নিকট আত্মীয় যদি কালোজাদু বা কুফরি করে, তাহলে কি তাদের সাথে সম্পর্ক বজায় না রাখলে কোনো গোনাহ হবে?
Family Life · Hanafi
Question
"যেসব আত্মীয়তার সম্পর্ক মনে কষ্ট বয়ে আনে, এমন আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েজ" এই কথাটুকু কতটুকু সত্য?
Answer
নিকট আত্মীয় কালোজাদু বা কুফরি করলে সম্পর্ক রাখার বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
১. নিকট আত্মীয় কালোজাদু বা কুফরি করলে তার সাথে সম্পর্ক রাখা জায়েজ কি না? ২. এক্ষেত্রে আত্মীয়তার হক (সিলাতুর রাহিম) আদায় করতে হবে কি? ৩. "যেসব আত্মীয়তার সম্পর্ক মনে কষ্ট বয়ে আনে, এমন সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েজ" – বক্তব্যটি কতটুকু সঠিক?
উত্তর
আল কুরআন ও হাদিসের আলোকে সিলাতুর রাহিম (আত্মীয়তার সম্পর্ক) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِن تَوَلَّيْتُمْ أَن تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ (সূরা মুহাম্মাদ: ২২)
অর্থ: "তবে কি তোমরা যদি মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তোমরা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করতে থাকবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে?"
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعُ رَحِمٍ (صحيح البخاري: 5984)
অর্থ: "আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।"
সুতরাং নিছক মানসিক কষ্ট বা ব্যক্তিগত অস্বস্তির কারণে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েজ নয়। বরং এমন আচরণ মারাত্মক গুনাহ।
১. আত্মীয় যদি কালোজাদু বা কুফরি করে, তবে সম্পর্ক রাখার বিধান
-
কালোজাদু (সিহর) ইসলামী শরিয়তে কবিরা গুনাহ এবং শিরকের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: اجتنبوا السبع الموبقات... السحر (صحيح البخاري: 2766) অর্থাৎ "তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে বেঁচে থাকো... তন্মধ্যে জাদু অন্যতম।" অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতে, জাদু শিক্ষা দেওয়া ও চর্চা করা কুফরি।
-
যদি কোনো আত্মীয় প্রকাশ্যে কুফরি বা শিরকে লিপ্ত থাকে, তবে তার সাথে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করা জরুরি নয়; বরং সম্পর্ক বজায় রেখে তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। তবে যদি তার সাথে চলাফেরা করা বা উঠাবসা করা নিজের ঈমানের জন্য ক্ষতিকর হয় (যেমন সে নিজের কুফরি মতবাদ প্রচার করে এবং আপনি দুর্বল), তাহলে তাকে এড়িয়ে চলা জরুরি হতে পারে।
-
হানাফি ফিকাহর কিতাবসমূহে বলা হয়েছে: যদি আত্মীয় প্রকাশ্যে ফাসেক (পাপী) হয় এবং তার সাথে যোগাযোগ রাখলে আপনার দ্বীন ও আমলের কোনো ক্ষতি না হয়, তবে তাকে সিলাতুর রাহিমের আওতায় রাখা উত্তম। কিন্তু যদি তার কারণে আপনার আমলে খারাবি আসে বা ফেতনায় পড়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তাকে এড়িয়ে চলা জায়েজ—তবে সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়; বরং পরিমিতভাবে যোগাযোগ রাখা।
(রদ্দুল মুহতার: ৬/৪১৫; ফাতাওয়া উসমানি: ২/৫১৬; ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/২৪১)
২. এমতাবস্থায় আত্মীয়তার হক আদায় করা
আত্মীয়তার হক (হকুকুল আরহাম) কখনোই পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায় না, যদিও আত্মীয় পাপী বা কাফির হয়। তবে সেটা আদায়ের পদ্ধতি পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন হতে পারে:
-
মৌলিক হকসমূহ: সাক্ষাৎ করা, খোঁজখবর নেওয়া, অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া, প্রয়োজনে সাহায্য করা—এগুলো যতটুকু সম্ভব এবং নিজের ঈমান-আমলের জন্য ক্ষতিকর না হয়, ততটুকু আদায় করা ওয়াজিব।
-
যদি সে প্রকাশ্যে কুফরি বা শিরকে লিপ্ত হয় এবং তাকে সহায়তা করা বা তার সাথে মেলামেশা করলে দ্বীনের ব্যাপারে শিথিলতা আসে, তাহলে সীমিত আকারে সম্পর্ক রাখা জায়েজ। যেমন: শুধু ফোনে খোঁজ নেওয়া বা প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখা, কিন্তু নৈকট্য ও উঠাবসা থেকে বিরত থাকা।
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: "لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلَاثٍ" (صحيح مسلم: ٢٥٦٠)
অর্থ: "কোনো মুসলমানের জন্য জায়েজ নয় যে, সে তার ভাইয়ের সাথে তিন দিনের বেশি সম্পর্ক ছিন্ন রাখবে।" (এখানে "ভাই" বলতে মুসলিম ভাই বোঝানো হয়েছে, তবে কাফির নিকটাত্মীয়ের ক্ষেত্রেও ন্যূনতম সম্পর্ক বজায় রাখা কর্তব্য—ইমাম নববির ব্যাখ্যা)
হানাফি ফাতাওয়ায় এসেছে: কাফির আত্মীয়ের সাথেও সিলাতুর রাহিম রক্ষা করা ওয়াজিব। তবে যদি তাতে দ্বীনের জন্য ফেতনা হয়, তাহলে দূরত্ব বজায় রাখা যেতে পারে, কিন্তু সম্পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদ নয়।
(ফাতাওয়া আলমগিরি: ৫/৩৭৫; রদ্দুল মুহতার: ৬/৪১৫; ফাতাওয়া উসমানি: ২/৫১৮)
৩. "যেসব সম্পর্ক মনে কষ্ট বয়ে আনে, তা ছিন্ন করা জায়েজ" – বক্তব্যটি কতটুকু সত্য?
