নফল কুরবানি করব পুরোটা গোশত গরিব অসহায় কে দিবো নাকি সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দিবো কোনো ছাত্র কে বা প্রতিষ্ঠানে কোনটা উত্তম হবে
Qurbani-Slaughtering · Hanafi
Question
আর বোনটার পরিবার ও কি মাফ পাবে? এ কুরবানির সওয়াব ও-ই কাজের মেয়ের জন্য আল্লাহ দিক তাকে আমিরাতে সম্মানিত করুক এটাই চায়
আরেকটা বিষয় ছাগল কুরবানির জন্য দিবে নাকি সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দিবে এটা বুঝতে পারছে না
কোনটা বেশি উত্তম হবে
আল্লাহ সহজ করলে কবুল করলে
কোনটা সওয়াবের দিকে অধিক সেটাই ও-ই কাজের মেয়ের জন্য করতে চায়
Answer
প্রশ্নোত্তর: গুনাহ থেকে মুক্তি ও নফল কুরবানি
প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত বিবরণ
প্রশ্নকারী তার এক বোনের অতীতের একটি ভুলের কথা উল্লেখ করেছেন। বোনটি শৈশবে (তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াকালীন) একটি দোষ করেছিল, যার ফলে পরিবারের সবাই কাজের মেয়ে ও তার পরিবারকে অপমান করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। বর্তমানে বোনটি ইসলামের আলো পেয়েছে এবং অনুতপ্ত। সে কাজের মেয়েটিকে খুঁজে পাচ্ছে না, কিন্তু তার পক্ষ থেকে কুরবানি বা সদকা দিতে চায়। জানতে চায়:
- কাজের মেয়ের পক্ষ থেকে কুরবানি দিলে তা কি নফল কুরবানি হিসেবে গণ্য হবে? এতে কি গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে?
- বোনের পরিবারের অন্য সদস্যরাও কি ক্ষমা পাবে?
- ছাগল কুরবানি হিসেবে দেওয়া উত্তম নাকি সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেওয়া উত্তম?
১. গুনাহ থেকে মুক্তির শর্ত ও পদ্ধতি
গুনাহ মাফের মূলনীতি
ইসলামে গুনাহ মাফের জন্য তিনটি শর্ত অপরিহার্য:
- গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা
- আনুতপ্ত হওয়া (নদমত)
- ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প
যদি গুনাহটি বান্দার হকের সাথে সম্পর্কিত হয় (যেমন কারো ইজ্জত নষ্ট করা, অপমান করা, গীবত করা ইত্যাদি), তাহলে এর জন্য ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কাছ থেকে ক্ষমা চাওয়া বা তার হক আদায় করা জরুরি। যদি তাকে পাওয়া না যায়, তাহলে তার জন্য সদকা ও দোয়া করা যেতে পারে।
উল্লেখিত ঘটনার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ
- বোনটি শৈশবে (তৃতীয়/চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী) এই ভুল করেছিল। নাবালক অবস্থায় করা গুনাহের জন্য পূর্ণ দায়িত্ব শরীয়তে আরোপিত হয় না। বরং এটি অপরিণত বয়সের অবহেলা হিসেবে গণ্য হবে।
- বর্তমানে বোনটি তাওবা করেছে এবং অনুতপ্ত। তার জন্য প্রয়োজন:
- আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার ও তাওবা করা
- কাজের মেয়েটির জন্য দোয়া করা ও তার সন্তুষ্টির জন্য সদকা করা
- অতীতের ভুলের জন্য লজ্জিত হওয়া ও ভবিষ্যতে সতর্ক থাকা
ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.)-এর মতে, যদি হকদারকে পাওয়া না যায়, তাহলে তার পক্ষ থেকে সদকা করা জায়েয এবং তা তার জন্য কল্যাণকর হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৪২৪)
২. কাজের মেয়ের পক্ষ থেকে কুরবানি দেওয়া - বিধান ও উত্তম পদ্ধতি
কুরবানির সওয়াব অন্যকে দেওয়া
হানাফি মাযহাবে নফল কুরবানি (ওয়াজিব নয় এমন কুরবানি) করার পর তার সওয়াব অন্য কাউকে দান করা জায়েয। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, অন্যকে সওয়াব পৌঁছানোর নিয়তে কুরবানি করা যায়। অধিকাংশ হানাফি ফকীহ এই মত গ্রহণ করেছেন। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/২৯৪; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪২১)
কুরবানি বনাম সদকায়ে জারিয়া - কোনটি উত্তম?
