শরীয়াহ আইন যেহেতু নেই, তাই অপরাধ করলে বেচে যাবো, এমনকিছু মনে আসলে ইমানে কি কোনো সমস্যা হবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২।কেউ যদি মনে করে ভিতর থেকে বলে বা বিশ্বাস করে শরীয়াহ আইন উত্তম সে গোনাহগার এইজন্য চায়না শরীয়াহ আইন বাস্তবায়ন হোক কারন শরীয়াহ আইনে অপরাধ করে পার পাবেনা।দেশের আইনে বেচে যাবে। যেমন পরকিয়া করলে মৃত্যুদন্ড থেকে বেচে যাবে। এমন কিছু মনে বা ভিতরে আসে ইমান চলে যাবে আর মুখ দিয়ে উচ্চারণ করলে ইমান কি চলে যাবে
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রশ্নদ্বয়ের উত্তর নিম্নরূপঃ
১. শরীয়াহ আইন বাস্তবায়ন না থাকায় গোনাহ করলে ছাড় পাওয়া যাবে—এমন চিন্তা মনে এলে ঈমান যাবে কি?
উত্তরঃ যদি কোনো ব্যক্তি মনে করে বা বিশ্বাস করে যে, "শরীয়াহ আইন বাস্তবায়ন না থাকায় আমি গোনাহ করলে পার পেয়ে যাব", আর এই বিশ্বাসের কারণে সে গোনাহ করাকে জায়েজ বা হালাল মনে করে—তবে তা ঈমান বিনষ্ট হওয়ার কারণ। কেননা ইসলামের কোনো হারামকে হালাল মনে করা বা আল্লাহর বিধানকে তুচ্ছ জ্ঞান করা কুফরী। কিন্তু যদি সে কেবল নিজের নফসের দুর্বলতার কারণে এমন চিন্তায় আক্রান্ত হয়, কিন্তু অন্তরে শরীয়াহ আইনকে উত্তম ও বাস্তবায়নের কামনা রাখে এবং গোনাহ করাকে খারাপ জানে, তাহলে শুধু এই চিন্তা আসায় ঈমান চলে যায় না। তবে এ ধরনের চিন্তা শয়তানি প্ররোচনা, যা থেকে তওবা করা ও অন্তরকে সংশোধন করা জরুরি।
হানাফী ফিকহের আলোকে নিয়মঃ
- কুফরী হয় যখন কেউ দ্বীনের কোনো অকাট্য বিধানকে অস্বীকার করে বা বিদ্রুপ করে বা হালাল মনে করে। (রদ্দুল মুহতার, কিতাবুল ইমান)
- إذا خطر بباله شيء من الوساوس فدفعه فهو علامة الإيمان (যদি শয়তানি প্ররোচনা আসে এবং সে তা প্রতিরোধ করে, তবে এটাই ঈমানের নিদর্শন)
সুতরাং, শুধু "মনে আসা" ঈমান নষ্ট করে না, বরং সে চিন্তাকে বিশ্বাসে পরিণত করা বা হালাল জ্ঞান করাই ঈমান নষ্টের কারণ।
২. যদি কেউ মনে করে যে, শরীয়াহ আইন উত্তম, কিন্তু নিজে গোনাহগার হওয়ায় সে চায় না শরীয়াহ আইন বাস্তবায়ন হোক, বরং দেশের আইনে ছাড় পেতে চায়—এমন বিশ্বাসে ঈমান যাবে কি?
উত্তরঃ এখানে দুটি বিষয় পৃথক করা জরুরি:
(ক) যদি সে অন্তরে শরীয়াহ আইনকে উত্তম জানে এবং তা বাস্তবায়িত হোক তা চায়, কিন্তু নিজের গোনাহের কারণে শুধু নিজের স্বার্থে বাস্তবায়ন না চায়—তাহলে এটি দ্বীনের বিধানের প্রতি বিদ্বেষ বা তুচ্ছজ্ঞান নয়, বরং নিজের প্রবৃত্তির দুর্বলতা। এটি গোনাহ হলেও কুফরী নয়। তবে এটা গুরুতর পাপ, কারণ সে আল্লাহর আইনকে নিজের প্রবৃত্তির কাছে তুচ্ছ করছে। এ থেকে তওবা করা ফরজ।
(খ) কিন্তু যদি সে শরীয়াহ আইনকে উত্তম জেনেও এ কারণে অপছন্দ করে যে, তাতে অপরাধীর শাস্তি কঠোর, আর দেশের আইনে সহজে ছাড় পাওয়া যায়—এই মানসিকতা যদি দ্বীনের বিধানের প্রতি অবজ্ঞা ও বিদ্বেষে পরিণত হয়, তাহলে তা কুফরী হতে পারে। কেননা আল্লাহর আইনকে অপছন্দ করা বা তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা ঈমানের পরিপন্থী। (সূরা আল-মুজাদালাহঃ ২২)
হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গিঃ
- من كره حكما من أحكام الله فقد كفر (যে আল্লাহর কোনো হুকুমকে অপছন্দ করল, সে কাফির হয়ে গেল) — (ফাতাওয়া উসমানী, কিতাবুল ইমান)
- তবে কেবল নিজের দুর্বলতা ও গোনাহের কারণে লজ্জায় শরীয়াহ বাস্তবায়ন না চাওয়া যদি হৃদয়ে দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা থাকে, তবে তা কুফরী নয়, বরং গুনাহ।
মুখে উচ্চারণ করলেঃ
যদি কেউ মুখে এমন কথা বলে যে, "শরীয়াহ আইন বাস্তবায়ন হলে আমি পার পাবো না, তাই আমি দেশের আইন চাই"—এবং এই কথার মাধ্যমে দ্বীনের বিধানকে তুচ্ছ করা বা বিদ্রুপ করা উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তা কুফরী। কিন্তু যদি কেবল নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করে, আর অন্তরে দ্বীনের প্রতি সম্মান থাকে, তাহলে কুফরী না হলেও জানা উচিত যে দ্বীনের ব্যাপারে এ ধরনের অসংযত কথা বলা কঠোর গুনাহ।
সারসংক্ষেপঃ
| অবস্থা | ঈমানের উপর প্রভাব | |--------|-------------------| | শুধু শয়তানি প্ররোচনা মনে আসা | ঈমান যায় না | | গোনাহ হালাল জ্ঞান করা বা শরীয়াহ আইনকে অপছন্দ করার বিশ্বাস | ঈমান যায় (কুফরী) | | শরীয়াহ উত্তম জেনেও নিজের দুর্বলতার কারণে বাস্তবায়ন না চাওয়া (অন্তরে ভালোবাসা রেখে) | ঈমান যায় না, তবে গুনাহ | | মুখে দ্বীনের বিধানকে বিদ্রুপ করে বলা | কুফরী |
উপদেশঃ উক্ত চিন্তাগুলো শয়তানের ধোঁকা থেকে আসে। দ্রুত তওবা করুন এবং অন্তরকে দ্বীনের প্রতি ভালোবাসায় পূর্ণ করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন, "যারা ঈমান আনে, তাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণে ও সত্য দ্বীন অবতীর্ণ হওয়ার কারণে প্রশান্ত হয়।" (সূরা আর-রাদঃ ২৮)
রেফারেন্স সমূহঃ
- রদ্দুল মুহতার, কিতাবুল ইমান
- ফাতাওয়া উসমানী, দ্বিতীয় খণ্ড (বাবুল ইমান)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, কিতাবুল ইমান
- বাহিশতী জেওর, ঈমান সম্পর্কিত অধ্যায়
- তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন (সূরা আল-মুজাদালাহ-এর তাফসীর)