পিতার ব্যাংক ঋণ থাকলে কি কুরবানি ওয়াজিব হবে?

Qurbani-Slaughtering · Hanafi

Question No: 813
Questioner: Allah Ta'alar Banda
Question Asked: 26 May 2026, 09:28 PM
Reviewed & Published: 26 May 2026, 09:42 PM
Views: 90
Tokens: 5,162
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

যদি আমার বাবা একটি ব্যাংকে তার বসত ভিটা মর্টগেজ রেখে মারা যায়, তবে তার ওয়ারিশদের যারা এই বাড়ির মালিকানা পায় ওয়ারিশ সুত্রে, তাদের উপর বিধান কি? এই ঋণ কি তাদের উপরও বর্তাবে? আর এই অবস্থায় তাদের কাছে যে পরিমাণ সম্পদ আছে, তা দ্বারা কুরবানী ওয়াজিব হয়? কিন্তূ যদি ঋণ তাদের উপর বর্তায়, তাহলে আবার কুরবানীর নেসাব থেকে ঋণ অনেক বেশি হয়ে যায়। এই অবস্থায় পরিষ্কার বিধান কি?

Answer

উত্তর

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
আপনার বাবা একটি ব্যাংকে তার বসতভিটা বন্ধক (মর্টগেজ) রেখে মারা গেছেন। এখন ওয়ারিশগণ (উত্তরাধিকারী) সেই বাড়ির মালিক হন। জানতে চান:

  1. বাবার এই ঋণ কি ওয়ারিশদের উপরও বর্তাবে?
  2. ওয়ারিশদের কাছে যদি কুরবানীর নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, কিন্তু ঋণ অনেক বেশি হয়, তাহলে কীভাবে কুরবানীর বিধান নির্ধারণ হবে?

১. ঋণ কি ওয়ারিশদের উপর বর্তাবে?

না, ঋণ ওয়ারিশদের ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়।
ইসলামী শরীয়ত অনুসারে, মৃত ব্যক্তির ঋণ তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে আদায় করতে হয়। ওয়ারিশগণ নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে ঋণ পরিশোধ করতে বাধ্য নন। তবে তারা চাইলে নিজেদের সম্পদ থেকে ঋণ পরিশোধ করে সম্পত্তি রক্ষা করতে পারেন।

  • কুরআন ও সুন্নাহর নীতি:

    "মৃত ব্যক্তির অসিয়ত ও ঋণ আদায়ের পরই সম্পদ বণ্টন করবে।" (সূরা আন-নিসা: ১১-১২)

  • হানাফী ফিকহের নির্দেশনা:

    • রদ্দুল মুহতার (৫/৪৫৬): মৃতের ঋণ তার সম্পদ থেকে পরিশোধ করতে হবে। ওয়ারিশদের ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়।
    • ফতোওয়া হিন্দিয়া (৬/১৫১): মৃত ব্যক্তির ঋণ সম্পদ থেকে পরিশোধের পর অবশিষ্ট সম্পদ ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন হবে।

ব্যবহারিক বিধান:

  • বাবা যে ব্যাংকে বন্ধক রেখেছিলেন, সেই ব্যাংক বাড়িটির উপর দাবি রাখে। তাই ওয়ারিশদের উচিত:
    • বাড়ি বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করা, অথবা
    • নিজেদের অর্থ দিয়ে ঋণ মিটিয়ে বাড়ি নিজেদের করে নেওয়া।
  • যদি তারা ঋণ পরিশোধ না করে, তাহলে ব্যাংক বাড়িটি দখল করতে পারে। তবে তাদের ব্যক্তিগত সম্পদ জবরদখল করা যাবে না

২. কুরবানীর বিধান কী?

কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার শর্ত:
কুরবানীর দিন (১০-১২ জিলহজ) সকালে ওয়ারিশের নিজস্ব মালিকানায় নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকতে হবে। নেসাব হলো:

  • ৮৭.৪৮ গ্রাম সোনা (সাড়ে সাত ভড়ি স্বর্ণ) অথবা
  • ৬১২.৩৬ গ্রাম রূপা(সাড়ে বায়ান্ন ভড়ি রূপা) অথবা সাড়ে বায়ান্ন ভড়ি রূপার সমপরিমাণ নগদ টাকা বা ব্যবসায়িক পণ্য কিংবা প্রয়োজন অতিরিক্ত ঘরের আসবাবপত্র।

হানাফী ফিকহের নির্দেশনা:

  • ফতোওয়া উসমানী (২/৪২৪) ও রদ্দুল মুহতার (২/১৯৫): নেসাব গণনায় ব্যক্তিগত ঋণ বাদ দেওয়া হয়। তবে মৃত ব্যক্তির ঋণ ওয়ারিশের নিজস্ব ঋণ নয়, তাই তা তার নেসাব থেকে কাটা যাবে না।

উদাহরণসহ ব্যাখ্যা:
ধরুন, বাবার বাড়ির বাজারমূল্য ১০ লাখ টাকা, ব্যাংকের ঋণ ৮ লাখ টাকা। একজন ওয়ারিশের অংশ যদি ২ লাখ টাকা হয় (অর্থাৎ বাড়ির অবশিষ্ট মূল্য ২ লাখ), তাহলে:

  • সেই ওয়ারিশের নিকট যদি নেসাব পরিমাণ অন্যান্য সম্পদ (নগদ, সোনা ইত্যাদি) থাকে, তাহলে তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে। এই বাড়ী ব্যতিত অন্যান্য আর কোনো সম্পত্তি না থাকলে কুরবানি ওয়াজিব হবে না।
  • কিন্তু যদি সে নিজেই ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব নেয় (যেমন বাড়ি নিজের করে নেওয়ার জন্য ঋণ মিটিয়ে দেয়), তাহলে সেই ঋণ তার নিজস্ব দায়িত্ব হয়ে যাবে। তখন তার মোট সম্পদ থেকে সেই ঋণ বাদ দিয়ে নেসাব দেখতে হবে। অর্থাৎ, সে যদি ২ লাখ টাকা বাড়ি পেয়েছে, কিন্তু ব্যাংককে ৮ লাখ দিয়েছে, তাহলে তার নিট সম্পদ ঋণাত্মক হওয়ায় কুরবানী ওয়াজিব হবে না।

মূল নীতি:

  • মৃতের ঋণ ওয়ারিশের নিজস্ব ঋণ নয়, তাই তা নেসাব গণনায় কাটা যাবে না।
  • বাড়ির নিট মূল্য (বাজারমূল্য – ঋণ) ওয়ারিশের সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে।
  • ওয়ারিশ যদি ঋণ নিজে পরিশোধ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেই পরিশোধিত অর্থ তার নিজস্ব দায়িত্বে চলে আসে।

পরিষ্কার বিধান (সংক্ষেপে):

| অবস্থা | বিধান | |--------|--------| | ওয়ারিশ যদি বাড়ি বিক্রি করে অথবা ঋণ পরিশোধ না করে (অর্থাৎ বাড়ি ব্যাংক চলে যায়) | তাহলে তার নিকট বাড়ির কোনো সম্পদ থাকে না। তার অন্যান্য সম্পদ নেসাব পরিমাণ থাকলে কুরবানী ওয়াজিব। | | ওয়ারিশ যদি নিজেই ঋণ পরিশোধ করে বাড়ি নিজের করে নেয় | তাহলে ঋণ তার ব্যক্তিগত দায়িত্ব হবে। তার মোট সম্পদ থেকে ঐ ঋণ বাদ দিয়ে নেসাব দেখতে হবে। নেসাব থাকলে কুরবানী ওয়াজিব, না থাকলে নয়। | | ওয়ারিশের নিকট বাড়ির অংশ (নিট মূল্য) ও অন্যান্য সম্পদ মিলিয়ে নেসাব হয় | তাহলে কুরবানী ওয়াজিব (এমনকি বাবার ঋণ এখনও পুরোপুরি পরিশোধ না হলেও, যেহেতু তা ওয়ারিশের ব্যক্তিগত ঋণ নয়)। |

সতর্কতা:
মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ না করে সম্পদ বণ্টন করা গুনাহ। তাই ওয়ারিশদের উচিত প্রথমে বাবার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করা (বাড়ি বিক্রি করে অথবা নিজ অর্থ দিয়ে) এবং তারপর অবশিষ্ট সম্পদ নিজেদের মধ্যে বণ্টন করা।


রেফারেন্স (হানাফী কিতাব থেকে):

  1. রদ্দুল মুহতার, ৫/৪৫৬ – মৃতের ঋণ সম্পদ থেকে পরিশোধের বিধান।
  2. ফতোওয়া আলমগিরী, ৬/১৫১ – ওয়ারিশের ব্যক্তিগত দায়িত্ব না হওয়া।
  3. ফতোওয়া উসমানী, ২/৪২৪ – নেসাব গণনায় নিজস্ব ঋণ কাটার নিয়ম।
  4. ইমদাদুল ফতোয়া, ২/২৩৭ – কুরবানীর নেসাব ও ঋণের সম্পর্ক।
  5. বেহেশতী জেওর, কুরবানীর অধ্যায় – নেসাব নির্ধারণ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.