এ বক্তব্যটি সাধারণভাবে সঠিক নয়। ইসলামী শরিয়তে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার অনুমতি কেবলমাত্র সেসব ক্ষেত্রে দেওয়া হয়েছে, যেখানে:
- আত্মীয় দ্বীন ও ঈমানের জন্য স্পষ্ট হুমকি (যেমন: কুফরির দিকে আহ্বান করে)।
- সম্পর্ক বজায় রাখলে আপনি নিজের ঈমান-আমলের ক্ষতিতে পড়বেন।
- আত্মীয় আপনার ও আপনার পরিবারের জন্য শারীরিক বা আর্থিক ক্ষতি করে।
নিছক মানসিক কষ্ট, মেজাজের অসামঞ্জস্য, বা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েজ নয়। বরং এটা কবিরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: "سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ وَأَنْ يُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ" (صحيح البخاري: 2067)
অর্থ: "যে ব্যক্তি তার রিজিক প্রশস্ত করতে এবং তার বয়স দীর্ঘায়িত করতে চায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।"
সুতরাং কষ্ট এলেও ধৈর্যের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাই ইসলামের নির্দেশ। তবে যদি কষ্টটি ধর্মীয় ক্ষতির কারণ হয়, সেক্ষেত্রে সীমিত আকারে সম্পর্ক রাখার নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে।
পরিশেষে
- নিকট আত্মীয় কালোজাদু বা কুফরি করলে তাকে নরম ভাষায় সঠিক পথের দাওয়াত দেওয়া জরুরি। যদি সে স্পষ্ট কাফির বা মুশরিক হয়, তবে তার সাথে বসবাস ও উঠাবসা থেকে দূরে থাকাই উত্তম, কিন্তু খোঁজখবর, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা এবং সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন না করা জরুরি।
- সিলাতুর রাহিমের হক যেমন সাক্ষাৎ, সহানুভূতি, প্রয়োজনে সাহায্য—এগুলো যতটুকু সম্ভব আদায় করতে হবে।
- "মনে কষ্ট এলেই সম্পর্ক ছিন্ন" – এ বক্তব্য কুরআন ও হাদিসের বিপরীত। ইসলাম ধৈর্য ও সওয়াবের নিয়তে কষ্ট সহ্য করাকে উৎসাহিত করে, সম্পর্ক ছিন্ন করতে নয়।
উত্তম পদ্ধতি:
- আত্মীয়কে গোপনে ভালো counsell বা উপদেশ দেওয়া।
- তার সাথে সাক্ষাৎ ও কথাবার্তায় দৃঢ়তার সাথে সঠিক কথা বলা।
- প্রয়োজনে আলাদা থাকা, কিন্তু সম্পূর্ণ বিরতি না দেওয়া।
- নিজের দ্বীন ও পরিবারকে ফেতনা থেকে বাঁচাতে কৌশল অবলম্বন করা।
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا
আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে চলার তাওফিক দিন। (আমিন)
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলি:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনু আবিদীন): ৬/৪১৫-৪১৬
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): ২/৫১৫–৫১৮
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভি): ৪/২৪০–২৪২
- ফাতাওয়া আলমগিরি: ৫/৩৭৫
- বাহিশতি জেওর (মাওলানা থানভি): ৮ম অধ্যায় (আত্মীয়তার অধিকার)
- আল-হিদায়া: ২/৪১৯
- সুনানে আবু দাউদ: হাদিস নং ১৬৬১ (সিলাতুর রাহিমের গুরুত্ব)