"চাকরির সময় বিলের চেয়ে বেশি টাকা পেলে তা নিজে নেওয়া ইসলামিক দৃষ্টিতে জায়েয কিনা?
Business and Job · Hanafi
Question
এই টাকা টা আমি নিলে কোনো সমস্যা আছে?
Answer
উত্তরঃ
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, আপনি চাকরিরত অবস্থায় ক্রেতার নিকট থেকে বিলের পরিমাণের চেয়ে বেশি টাকা নিচ্ছেন (যেমন ১৮৭ টাকার বিলে ১৯০ টাকা নিচ্ছেন) এবং সেই অতিরিক্ত টাকা (প্রতিদিন গড়ে ৩০-৫০ টাকা) আপনি নিজের কাছে রেখে দিচ্ছেন। এটি জায়েয নয় এবং এতে হারাম (নাজায়েয) কাজ হচ্ছে। নিচে দলিলসহ বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হলো।
✅ কেন এটি জায়েয নয়?
১. মালিকের অনুমতি ছাড়া সম্পদ গ্রহণ করা হারাম
ইসলামে কোনো ব্যক্তির সম্পদ তার সন্তুষ্টি ও অনুমতি ব্যতীত গ্রহণ করা নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«لا يَحِلُّ مالُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ إلَّا بِطِيبِ نَفْسِهِ»
(মুসলিম ব্যক্তির সম্পদ তার সন্তুষ্টি ছাড়া হালাল নয়) [সুনানে দারাকুতনী, হাদীস: ২৮৮০; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস: ২৭২১৮]
এখানে অতিরিক্ত টাকার মালিক হচ্ছেন আপনার কর্মস্থলের মালিক (এমপ্লয়ার) – কারণ ক্রেতার দেয়া টাকা ব্যবসার হিসাবে জমা হয়। আপনি মালিকের অনুমতি ছাড়া তা নিজের কাছে রাখতে পারেন না।
২. আমানতে খিয়ানত করা কবীরা গুনাহ
আপনি কর্মচারী হিসেবে মালিকের সম্পদের রক্ষক (আমানতদার)। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
«إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا»
(নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের আদেশ করেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার প্রাপকদের নিকট পৌঁছে দাও) [সূরা নিসা, ৪:৫৮]
অতিরিক্ত টাকা মালিকের কাছে পৌঁছে না দিয়ে নিজে নেয়া আমানতে খিয়ানত। হাদীসে খিয়ানতকে কিয়ামতের নিদর্শন ও মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে।
৩. ইচ্ছাকৃতভাবে মূল্যবৃদ্ধি ও প্রতারণা
বিল ১৮৭ টাকা হলে ১৯০ টাকা রাখা মানে ক্রেতার কাছ থেকে ৩ টাকা বাড়তি নেয়া। এটি সাধারণত ক্রেতার অজান্তে হলে প্রতারণা। এমনকি যদি ক্রেতা জানেও তবুও বাড়তি টাকা মালিকের সম্পদ, আপনার নয়। আপনি যদি নিজে থেকে এই পদ্ধতি চালিয়ে থাকেন, তবে তা বেইমানি।
৪. ফিকহী নির্দেশনা
হানাফী ফিকহের বড় কিতাবসমূহে পরিষ্কার বলা হয়েছে:
«مَنِ اسْتَعْمَلَهُ صَاحِبُ الْمَالِ عَلَى مَالِهِ فَلَيْسَ لَهُ أَنْ يَأْخُذَ مِنْهُ شَيْئًا إِلَّا بِإِذْنِهِ»
(যাকে মালিক তার সম্পদের তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত করে, সে মালিকের অনুমতি ছাড়া তা থেকে কিছু নিতে পারে না।) [রদ্দুল মুহতার, ৫/১১৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ২/৩৩২]
আপনি প্রতিদিন অতিরিক্ত টাকার যে পরিমাণ (৩০-৫০ বা ১০০ টাকা) নিচ্ছেন, তা আপনার পারিশ্রমিক নয়। এটি সম্পূর্ণ মালিকের সম্পদ। তাই তা নেয়া হারাম।
📌 সংশোধন ও করণীয়
-
অতীতের টাকা ফেরত দেয়া – ইতিমধ্যে আপনি যেসব অতিরিক্ত টাকা নিয়েছেন, তার পুরো পরিমাণ হিসাব করে মালিককে ফেরত দিন। মালিক জানতে পারলে নিজের ত্রুটি স্বীকার করে ক্ষমা চান। যদি মালিক ক্ষমা করে দেন, তবে দুনিয়ায় দায়মুক্তি হলেও আখিরাতে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি থেকে বাঁচতে তওবা করুন।
-
ভবিষ্যতে বন্ধ করা – এখন থেকে কখনোই হিসাবের বাইরে কোনো টাকা নিজের কাছে রাখবেন না। বিল যাই হোক, সঠিক টাকা গ্রহণ করুন এবং বাকি টাকা যথাযথভাবে জমা দিন।
-
মালিকের অনুমতি প্রার্থনা – যদি প্রতিষ্ঠানে এমন রীতি থাকে যে, ছোট ছোট বাড়তি টাকা কর্মচারী নিতে পারে, সেক্ষেত্রে উক্ত টাকার মালিকের স্পষ্ট ও বৈধ অনুমতি নিন। অনুমতি না থাকলে তা গ্রহণ করবেন না।
📖 উল্লেখযোগ্য কিতাব ও ফতোয়া
- রদ্দুল মুহতার (৫/১১৯): কর্মচারী মালিকের সম্পদ অনুমতি ছাড়া নিতে পারে না।
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৪৫): কোনো মুসলিমের সম্পদ তার সন্তুষ্টি ছাড়া নেওয়া জায়েয নয়।
- বাহিশতী জেওর (৩/২৭): আমানতে খিয়ানত কবীরা গুনাহ; হিসাবের বাইরে টাকা নিজে নেওয়া খিয়ানত।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (২/৩৩২): মালিকের অনুমতি ব্যতীত অতিরিক্ত টাকা নিজের করা বৈধ নয়।
সংক্ষিপ্ত ফাতাওয়া
উক্ত টাকা নেওয়া হারাম ও নাজায়েয। এটি আমানতে খিয়ানত ও মালিকের সম্পদ আত্মসাত। অবিলম্বে তওবা করুন, অতীতের সকল টাকা মালিককে ফেরত দিন, এবং ভবিষ্যতে এ কাজ থেকে বিরত থাকুন।