স্বপ্নে সাপ দেখা, দুঃস্বপ্ন, শয়তানের ভয়, রুকাইয়া ও বমি হওয়া—ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এর ব্যাখ্যা ও করণীয়।

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 8096
Questioner: SHARMIN
Question Asked: 07 Nov 2026, 04:36 AM
Reviewed & Published: 07 Nov 2026, 05:05 AM
Views: 37
Tokens: 5,709
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। শেষ দুইদিন পর পর ফজর ওয়াক্তে ও জুমআর ওয়াক্তের দিকে স্বপ্নে দেখছি সাপ আর সাপ।জুমআর দিন যে স্বপ্নটা দেখেছিলাম সেখানে সাপটা আমায় কামড় দেয় তবে কামড় দেয়া অবস্থায় আমি সাপটাকে কেটে টুকরো টুকরো করি। আজ ফজরের ওয়াক্তের আগে আগে আমার বোন কিছু একটা স্বপ্ন দেখে ঘুমেই চিলাচ্ছে আপু পড়ে গেল!আপু,পড়ে গেল।এইগুলো কি কোনো বিপদের আশংকা, না শয়তানের দেখানো ভয়?বিপদের আশংকা থাকলে আমার করণীয়তা কী হবে?কিছুদিন আগে রুকাইয়া আম্মা করেছিলাম।সেখানে এক আপু আস সাররহ্ এই রকম কি যেন একটা আয়াত পড়ার সময় আমার বমি হয়।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর: স্বপ্নে সাপ দেখা সাধারণত কোনো নিশ্চিত বিপদের প্রমাণ নয়; এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা বা ভয় দেখানোর একটি মাধ্যম হতে পারে। তবে ইসলামে স্বপ্নের একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা-পদ্ধতি রয়েছে, এবং স্বপ্নের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা পোষণ করা উচিত নয়। আপনার করণীয় হলো—আল্লাহর উপর ভরসা রাখা, নিয়মিত কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক আমল করা, স্বপ্নের ভয়ে অস্থির না হওয়া, এবং প্রয়োজনে রুকাইয়া শরীয়াহ (শরীয়তসম্মত রুকাইয়া) করানো। বমি হওয়া বা স্বপ্নে ভয় পাওয়া নিজে থেকেই কোনো বিপদের আলামত নয়।


১. স্বপ্নের হুকুম ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللَّهِ، وَالْحُلْمُ مِنَ الشَّيْطَانِ»

“সৎ স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর (ভয়ংকর) দুঃস্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে।”

— সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৯৮৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬৩

অন্য হাদীসে এসেছে:

«الرُّؤْيَا ثَلَاثٌ: رُؤْيَا مِنَ اللَّهِ، وَرُؤْيَا مِنَ الشَّيْطَانِ، وَرُؤْيَا مِمَّا يُحَدِّثُ بِهِ الرَّجُلُ نَفْسَهُ»

“স্বপ্ন তিন প্রকার: আল্লাহর পক্ষ থেকে, শয়তানের পক্ষ থেকে, এবং মানুষের নিজের মনের চিন্তা-ভাবনা থেকে।”

— সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬৪

সুতরাং প্রতিটি স্বপ্নকে বিপদের সংকেত হিসেবে ধরে নেওয়া শরীয়তসম্মত নয়। বিশেষত শয়তান মানুষের মনে ভয় ও উদ্বেগ সৃষ্টি করার জন্যই দুঃস্বপ্ন দেখায়। হাদীসে এসেছে, দুঃস্বপ্ন দেখলে শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতে হবে এবং স্বপ্নের কথা কারো কাছে বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

«إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ رُؤْيَا يَكْرَهُهَا فَلْيَتَعَوَّذْ بِاللَّهِ مِنْ شَرِّهَا، وَلْيَتْفُلْ عَنْ يَسَارِهِ ثَلَاثًا، وَلْيَتَحَوَّلْ عَنْ جَنْبِهِ الَّذِي كَانَ عَلَيْهِ»