| কুরবানি | সদকায়ে জারিয়া | |------------|-------------------| | এটি নির্দিষ্ট সময়ের (১০-১২ জিলহজ) ইবাদত | এটি চলমান সওয়াব দেয় (যেমন মসজিদ, কূপ, এতিমখানা ইত্যাদি) | | গোশত বিতরণের মাধ্যমে উপকার সীমিত | দীর্ঘমেয়াদে উপকার চলতে থাকে | | সরাসরি ওয়াজিব না হলে নফল হিসেবে গণ্য | নফল দান হিসেবে অধিক সওয়াবের আশা |
উত্তম পদ্ধতি:
- যদি বোনটি সামর্থ্যবান হয়, তাহলে নফল কুরবানি করে সওয়াব কাজের মেয়েকে দান করার নিয়ত করা উত্তম। কারণ কুরবানি একটি মহান ইবাদত এবং এর মাধ্যমে গুনাহ মাফের আশা বেশি।
- একই সাথে কিছু সদকায়ে জারিয়া (যেমন এতিমখানায় দান, মসজিদ নির্মাণে সাহায্য) করাও ভালো। কারণ এটি স্থায়ী সওয়াব যোগায়।
- তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাওবা ও ইস্তেগফার। কুরবানি বা সদকা গুনাহ মাফের সহায়ক, কিন্তু মূল শর্ত হলো আন্তরিক তাওবা।
নফল কুরবানির বিধান
- নফল কুরবানি করা জায়েয এবং এতে সওয়াব রয়েছে।
- কুরবানির গোশত নিজে খাওয়া, আত্মীয়-স্বজনকে দান করা এবং গরিব-মিসকিনকে দান করা সুন্নত।
- সওয়াব অন্যকে দান করার নিয়ত করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে ইনশাআল্লাহ। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/২৯৪)
৩. পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ক্ষমা প্রসঙ্গ
- গুনাহের দায়িত্ব ব্যক্তিগত: প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের কর্মের জন্য দায়ী। কেউ কারো গুনাহ বহন করবে না। (সূরা আনআম, ৬:১৬৪)
- পরিবারের যেসব সদস্য সচেতনভাবে কাজের মেয়েকে অপমান করেছে, তাদের প্রত্যেকের জন্য পৃথকভাবে তাওবা করা জরুরি।
- বোনের তাওবা ও কুরবানির সওয়াব স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবারের অন্য সদস্যদের গুনাহ মাফ করাবে না। তবে তারা যদি অনুতপ্ত হয় এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, তাহলে আল্লাহ তাদেরও ক্ষমা করতে পারেন।
৪. ব্যবহারিক নির্দেশনা
- তাওবা ও ইস্তেগফার: বোনটি প্রতিদিন অন্তত ১০০ বার "আস্তাগফিরুল্লাহ" পড়বে এবং গুনাহ মাফের জন্য দোয়া করবে।
- কাজের মেয়ের জন্য দোয়া: "হে আল্লাহ, তুমি তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত করো এবং আমার পক্ষ থেকে তার প্রতি অপরাধ ক্ষমা করে দাও।"
- নফল কুরবানি: সামর্থ্য থাকলে জিলহজ মাসে একটি ছাগল কিনে কুরবানি করবে এবং নিয়ত করবে: "হে আল্লাহ, এই কুরবানির সওয়াব আমার (নিজের) ও (কাজের মেয়ের নাম) এর জন্য কবুল করো।"
- সদকা: কাজের মেয়ের নামে কিছু স্থায়ী সদকা (যেমন মসজিদে চাঁদা, কূপ খনন, এতিমখানায় সাহায্য) করতে পারে।
মহান আল্লাহ বলেন:
"নিশ্চয়ই নেক আমল মন্দ আমলকে দূর করে দেয়।" (সূরা হুদ, ১১:১১৪)
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:
"যে ব্যক্তি কোনো গুনাহ করে, অতঃপর উত্তমরূপে অজু করে দুই রাকাত নামায পড়ে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।" (তিরমিজি, হাদিস: ৪০৬)
মোটকথা:
- বোনটি যদি আন্তরিকভাবে তাওবা করে এবং নফল কুরবানি করে সওয়াব কাজের মেয়েকে দান করে, তাহলে গুনাহ মাফের আশা করা যায়।
- সবচেয়ে উত্তম হলো কুরবানি করা (যদি সামর্থ্য থাকে) এবং পাশাপাশি কিছু সদকায়ে জারিয়া করা।
- পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জন্য পৃথক তাওবা করা জরুরি।
- সর্বোপরি, আল্লাহর রহমত অপরিসীম। তিনি বান্দার তাওবা কবুল করেন এবং গুনাহ ক্ষমা করে দেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে তাওবার তাওফিক দান করুন এবং কবুল করুন। আমিন।
উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকি উসমানী)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী)
- বেহেশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী)