শাশুড়ি আমার থেকে স্বামীকে দূরে রাখতে চায়, এক্ষেত্রে আমার করণীয় কি?

Family Life · Hanafi

Question No: 882
Questioner: Mafia Juthi
Question Asked: 28 May 2026, 12:28 AM
Reviewed & Published: 28 May 2026, 01:00 AM
Views: 230
Tokens: 4,817
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার স্বামী একজন ইর্ন্টান ডাক্তার, তিনি দূরে থাকে, মাসে হয়তো একবার আসে আবার এমন ও আছে দুই মাস পর আসে। আমার স্বামী বাসায় আসলে আমার শাশুড়ি আমাদের রুমে permission ছাড়াই যখন তখন ঢুকে যায়, সারাদিন তার ছেলের সাথে সময় কাটায় শুধু রাতের বেলায় আমার সাথে থাকে, ছেলে কে যখন তখন জড়িয়ে ধরে, জড়িয়ে ধরতে বলে, আমার স্বামী মা ভোক্ত , মায়ের কথায় উঠে বসে। ঈদের er ছুটিতে তিনি আসার পর আমার বাবার বাড়ি তে আসতে দেয় নি, আমি ঈদ আমার বাবার বাড়িতে করছি, তিনি আমার থেকে আমার স্বামীকে দূরে রেখেছে, আমার বাবা আমার স্বামী কে আমাদের বাসায় আসতে বলার জন্য উনি বলেছে উনি চায় উনার ছেলে তার বাবাকে নিয়ে ঈদের নামাজ পড়ুক , আর এত দিন পর ছেলে এসেছে বাসায় উনি চায় না ছেলে কে দূরে পাঠাতে, উনি আমার স্বামীর ফোন থেকে আমার স্বামী হয়ে message দেয় আমাকে।
১|আমার প্রশ্ন হচ্ছে আমার শাশুড়ির কর্মকান্ড কত টুকু যৌক্তিক?
২l আমার কি হক নেই আমার স্বামীর সাথে থাকা?
৩| আমার কি করণীয় এক্ষেত্রে , আমার তো খারাপ লাগে আমার স্বামী ছাড়া থাকতে যেহেতু সে এত দিন পর পর আসে আর আসলেও দুই তিন der জন্য আসে?
৪| মা বাবা কে রেখে স্ত্রীর সাথে ঈদ করলে কি আল্লাহ্‌ পাপ দিবে?
৫|আমার স্বামী ও আমাকে অবহেলা করে, care করে না, খোঁজ ও নেয় না, মায়ের সাথেই থাকে সারাদিন, আমার কষ্ট বুঝে না, আমার সাথে তেমন কথা ও বলে না, রাগ করলে রাগ ভাঙ্গায় না, এতে কি তিনি আমার সাথে জুলুম করতেসে? আমি যদি এক্ষেত্রে তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেই তাহলে কী আমি জাহান্নামের অন্তর্ভুক্ত হব?

Please আমাকে সাহায্য করুন আমার উত্তর গুলো দিয়ে l

Answer

উত্তর: আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর ইসলামী শরিয়ত ও হানাফি ফিকাহ অনুযায়ী নিম্নরূপ দেওয়া হলো:


১. আমার শাশুড়ির কর্মকাণ্ড কতটুকু যৌক্তিক?

উত্তর: ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে শাশুড়ির আচরণ যৌক্তিক নয় বরং তা নাজায়েজ ও জুলুমের শামিল। কারণ:

  • গোপনীয়তা লঙ্ঘন: আপনার রুমে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা শরিয়তসম্মত নয়। কুরআনে আল্লাহ বলেন: "হে মুমিনগণ! তোমরা নিজ ঘর ছাড়া অন্য কারো ঘরে প্রবেশ করো না যতক্ষণ না অনুমতি নাও এবং তার অধিবাসীদের সালাম দাও।" (সূরা আন-নূর, আয়াত ২৭)। শাশুড়ি আপনার রুমে অনুমতি ছাড়া ঢোকা স্পষ্ট ইসলামী আদেশ লঙ্ঘন।
  • স্বামী-স্ত্রীর মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি: শাশুড়ি ইচ্ছাকৃতভাবে আপনার স্বামীকে আপনার থেকে দূরে রাখছেন, এটি অত্যন্ত অন্যায়। ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। আল্লাহ বলেন: "তারা তোমাদের জন্য পোশাকস্বরূপ এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাকস্বরূপ।" (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৮৭)। কেউ এই সম্পর্ক নষ্ট করতে চাইলে তা কবিরা গুনাহ।
  • মিথ্যা বার্তা প্রেরণ: আপনার স্বামীর ফোন থেকে তার নামে মিথ্যা মেসেজ পাঠানো ধোঁকাবাজি ও গুনাহের কাজ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি ধোঁকা দেয়, সে আমার উম্মতের নয়।" (মুসলিম)।

সারসংক্ষেপ: শাশুড়ির এসব কাজ শরিয়তসম্মত নয় এবং তিনি নিজের সন্তানের বৈবাহিক জীবনে অহেতুক হস্তক্ষেপ করে গুনাহগার হচ্ছেন।


২. আমার কি হক নেই আমার স্বামীর সাথে থাকা?

উত্তর: আপনার হক অবশ্যই আছে। ইসলামে স্ত্রীর উপর স্বামীর যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি স্বামীর উপর স্ত্রীরও অধিকার রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো:

  • সঙ্গ ও সহবাসের অধিকার: স্বামী যখন ঘরে থাকেন, তখন স্ত্রীর সাথে সময় কাটানো, ভালো ব্যবহার করা এবং তার শারীরিক ও মানসিক চাহিদা পূরণ করা ফরজ। হাদিসে এসেছে, "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।" (তিরমিজি)।
  • অবহেলা না করার অধিকার: স্বামী যদি দূরে থাকেন, তবে ফিরে এলে স্বাভাবিকভাবেই স্ত্রী তার কাছে সময় পাবেন। শাশুড়ি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে এই সময় কেড়ে নেয়, তবে তা আপনার হক নষ্ট করা।

কুরআন ও হাদিসের দলিল:

  • "আর স্ত্রীদের তোমাদের (স্বামীদের) উপর যেমন অধিকার আছে, তেমনি তাদের উপর তোমাদেরও অধিকার আছে।" (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২২৮)।
  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, স্ত্রীর সাথে ভালো ব্যবহার করা এবং তার অধিকার রক্ষা করা স্বামীর দায়িত্ব।

৩. আমার করণীয় কী?

উত্তর: আপনার জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:

(ক) স্বামীর সাথে সৎ ও বুদ্ধিমত্তার সাথে আলোচনা: তাকে বোঝান যে তার মায়ের আচরণ আপনার কষ্টের কারণ। কিন্তু রাগ করে নয়, বরং কুরআন-হাদিসের আলোকে শান্তভাবে বুঝান। তাকে বলুন যে ইসলামে স্ত্রীর অধিকার এবং মা-বাবার সম্মানের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতে বলা হয়েছে। মায়ের প্রতি অন্ধ আনুগত্য জায়েজ নয় যদি তা অন্যায় হয়।

(খ) পরিবারের সিনিয়র সদস্যের সাহায্য নিন: আপনার বাবা-মা বা অন্য কোনো ধার্মিক ও বিজ্ঞ ব্যক্তির মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করুন। ইসলামে বিবাদ মেটানোর জন্য সালিসের নির্দেশ রয়েছে।

(গ) ধৈর্য ও ইবাদত: এই পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরা এবং বেশি বেশি দোয়া করা (যেমন, "রাব্বানা হাবলানা মিন আজওয়াজিনা..." - সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ৭৪) খুবই কার্যকর। আল্লাহর কাছে সাহায্য চান এবং সালাত আদায় করুন। কুরআনে আছে: "তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর।" (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ৪৫)

(ঘ) আইনি সাহায্য: যদি কোনোভাবেই সমাধান না হয়, তবে স্থানীয় ইসলামী পন্ডিত বা মাদ্রাসার ফাতাওয়া বিভাগের মাধ্যমে পরামর্শ নিতে পারেন। তবে সবচেয়ে ভালো হয় স্বামীকে নিজের দায়িত্ব বোঝানো।


৪. মা-বাবাকে রেখে স্ত্রীর সাথে ঈদ করলে কি গুনাহ হবে?