“যখন তোমাদের কেউ অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখে, সে যেন তার অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চায়, বাম দিকে তিনবার থুতু ফেলে এবং যে পার্শ্বে শুয়ে ছিল তা পরিবর্তন করে।”

— সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬২


২. স্বপ্নে সাপ দেখার ব্যাপারে

স্বপ্নে সাপ দেখা সম্পর্কে কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়, তবে সেগুলোকে নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। ইমাম ইবনে সীরীন (রহ.)-এর স্বপ্ন-ব্যাখ্যার কিতাবে সাপকে কখনো শত্রু, কখনো গোপন শত্রু বা কখনো সম্পদের সাথে সম্পর্কিত বলা হয়েছে। কিন্তু এটি ইজতেহাদী ব্যাখ্যা, কোনো কুরআন-সুন্নাহর নিশ্চিত বিধান নয়। তাই এটিকে ভিত্তি করে ভয় পাওয়া বা বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

আপনি স্বপ্নে সাপকে কেটে টুকরো টুকরো করেছেন—এ ধরনের স্বপ্নকে অনেকে শত্রুর উপর বিজয় বা বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তবে এটি আল্লাহর ইলমে; বান্দার জন্য করণীয় হলো আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করা।


৩. বোনের স্বপ্নে চিৎকার করা ও “আপু পড়ে গেল” বলা

এটি একটি দুঃস্বপ্ন বা শয়তানের ভয় দেখানোর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। স্বপ্নে কেউ পড়ে যাওয়া বা বিপদের কথা বলা মানেই বাস্তবে তা ঘটবে—এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই। বরং হাদীস অনুযায়ী দুঃস্বপ্ন দেখলে:

  1. আল্লাহর কাছে শয়তান ও স্বপ্নের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া।
  2. বাম দিকে তিনবার থুতু ফেলা (হালকাভাবে)।
  3. শোয়ার পার্শ্ব পরিবর্তন করা।
  4. স্বপ্নের কথা কারো কাছে বর্ণনা না করা।
  5. নামাজে দাঁড়িয়ে যাওয়া বা আল্লাহর যিকিরে লিপ্ত হওয়া।

«إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ رُؤْيَا يَكْرَهُهَا فَلْيَقُمْ فَلْيُصَلِّ»

“যখন কেউ অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখে, সে যেন উঠে নামাজ পড়ে।”

— সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬৩ (অর্থানুসারে)


৪. বিপদের আশংকা থাকলে করণীয়

শরীয়তে বিপদ থেকে বাঁচার জন্য নির্দিষ্ট কিছু আমল রয়েছে, যা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত:

(ক) সকাল-সন্ধ্যার যিকির ও দোয়া

  • আয়াতুল কুরসী প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর এবং ঘুমানোর আগে পড়া।
  • সূরা ফালাক ও সূরা নাস সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমানোর আগে তিনবার পড়া।
  • সূরা ইখলাস তিনবার পড়া।
  • “বিসমিল্লাহিল্লাযী লা ইয়াদুররু মাআ ইসমিহি শাইউন ফিস সামায়ি ওয়াল আরদি ওয়া হুয়া সামিউল আলীম” সকাল-সন্ধ্যা তিনবার পড়া।

«مَنْ قَالَ بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ لَمْ تَضُرَّهُ سُمٌّ وَلَا سِحْرٌ»

“যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যা তিনবার এই দোয়া পড়বে, তাকে কোনো বিষ বা জাদু ক্ষতি করবে না।”

— সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৫০৮৮; সুনানে তিরমিজি, হাদীস ৩৩৮৮

(খ) নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াত

নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা, বিশেষত ফজর ও জুমআর নামাজে যত্নবান হওয়া। জুমআর দিনের বিশেষ ফজিলত রয়েছে; এ দিনে বেশি দরুদ শরীফ পড়া, সূরা কাহফ তিলাওয়াত করা এবং দোয়া করা।

(গ) সদকা করা

বিপদ প্রতিরোধে সদকা করার নির্দেশ এসেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«الصَّدَقَةُ تَدْفَعُ الْبَلَاءَ»

“সদকা বিপদ দূর করে।”

— (মুস্তাদরাক হাকিম; ফাযায়িলে আমাল, আশরাফ আলী থানভী রহ.)

