পায়ে ব্যান্ডেজ অবস্থায় নামাজ ও পবিত্রতা অর্জনের পদ্ধতি কি? বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 8084
Questioner: Tahmina liza
Question Asked: 06 Nov 2026, 09:25 PM
Reviewed & Published: 06 Nov 2026, 09:39 PM
Views: 57
Tokens: 3,997
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
আমার পা ভেঙ্গে গেছে তাই ডক্টর পায়ের পাত সহ হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে। এটি পানি দিয়ে ধোয়া যাবে না তবে মাসেহ করা যাবে। আমার পায়ে ব্যান্ডেজ অবস্থায় গোসল ফরজ হয় কিন্তু ফরজ গোসল করতে পারি নি তাই নামাজও পড়তে পারি নি। ব্যান্ডেজ আরো ১ সপ্তাহ থাকবে। এখন আমি ব্যান্ডেজ থাকা অবস্থায় কিভাবে পবিত্রতা অর্জন করে নামাজ শুরু করবো?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর

আপনার অবস্থায় তায়াম্মুম করে নামাজ পড়া জায়েয হবে না, কারণ আপনার পবিত্রতার জন্য পানি ব্যবহার করা সম্ভব — শুধু ব্যান্ডেজযুক্ত অংশে পানি পৌঁছানো সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় করণীয় হলো:

  1. ফরজ গোসলের বিকল্প হিসেবে তায়াম্মুম নয় — বরং সমস্ত শরীর ধোয়া সম্ভব না হলে, যতটুকু সম্ভব ধুয়ে বাকি অংশে মাসেহ (ভেজা হাতে হালকা বুলানো) করবেন।
  2. ব্যান্ডেজের উপর মাসেহ করবেন — পবিত্র হাতে ভিজিয়ে ব্যান্ডেজের উপর হালকা বুলিয়ে দিবেন (পুরো ব্যান্ডেজ ঢেকে ফেলা জরুরি নয়, অধিকাংশ ঢেকে ফেলাই যথেষ্ট)।
  3. অজু ও গোসল উভয় ক্ষেত্রেই এই নিয়ম প্রযোজ্য।
  4. নামাজ শুরু করে দিবেন — আর বিলম্ব করবেন না; প্রতিটি নামাজ সময়মতো আদায় করবেন।

বিস্তারিত ফিকহি আলোচনা (হানাফি মাযহাব)

১. মূলনীতি: "যা সম্ভব তা কর, যা অসম্ভব তা মাফ"

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ
"তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় কর।" (সূরা আত-তাগাবুন: ১৬)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ
"যখন আমি তোমাদের কোনো কাজের আদেশ দিই, তখন তা যথাসাধ্য পালন কর।" (সহীহ বুখারী: ৭২৮৮; সহীহ মুসলিম: ১৩৩৭)

২. আহত/ব্যান্ডেজযুক্ত অঙ্গের হুকুম

হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো: যে অঙ্গে পানি পৌঁছানো ক্ষতিকর বা অসম্ভব, সেখানে মাসেহ করা হবে; আর যেখানে পানি পৌঁছানো সম্ভব, সেখানে ধোয়া হবে।

ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, আহত স্থানে মাসেহ করা ওয়াজিব। ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে মাসেহ, নাহলে ধোয়া। তবে ব্যান্ডেজ/পট্টির উপর মাসেহ সবাই একমত।

আল-হিদায়া-তে আছে:

وَيَمْسَحُ عَلَى الْجَبِيرَةِ وَالْمَرِيضُ يَمْسَحُ عَلَى الْجَبَائِرِ
"আর জাবীরা (ব্যান্ডেজ/পট্টি)-এর উপর মাসেহ করবে; রোগী ব্যান্ডেজের উপর মাসেহ করবে।"

রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)-এ উল্লেখ আছে:

الْمَرِيضُ إذَا كَانَ عَلَى عُضْوٍ مِنْ أَعْضَاءِ وُضُوئِهِ جَبِيرَةٌ... يَمْسَحُ عَلَيْهَا وَيُصَلِّي وَلَا يَتَيَمَّمُ
"রোগীর অজুর কোনো অঙ্গে ব্যান্ডেজ থাকলে... তার উপর মাসেহ করবে এবং নামাজ পড়বে; তায়াম্মুম করবে না।"

৩. কেন তায়াম্মুম নয়?

