সহীহ বুখারী-মুসলিমের হাদীস "নারীরা জাহান্নামের অধিক" — এর সঠিক ব্যাখ্যা, প্রেক্ষাপট ও হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাই?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 8064
Questioner: Jj Kk
Question Asked: 06 Nov 2026, 02:44 PM
Reviewed & Published: 06 Nov 2026, 02:55 PM
Views: 44
Tokens: 5,828
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসলামু আলাইকুম
৩০৪। আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ একবার ঈদুল আযহা অথবা ঈদুল ফিতরের সালাত আদায়ের জন্য আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈদগাহের দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি মহিলাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেনঃ হে মহিলা সমাজ! তোমার সদাক্বাহ করতে থাক। কারণ আমি দেখেছি জাহান্নামের অধিবাসীদের মধ্যে তোমরাই অধিক। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেনঃ কী কারণে, হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেনঃ তোমরা অধিক পরিমানে অভিশাপ দিয়ে থাক আর স্বামীর অকৃতজ্ঞ হও। বুদ্ধি ও দ্বীনের ব্যাপারে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও একজন সদাসতর্ক ব্যক্তির বুদ্ধি হরণে তোমাদের চেয়ে পারদর্শী আমি আর কাউকে দেখিনি। তারা বললেনঃ আমাদের দ্বীন ও বুদ্ধির ত্রুটি কোথায়, হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেনঃ একজন মহিলার সাক্ষ্য কি একজন পুরুষের সাক্ষ্যের অর্ধেক নয়? তারা উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ’। তখন তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের বুদ্ধির ত্রুটি। আর হায়েয অবস্থায় তারা কি সালাত ও সিয়াম হতে বিরত থাকে না? তারা বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের দ্বীনের ত্রুটি। (১৪৬২, ১৯৫১, ২৬৫৮; মুসলিম ১/৩৪, হাঃ ৭৯, ৮০ আহমাদ ৫৪৪৩) (আ.প্র. ২৯৩, ই.ফা. ২৯৮)

এই হাদীসের ব্যাখ্যা অনুগ্রহ করে জানালে ভালো হয়।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্ন: হাদীসটির (আবূ সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, বুখারী-মুসলিম) ব্যাখ্যা জানতে চাই।

উত্তর:

হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত। এর ব্যাখ্যায় উলামায়ে কেরাম বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। নিম্নে সংক্ষেপে মূল বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো:

১. হাদীসের প্রেক্ষাপট: নবী করীম (সা.) ঈদগাহে যাওয়ার পথে মহিলাদের একটি দলকে সম্বোধন করে সদকা করতে উৎসাহিত করেন এবং জাহান্নামবাসীর মধ্যে তাদের সংখ্যাধিক্যের কারণ ব্যাখ্যা করেন। এটি ছিল তাদের প্রতি শুভাকাঙ্ক্ষী উপদেশ, অপমান নয়। তিনি প্রথমে সদকার নির্দেশ দেন, কারণ সদকা গুনাহের কাফফারা।

২. "তোমরা অধিক অভিশাপ দাও ও স্বামীর অকৃতজ্ঞ হও": অর্থাৎ জবানের মাধ্যমে বেশি বদদোয়া করা এবং স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। ইমাম নববী (রহ.) বলেন, এখানে "কুফর" অর্থ স্বামীর নিয়ামতের অকৃতজ্ঞতা (কুফরানে নিয়ামত), আল্লাহর সাথে কুফরি নয়। কেননা হাদীসে বলা হয়েছে "স্বামীর অকৃতজ্ঞ" — অর্থাৎ স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞতা। (শরহু মুসলিম, ইমাম নববী)

৩. "বুদ্ধি ও দ্বীনের ব্যাপারে ত্রুটি": ইমাম নববী (রহ.) ও ইবনে হাজার (রহ.) বলেন, এটি আপেক্ষিক ত্রুটি — অর্থাৎ পুরুষের তুলনায়। দ্বীনের ত্রুটি বলতে হায়েযের সময় নামায-রোযা ছেড়ে দেওয়া, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য অব্যাহতি; এটি তাদের গুনাহ নয়, বরং এতে তাদের ইবাদতের সাওয়াব কম হয়। বুদ্ধির ত্রুটি বলতে সাক্ষ্যের ক্ষেত্রে নারীর সাক্ষ্য পুরুষের অর্ধেক — এটি শরীয়তের বিধান, যা আল্লাহর হিকমত অনুযায়ী। ইমাম বদরুদ্দীন আইনী (রহ.) "উমদাতুল কারী"তে বলেন, এখানে "নাকিসাতুল আক্বলি ওয়াদ্দীন" অর্থ দ্বীন ও বুদ্ধির পূর্ণতা পুরুষের তুলনায় কম, নারীর সম্মানহানি নয়।

৪. হায়েয অবস্থায় নামায-রোযা ছেড়ে দেওয়া: এটি আল্লাহর নির্দেশ, তাই এতে নারীর কোনো গুনাহ নেই। কিন্তু যেহেতু তারা নামায-রোযার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত থেকে বিরত থাকে, তাই পুরুষের তুলনায় দ্বীনের দিক থেকে "ত্রুটি" বলা হয়েছে। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) "ফাতহুল বারী"তে বলেন, এখানে "নাকিসাতুদ দ্বীন" বলার কারণ হলো, তারা ইবাদতের পূর্ণ সাওয়াব থেকে বঞ্চিত থাকে।

৫. সাক্ষ্যের বিষয়: কুরআনে ইরশাদ: "তোমরা দুজন পুরুষ সাক্ষী রাখো; যদি দুজন পুরুষ না পাও, তবে একজন পুরুষ ও দুজন নারী..." (সূরা বাকারা: ২৮২)। এটি আল্লাহর বিধান, যা নারীর প্রতি জুলুম নয়; বরং নারীর স্বভাবগত কোমলতা ও আবেগের কারণে শরীয়ত তাদের সাক্ষ্যের ভার কমিয়েছে।

৬. হাদীসের মূল শিক্ষা:

  • সদকা করা ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা।
  • জবানের হেফাজত করা, বেশি বদদোয়া না করা।
  • স্বামীর নিয়ামতের কদর করা।
  • নারীরা দ্বীনি ইলম অর্জনে বেশি মনোযোগী হওয়া।
  • পুরুষদের উচিত নারীদের প্রতি সদাচরণ করা এবং তাদের দ্বীনি শিক্ষার ব্যবস্থা করা।

৭. হানাফী ফিকহের দৃষ্টিতে: ইমাম আবূ হানীফা (রহ.) ও ইমাম আবূ ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, নারীর সাক্ষ্য শুধু আর্থিক লেনদেনে গ্রহণযোগ্য, তাতে দুজন নারী = একজন পুরুষ। হুদুদ ও কিসাসের ক্ষেত্রে নারীর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুশ শাহাদাত; ফাতাওয়া আলমগীরী)

উপসংহার: হাদীসটি নারীর সম্মানহানির জন্য নয়; বরং নবী (সা.)-এর শুভাকাঙ্ক্ষী উপদেশ। নারীরা দ্বীনি ইলম ও আমলে অগ্রসর হলে এবং জবানের হেফাজত করলে এই "ত্রুটি" দূরীভূত হয়। আল্লাহ তাওফীক দান করুন। আমীন।


والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.