উত্তর: না, এটি গুনাহ নয়, বরং স্ত্রীর অধিকার রক্ষা করা এবং তার সাথে ঈদ উদযাপন করা সুন্নত ও সওয়াবের কাজ। ইসলামে স্ত্রীকে খুশি রাখাকে ইবাদত বলে গণ্য করা হয়েছে। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো:

  • মা-বাবাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন না করা: ঈদের দিন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি নিয়ে থাকা জায়েজ, কিন্তু মা-বাবাকে আগে থেকে জানিয়ে তাদেরও সম্মান দেখানো উচিত। যদি মা-বাবা অসুস্থ বা একা থাকেন, তবে তাদের কাছে যাওয়াও জরুরি।
  • শাশুড়ির অনুরোধ মান্য করা জরুরি নয়: যদি শাশুড়ি অন্যায়ভাবে আপনার স্বামীকে আপনার কাছ থেকে দূরে রাখতে চান, তবে তার কথায় সায় দেওয়া জরুরি নয়। হাদিসে আছে, "সৃষ্টিকর্তার অবাধ্যতার ব্যাপারে সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" (মুসলিম)।

সারমর্ম: ঈদে স্ত্রীর সাথে থাকা নাজায়েজ নয় বরং প্রশংসনীয়। কিন্তু শাশুড়ি যদি আপনার স্বামীকে অন্যায়ভাবে আটকে রাখে, তবে তিনি নিজেই গুনাহগার।


৫. স্বামীর অবহেলা ও জুলুম, এবং কথা বন্ধ রাখার বিধান

(ক) স্বামী কি জুলুম করছে? হ্যা, আপনার স্বামী যদি ইচ্ছাকৃতভাবে আপনাকে অবহেলা করে, আপনার যত্ন না নেয়, আপনার সাথে কথা না বলে, এবং শুধু মায়ের সাথেই সময় কাটায়, তবে এটি জুলুম। ইসলামে স্বামীকে স্ত্রীর প্রতি ন্যায়বিচার করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

  • হাদিসে এসেছে: "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।" (ইবনে মাজাহ)।
  • ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: "স্বামীর জন্য স্ত্রীকে কষ্ট দেওয়া বা অবহেলা করা হারাম।" (রদ্দুল মুহতার)।

(খ) আপনি কথা বন্ধ রাখলে কি জাহান্নামি হবেন? কথা বন্ধ রাখা বা চুপ থাকা জাহান্নামের কারণ হবে না যদি তা অন্যায় প্রতিরোধের জন্য হয়। কিন্তু নিজ থেকে স্বামীর সাথে কথা না বলা বা তাকে উপেক্ষা করা নাজায়েজ। কারণ:

  • হাদিসে আছে: "কোনো মুসলমানের জন্য তার ভাইয়ের সাথে তিন দিনের বেশি কথা না রাখা জায়েজ নয়।" (বুখারি)।
  • তবে আপনি যদি আদব ও উত্তম পদ্ধতিতে কথা বলা বন্ধ করে দেন অর্থাৎ তাকে উপদেশ দেওয়ার জন্য কিছুদিন চুপ থাকেন, তবে এতে গুনাহ নেই। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদীভাবে কথা না বলা নিষেধ।

করণীয়: আপনার উচিত তার সাথে কথা বলা চালিয়ে যাওয়া, কিন্তু যখন তিনি ভুল করেন তখন সেটা তাকে বুঝিয়ে বলা। রাগ করলে শান্তভাবে বিষয়টি মীমাংসা করার চেষ্টা করুন।


সংক্ষিপ্ত পরামর্শ:

১. আপনার স্বামীর সাথে সরাসরি ও শান্তিপূর্ণ আলোচনা করুন।
২. শাশুড়ির আচরণ সম্পর্কে তাকে কুরআন-হাদিসের দলিল দিয়ে বোঝান।
৩. আল্লাহর কাছে ধৈর্যের জন্য দোয়া করুন (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৫৩-১৫৭)।
৪. প্রয়োজনে স্থানীয় একজন ধর্মীয় ব্যক্তির মধ্যস্থতা নিন।
৫. মনে রাখবেন, ইসলামে ধৈর্য ও সহনশীলতার বিনিময়ে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

উদ্ধৃত গ্রন্থ:

  • তাফসিরে মা'রিফুল কুরআন (সূরা আন-নূর, আল-বাকারা)
  • ফাতাওয়া উসমানি (খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৩৮)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৪৫)
  • রদ্দুল মুহতার (খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৬০৩)
  • সহিহ বুখারী ও মুসলিম

আল্লাহ আপনার ধৈর্যকে কবুল করুন এবং আপনার পরিবারে শান্তি বর্ষণ করুন। আমীন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.