তায়াম্মুমের শর্ত হলো পানি ব্যবহারে সক্ষম না হওয়া (সূরা মায়িদা: ৬)। আপনার ক্ষেত্রে শরীরের বাকি অংশে পানি ব্যবহার সম্ভব, তাই তায়াম্মুম বৈধ নয়। ইমাম আত-তাহাবী (রহ.) ও ইমাম সারাখসী (রহ.) এই মাসআলা স্পষ্ট করেছেন — জাবীরা (ব্যান্ডেজ) থাকলে তায়াম্মুমের দরজা বন্ধ, মাসেহ-ই যথেষ্ট।

৪. ফরজ গোসলের সঠিক পদ্ধতি (আপনার অবস্থায়)

  1. নিয়ত করবেন — জানাবাত/হায়েয ইত্যাদি থেকে পবিত্রতার নিয়ত।
  2. সম্ভব সমস্ত শরীর ধুয়ে ফেলবেন — মাথা, মুখ, হাত, পেট, পিঠ, ঊরু, অপর পা ইত্যাদি।
  3. ব্যান্ডেজযুক্ত পায়ে পানি ঢালবেন না — বরং ভেজা হাতে ব্যান্ডেজের উপর মাসেহ করবেন।
  4. মুখ-কুলি করবেন (রোজা না থাকলে)।
  5. নাকের ভেতর পানি দিবেন (সতর্কতার সাথে)।

নোট: যদি ব্যান্ডেজের নিচে বা আশপাশে সামান্য অংশ খোলা থাকে যেখানে পানি পৌঁছানো নিরাপদ, সেখানে ধুয়ে ফেলবেন; শুধু ক্ষতিকর/আবদ্ধ অংশে মাসেহ করবেন।

৫. অজুর ক্ষেত্রেও একই নিয়ম

অজুতে:

  • হাত ধোয়া → কুলি → নাক → মুখ ধোয়া → হাত (কনুইসহ) ধোয়া → মাথা মাসেহ → পা ধোয়া (সুস্থ পা) → ব্যান্ডেজযুক্ত পায়ে মাসেহ।

ফাতাওয়া উসমানী ও ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে স্পষ্ট এসেছে — জাবীরার উপর মাসেহ করাই যথেষ্ট, নামাজ সহীহ হবে, তায়াম্মুমের প্রয়োজন নেই।

৬. নামাজের হুকুম

  • নামাজ মাফ হবে না — প্রতিটি ফরজ ও ওয়াজিব নামাজ সময়মতো আদায় করবেন।
  • বসে বা শুয়ে নামাজ পড়তে পারেন যদি দাঁড়ানো/রুকু-সিজদা কষ্টকর হয় (সূরা বাকারা: ২৩৯; সহীহ বুখারী: ১১১৭)।
  • জামাতের সাথে অংশ নিতে পারবেন, ইনশাআল্লাহ।

৭. সতর্কতা

  • ব্যান্ডেজ নাপাক হলে (যেমন রক্ত/পুঁজ লাগলে) — সেটি পরিবর্তন করা সম্ভব হলে পরিবর্তন করবেন; সম্ভব না হলে মাসেহ করবেন এবং নামাজ সহীহ হবে (রাদ্দুল মুহতার)।
  • ব্যান্ডেজ খোলার পর — পুনরায় পূর্ণ অজু/গোসল করতে হবে (কারণ মাসেহ ছিল অস্থায়ী সমাধান)।

উপসংহার

আপনি অজু ও ফরজ গোসল উভয় ক্ষেত্রেই সম্ভব অংশ ধুয়ে, ব্যান্ডেজযুক্ত পায়ে মাসেহ করে পবিত্রতা অর্জন করবেন এবং নামাজ শুরু করবেন। তায়াম্মুম করবেন না। ইনশাআল্লাহ আপনার নামাজ সহীহ হবে। আল্লাহ তা'আলা আপনার দ্রুত শিফা দান করুন। আমীন।


والله أعلم بالصواب
والسلام


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.