বাচ্চা না হওয়ায় স্বামীর ২য় বিবাহের হক
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
যদিওবা আমি জানি আমার স্বামী দুই স্ত্রীর হোক ঠিকভাবে আদায় করতে পারবেন না।
আল্লাহর ইচ্ছায় আমার করণীয় কি হতে পারে দয়া করে জানাবেন.
Answer
প্রশ্নের উত্তর:
আপনার স্বামীর জন্য দ্বিতীয় বিবাহ করা ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ, তবে শর্ত হলো তিনি উভয় স্ত্রীর মধ্যে সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার (সমান আচরণ, সময়, খরচ ইত্যাদি) করতে সক্ষম হবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তবে যদি তোমরা আশঙ্কা কর যে, এতিম মেয়েদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে না, তবে তোমাদের পছন্দনীয় নারীদের মধ্যে দুই, তিন বা চারটি বিবাহ কর। আর যদি আশঙ্কা কর যে, তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একটিই বিবাহ কর।" (সূরা নিসা: ৩)
অন্য আয়াতে বলেন:
"তোমরা স্ত্রীদের মধ্যে সমান আচরণ করতে কখনোই পারবে না, যদিও তোমরা তার চেষ্টা কর।" (সূরা নিসা: ১২৯)
উল্লিখিত আয়াতদ্বয় থেকে স্পষ্ট যে, ন্যায়বিচার করতে না পারলে দ্বিতীয় বিবাহ করা জায়েজ নয়। তবে ন্যায়বিচার বলতে সম্পূর্ণ সমতা (যা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়) বোঝায় না, বরং সহবাস, সময় বণ্টন, খরচ প্রভৃতি ক্ষেত্রে সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করা। যদি কোনো ব্যক্তি নিজের অক্ষমতা জানা সত্ত্বেও দ্বিতীয় বিবাহ করে এবং ন্যায়বিচার করতে না পারে, তাহলে তিনি গুনাহগার হবেন।
হাদিসে এসেছে:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তির দুটি স্ত্রী আছে এবং সে তাদের মধ্যে পূর্ণ ন্যায়বিচার করে না, কিয়ামতের দিন তার এক পাশ পড়ে যাবে।" (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)
আপনার করণীয়:
১. ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসা
আপনার সন্তান না হওয়া একটি পরীক্ষা। আল্লাহর কাছে অধিক প্রার্থনা করুন, ইস্তেগফার ও দান-সাদকা করুন। আল্লাহ চাইলে অলৌকিকভাবেও আপনাকে সন্তান দিতে পারেন।
২. স্বামীর সাথে খোলামেলা আলোচনা
স্বামীকে দ্বিতীয় বিবাহের বিষয়ে ইসলামি নির্দেশনা বোঝান। তাকে জানান যে ন্যায়বিচার না করতে পারলে এটি পাপ হবে। আপনার অসুবিধা ও চিন্তার কথাগুলো স্পষ্টভাবে জানান।
৩. আইনি ও শরিয়তসম্মত শর্ত আরোপ
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, স্ত্রী বিবাহের সময় বা পরবর্তী সময়ে শর্ত দিতে পারে যে, স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করলে স্ত্রীকে (আপনাকে) তালাক দেওয়ার অধিকার থাকবে অথবা আপনি নিজেকে তালাকপ্রাপ্ত ঘোষণা করতে পারবেন। এটি ‘তালাকে তাফউইজ’ (প্রতিনিধিত্বমূলক তালাক) বলে গণ্য। তবে এজন্য স্বামীর সম্মতি বা চুক্তিপত্র থাকা জরুরি।
বিখ্যাত হানাফি গ্রন্থ "রদ্দুল মুহতার" ও "ফাতাওয়ায় আলমগিরি"তে এসেছে:
যদি স্ত্রী শর্ত করে যে, "আমার উপরে দ্বিতীয় বিবাহ করলে আমি তালাকপ্রাপ্ত হব", তাহলে এটি সম্পাদিত হলে তালাক পতিত হবে। (রদ্দুল মুহতার: ৩/৬৬, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/৩৪৬)
৪. সালিশ ও মধ্যস্থতা
পরিবারের সিনিয়র সদস্য বা মুফতি সাহেবের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করুন। আপনি যদি স্বামীর ন্যায়বিচার করার সামর্থ্য না থাকে বলে নিশ্চিত হন, তাহলে তাকে এ ব্যাপারে সতর্ক করতে দ্বিধা করবেন না।
৫. খোলা (খোলা) বা তালাকের আবেদন
যদি স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করতেই চান এবং আপনি মানসিকভাবে গ্রহণ করতে না পারেন, তাহলে আপনি খোলার (স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাক) মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন। এখানে আপনি কিছু মোহর বা সম্পদ ফিরিয়ে দিতে পারেন। তবে এটি চেষ্টা করার শেষ পদক্ষেপ হওয়া উচিত।
৬. নিজের ইবাদত ও আত্মশুদ্ধি
নিজের ঈমান মজবুত করুন। বেশি বেশি দোয়া করুন, বিশেষ করে সন্তান প্রাপ্তির জন্য। আল্লাহর কাছে আপনার মনের কথা জানান। মহান আল্লাহ বলেন:
"আমার বান্দা যখন আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।" (সূরা বাকারা: ১৮৬)
সংক্ষেপে উত্তর:
- আপনার স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহ বৈধ, কিন্তু ন্যায়বিচার করতে না পারলে তা হারাম।
- আপনি চাইলে শর্তারোপ করতে পারেন যে দ্বিতীয় বিবাহ করলে আপনাকে তালাক দেওয়ার অধিকার থাকবে।
- স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করুন, প্রয়োজনে সালিশ নিন।
- ধৈর্যধারণ ও দোয়া করুন, আল্লাহর রহমত ও কুদরতের ওপর ভরসা রাখুন।
আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দিন। (আমিন)
রেফারেন্স:
- কুরআন: সূরা নিসা ৪:৩, ৪:১২৯
- হাদিস: আবু দাউদ, তিরমিজি
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): ৩/৬৬
- ফাতাওয়ায় আলমগিরি: ১/৩৪৬
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): ৩/৪২৫
- বেহেশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী): বিবাহ অধ্যায়