তবে সদকা আল্লাহর হুকুমে হয়; এটি কোনো যান্ত্রিক ব্যবস্থা নয়।

(ঘ) তাওয়াক্কুল ও ভয় পরিহার

আল্লাহ তাআলা বলেন:

﴿وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ﴾

“যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।”

— সূরা আত-তালাক, আয়াত ৩


৫. রুকাইয়া ও বমি হওয়ার বিষয়

রুকাইয়া শরীয়াহ (কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক রুকাইয়া) করা জায়েজ, তবে তা শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে হতে হবে। রুকাইয়ার সময় বমি হওয়া বা শারীরিক প্রতিক্রিয়া হওয়া নিজে থেকেই কোনো প্রমাণ নয় যে জিন-শয়তানের আক্রমণ হয়েছে বা বিপদ আসছে। অনেক সময় ভয়, দুশ্চিন্তা, বা শারীরিক কারণে এমন হয়। তবে যদি বারবার অস্বাভাবিক সমস্যা হয়, তাহলে অভিজ্ঞ ও শরীয়তসম্মত রাকী (রুকাইয়া করানো ব্যক্তি)-এর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে; তবে তার কাছে অশরীয়তসম্মত পদ্ধতি বা গায়েবের কথা জানতে চাওয়া যাবে না।

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রুকাইয়ার ক্ষেত্রে শরীয়তসম্মত সীমা রক্ষার উপর জোর দিয়েছেন এবং অশরীয়তসম্মত পদ্ধতি পরিহার করতে বলেছেন। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা)


৬. সারসংক্ষেপ ও করণীয় তালিকা

  1. স্বপ্নকে নিশ্চিত বিপদের প্রমাণ মনে করবেন না। এটি শয়তানের ভয় দেখানো হতে পারে।
  2. দুঃস্বপ্ন দেখলে আল্লাহর আশ্রয় চাইবেন, বাম দিকে তিনবার থুতু ফেলবেন, পার্শ্ব পরিবর্তন করবেন, এবং কারো কাছে বর্ণনা করবেন না।
  3. নিয়মিত আমল করুন: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, আয়াতুল কুরসী, সূরা ফালাক-নাস-ইখলাস, সকাল-সন্ধ্যার দোয়া।
  4. সদকা করুন সামর্থ্য অনুযায়ী; এটি বিপদ দূর করার একটি মাধ্যম।
  5. ভয় ও উদ্বেগে ভুগবেন না; আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করুন।
  6. রুকাইয়া করাতে চাইলে শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে অভিজ্ঞ রাকীর কাছে যান; অশরীয়তসম্মত পদ্ধতি পরিহার করুন।
  7. বমি হওয়া বা শারীরিক প্রতিক্রিয়া নিজে থেকেই বিপদের আলামত নয়; প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন এবং স্বপ্নের ভয় থেকে মুক্তি দিন। আমিন।


তথ্যসূত্র:

  • সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৯৮৪
  • সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬২, ২২৬৩, ২২৬৪
  • সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৫০৮৮
  • সুনানে তিরমিজি, হাদীস ৩৩৮৮
  • সূরা আত-তালাক, আয়াত ৩
  • রাদ্দুল মুহতার, ইবনে আবিদীন, খণ্ড ৬ (কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা)
  • ফাযায়িলে আমাল, আশরাফ আলী থানভী (রহ.)
  • মাআরিফুল কুরআন, মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.