১৯৮৭ সালের ঋণ এখন কিভাবে পরিশোধ করব
Miscellaneous Fiqh · Shafei
Question
Answer
উত্তর: পুরোনো ঋণ পরিশোধের শরীয়াহ বিধান
সংক্ষিপ্ত উত্তর
৫,০০০ টাকা (ঋণের আসল পরিমাণ) ফেরত দিতে হবে — বর্তমান বাজারমূল্য বা মুদ্রাস্ফীতির হিসাব ধরে নয়। তবে যেহেতু দীর্ঘ সময় (১৯৮৭ থেকে প্রায় ৩৮ বছর) পার হয়েছে এবং ঋণদাতা মারা গেছেন, উত্তম ও সতর্কতামূলক পন্থা হলো আসল ৫,০০০ টাকা তার ওয়ারিসদের কাছে পৌঁছে দেওয়া; এবং ইহসান হিসেবে অতিরিক্ত কিছু (যেমন বর্তমান মূল্যের সমপরিমাণ বা সাধ্যমতো) দেওয়া — যা নফল সদকা হিসেবে গণ্য হবে, বাধ্যতামূলক নয়।
১. মূল নীতি: ঋণ সমপরিমাণে পরিশোধ করতে হবে
শাফি'ঈ মাযহাবের মূলনীতি হলো — ঋণ (قرض) একটি "দেনা" (دين), যা মিছলি মাল (مثلي — পরিমাপযোগ্য/ওজনযোগ্য/সংখ্যাযোগ্য বস্তু)। মিছলি মাল ঋণ হিসেবে দিলে ঠিক সমান পরিমাণ ফেরত দেওয়াই ওয়াজিব, বেশি নয়।
আল-কুরআন: "হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরস্পরের মধ্যে নির্ধারিত সময়ের জন্য ঋণ লেনদেন করলে তা লিখে রাখো..." (সূরা আল-বাকারা ২:২৮২)
আল-কুরআন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমানতদারদের আমানত আদায় করার নির্দেশ দেন..." (সূরা আন-নিসা ৪:৫৮)
হাদীস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন —
"যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ (ঋণ) নেয় এবং তা ফেরত দেওয়ার ইচ্ছা রাখে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা আদায় করে দেন।" (সহীহ বুখারী ২৩৮৭)
ইমাম নববী (রহ.) «আল-মাজমূ'»-তে বলেন: ঋণগ্রহীতার উপর ওয়াজিব হলো ঋণদাতাকে ঠিক সেই পরিমাণ ফেরত দেওয়া যা সে নিয়েছিল; মুদ্রার (নুকুদ) ক্ষেত্রে সংখ্যা ও প্রকার একই থাকতে হবে। (আল-মাজমূ' শরহুল মুহাযযাব, কিতাবুল কিরাদ/আল-কুরূদ অধ্যায়)
ইমাম শাফি'ঈ (রহ.) «আল-উম্ম»-তে বলেন: ঋণ হলো একটি দায় (ذمة-তে বদ্ধ), যা সমপরিমাণে আদায় করতে হবে; মুদ্রার মূল্য পরিবর্তন হলে ঋণের পরিমাণ পরিবর্তিত হয় না।
২. মুদ্রাস্ফীতি বা বর্তমান মূল্য ধরে ফেরত দেওয়া কি ওয়াজিব?
