‘আল্লাহর ওয়াদা’ বলে কসম করলে তা ভঙ্গ করলে কাফফারা ওয়াজিব হয়?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
*** যদি কাফফারা দিতে হয় তাহলে:
এরপর সে ১০ জন কে ১ বেলা খাওয়ায়, এবং পরবর্তীতে জানতে পারে যে ২ বেলা খাওয়াতে হতো। আসলে কি কাফফারা ওয়াজিব হয়েছিল? যদি হয়ে থাকে , তাহলে সেই আধুরা কাফফারা কি নতুন করে আদায় করতে হবে?
এরপর একই ঘটনা আরো ২ বার হয়, যদি কাফফারা দিতে হয় তাহলে মোট ৩ বার দেওয়া লাগবে।
এই মুহূর্তে তার গচ্ছিত সম্পদ বলতে ৮ হাজার টাকা আছে। এছাড়া পারিবারিক ব্যবসায় সময় দেওয়া হয়, সেখান থেকে খুব বেশি টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। এই হালতে কি টাকা দিয়ে কাফফারা আদায় করতে হবে? নাকি রোজা রাখা যাবে?
Answer
প্রশ্নের উত্তর
আপনার প্রশ্নটি কসম (শপথ) ভঙ্গের কাফফারা সম্পর্কিত। নিচে হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হল।
১. কসমের কাফফারা ওয়াজিব হয়েছে কিনা?
আপনি "হে আল্লাহ, এই কাজ আমি আর কখনোই করবো না আপনাকে ওয়াদা দিলাম" বলেছেন। যদিও "কসম" শব্দটি বলেছেন কিনা মনে নেই, কিন্তু আপনার নিয়ত (ইচ্ছা) কসম করার ছিল। হানাফী ফিকহে, যদি কেউ আল্লাহর নাম উল্লেখ করে বা ওয়াদা করার মাধ্যমে কসমের নিয়ত করে, তবে তা শপথ হিসেবে গণ্য হয়। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৭২২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ২/১১৩)
সুতরাং আপনার উক্তিটি একটি বৈধ কসম ছিল এবং তা ভঙ্গ করায় কাফফারা ওয়াজিব হয়েছে।
২. প্রথমবারের কাফফারা: ১০ জনকে ১ বেলা খাওয়ানো কি যথেষ্ট?
না, যথেষ্ট নয়। হানাফী মতে, কসমের কাফফারা হলো:
- ১০ জন মিসকীনকে দুই বেলা খাওয়ানো, অথবা
- প্রত্যেক মিসকীনকে এক সা' (প্রায় ৩.৬ কেজি) গম বা তার মূল্য দেওয়া, অথবা
- ১০ জন মিসকীনকে কাপড় দেওয়া।
(সূরা মায়িদা: ৮৯; আল-হিদায়া, ২/১০২; রদ্দুল মুহতার, ৩/৭৩১)
আপনি ১০ জনকে মাত্র এক বেলা খাওয়ালে কাফফারা আদায় হয়নি। তাই এখন বাকি এক বেলা তাদের খাওয়াতে হবে অথবা প্রত্যেককে অতিরিক্ত এক সা' গমের মূল্য দিতে হবে। অথবা সম্পূর্ণ নতুন করে কাফফারা আদায় করতে পারেন, তবে পূর্বের কাজটি বাতিল বলে গণ্য হবে না। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৪২৩; ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৮০)
৩. পরবর্তী আরও দুইবার কসম ভঙ্গ করায় মোট তিনটি কাফফারা
হ্যাঁ, প্রতিটি আলাদা কসম ভঙ্গের জন্য পৃথক কাফফারা ওয়াজিব। তাই মোট তিনটি কাফফারা আদায় করতে হবে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ২/১১৩; বাহিশতী জেওর, ৬/১২৫)
৪. টাকা দিয়ে কাফফারা নাকি রোজা?
আপনার কাছে গচ্ছিত সম্পদ ৮,০০০ টাকা আছে। হানাফী ফিকহে, কাফফারার জন্য খাওয়ানো বা মূল্য দেওয়ার সামর্থ্য থাকলে রোজা রাখা জায়েজ নয়। সামর্থ্যের মানদণ্ড হলো: কাফফারার খরচ মেটানোর পর আপনার ও আপনার পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, ঋণ পরিশোধ) পূরণ হয় কিনা। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৭৩২; ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৮২)
আপনার ৮,০০০ টাকা দিয়ে তিনটি কাফফারা আদায় সম্ভব কিনা, তা হিসাব করি:
- প্রতি কাফফারার জন্য ১০ জন মিসকীনকে দুই বেলা খাওয়ানোর খরচ (বাংলাদেশের বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী) প্রায় ১,৫০০ - ৩,০০০ টাকা হতে পারে।
- অথবা প্রত্যেক মিসকীনকে এক সা' গমের মূল্য (প্রায় ১০০-১৫০ টাকা) দিলে প্রতি কাফফারায় ১,০০০ - ১,৫০০ টাকা লাগে।
অর্থাৎ তিনটি কাফফারার জন্য সর্বোচ্চ ৯,০০০ টাকা পর্যন্ত লাগতে পারে। আপনার ৮,০০০ টাকা দিয়ে সম্ভবত তা অল্পের জন্য চলে যাবে অথবা কিছুটা কম পড়তে পারে। যদি তা সম্ভব হয়, তবে টাকা দিয়েই কাফফারা আদায় করতে হবে, রোজা নয়। তবে যদি আর্থিক অসুবিধা হয় যে খরচ মেটানোর পর আপনার পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে আপনি একটানা তিনটি রোজা রাখতে পারেন। (কিতাবুল আছল, ৩/১৮৫; ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/১১৩)
প্রথম কাফফারার জন্য আপনি ইতোমধ্যে ১০ জনকে এক বেলা খাইয়েছেন; তাই বাকি এক বেলা বা মূল্য প্রদান করবেন।
সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা
১. আলাদাভাবে তিনটি কাফফারা আদায় করুন।
২. প্রথম কাফফারা: পূর্বের ১০ জনকে আরও এক বেলা খাওয়ান বা প্রত্যেককে অতিরিক্ত এক সা' গমের মূল্য দিন।
৩. দ্বিতীয় ও তৃতীয় কাফফারা: প্রতিটির জন্য ১০ জন মিসকীনকে দুই বেলা খাওয়ান বা সমপরিমাণ মূল্য দিন।
৪. যদি সামর্থ্য না থাকে (আপনার পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচের পর বেঁচে না থাকে), তাহলে প্রতি কাফফারার জন্য তিনটি করে মোট নয়টি রোজা রাখতে পারেন। কিন্তু সামর্থ্য থাকলে রোজা বৈধ নয়।
৫. কসম ভঙ্গের গুনাহ থেকে তওবা করুন এবং ভবিষ্যতে কসম করার ব্যাপারে সাবধান হন।
উল্লেখযোগ্য কিতাবের রেফারেন্স
- কুরআন: সূরা মায়িদা (৫:৮৯)
- হাদীস: সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৮২৩
- রদ্দুল মুহতার: ৩/৭২২-৭৩২
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ২/১১৩
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: ২/৪২৩
- বেহেশতী জেওর*: ৬/১২৫
- ফাতাওয়া উসমানী: ২/২৮০-২৮২