতের টাকা নগদে এবং সুদের টাকা সদকা হিসেবে নগদে মেয়েকে সরাসরি প্রদান করুন। তিনি নিজে যা প্রয়োজন কিনে নেবেন।

আল্লাহ তাআলা আপনার নিয়তকে কবুল করুন এবং দরিদ্র মেয়েটির বিয়েকে বরকতময় করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.