না। শাফি'ঈ ফিকহের সুস্পষ্ট নীতি:
- ঋণ যদি কাগজি মুদ্রা (নুকুদ) হয়, তবে ঋণ সৃষ্টির সময় যে সংখ্যা ও প্রকার নির্ধারিত হয়েছিল, ঠিক তা-ই ফেরত দিতে হবে।
- মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলেও (মুদ্রাস্ফীতি) ঋণগ্রহীতার উপর অতিরিক্ত কিছু ওয়াজিব হয় না — কারণ ঋণ হলো "সংখ্যাগত দায়" (عدد), বাজারমূল্যের দায় নয়।
- ইমাম নববী ও ইবন হাজার আল-হায়তামী (রহ.) স্পষ্ট করেন: দিরহাম-দীনারের সংখ্যা নির্ধারিত হলে সেই সংখ্যাই ফেরত দিতে হবে, যদিও তার মূল্য কমে বা বেড়ে যায়। (তুহফাতুল মুহতাজ, কিতাবুল কিরাদ; নিহায়াতুল মুহতাজ)
ইমাম রমলী (রহ.) «নিহায়াতুল মুহতাজ»-এ বলেন: ঋণ পরিশোধে "মিছল" (সমান) আদায় করা ওয়াজিব; বাজারমূল্য নয়।
তাই — ৫,০০০ টাকাই ফেরত দিতে হবে, বর্তমান মূল্য (যেমন আজকের ৫,০০০ টাকার সমমূল্য বা মুদ্রাস্ফীতি-সমন্বিত পরিমাণ) ওয়াজিব নয়।
৩. তবে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা ও উত্তম পন্থা
(ক) ওয়ারিসদের কাছে পৌঁছে দেওয়া আবশ্যক
ঋণদাতা মারা গেছেন, তাই ঋণ এখন তার তরিকা (সম্পদ)-এর অংশ। কুরআনের বিধান অনুযায়ী ওয়ারিসদের কাছে তা পৌঁছাতে হবে:
"তোমাদের জন্য নির্ধারিত হয়েছে... মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদ..." (সূরা আন-নিসা ৪:১১)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "ঋণ পরিশোধ না করে কেউ মারা গেলে তার দায় থেকে যায়।" (সহীহ মুসলিম ১৬২৪) — তাই ওয়ারিসদের কাছে আসল ৫,০০০ টাকা পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
(খ) ইহসান ও সদকা হিসেবে অতিরিক্ত দেওয়া (মুস্তাহাব)
যদিও বর্তমান মূল্য ওয়াজিব নয়, তবে দীর্ঘ ৩৮ বছরের ব্যবধান, ঋণদাতার পরিবারের প্রতি ইহসান, এবং নিজের অনুতাপ প্রকাশের জন্য আসলের অতিরিক্ত কিছু দেওয়া উত্তম (মুস্তাহাব)। এটি নফল সদকা হিসেবে গণ্য হবে এবং ঋণদাতার রূহের জন্য দু'আ ও সদকায়ে জারিয়ার মতো হবে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ঋণ পরিশোধে উদারতা ও অতিরিক্ত দেওয়াকে প্রশংসা করেছেন: "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে ঋণ পরিশোধে সর্বাধিক উত্তম।" (সহীহ বুখারী ২৩৯৩)
৪. ব্যবহারিক পরামর্শ
- আসল ৫,০০০ টাকা ঋণদাতার ওয়ারিসদের কাছে পৌঁছে দিন — এটি ওয়াজিব।
- সাথে ইহসান হিসেবে অতিরিক্ত কিছু দিন (সাধ্যমতো, বর্তমান মূল্যের কাছাকাছি হলে উত্তম) — এটি মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়।
- ওয়ারিসদের কাছে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিন যে এটি ১৯৮৭ সালের ঋণের পরিশোধ; যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিভ্রান্তি না হয়।
- ঋণদাতার জন্য দু'আ ও ইস্তিগফার করুন এবং তার রূহের জন্য সদকা করুন।
- অনুতপ্ত হওয়া ও আদায়ের ইচ্ছা — এটি তাওবার অংশ; আল্লাহ তাওয়াবুন রাহীম।
মূল কথা: শরীয়াহ অনুযায়ী ঋণ হলো সংখ্যাগত দায় — তাই ৫,০০০ টাকাই ফেরত দিতে হবে; তবে দীর্ঘ সময় ও ইহসানের কারণে অতিরিক্ত কিছু দেওয়া আপনার জন্য কল্যাণকর ও উত্তম।