শরীর ঠিক রাখতে জীমে যাওয়া জায়েয?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 8061
Questioner: Aera Ahmed
Question Asked: 06 Nov 2026, 02:23 PM
Reviewed & Published: 06 Nov 2026, 02:49 PM
Views: 45
Tokens: 5,156
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বাসা বাড়িতে দীর্ঘদিন বসে শুয়ে দিন পার করতে করতে দেখা গেছে শরীরের হার নরম দূর্বল হয়ে যাচ্ছে। জীমে মেয়েদের সময় শুধু মেয়েরাই করে থাকেন, মেয়ে ট্রেইনারের সহায়তায়। সেখানে গান ও বাজে, যেটা কানে হেডফোন গুঁজে দিলে আর সমস্যা হয় না। সেই ক্ষেত্রে শরীর ঠিক রাখতে জীমে যাওয়া জায়েয হবে?

Answer

শরীর ঠিক রাখতে জিমে যাওয়া জায়েয হবে?

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: দীর্ঘদিন ঘরে বসে থাকার কারণে শরীর দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। শুধুমাত্র মেয়েদের জন্য আলাদা জিম, যেখানে মেয়ে ট্রেইনারের তত্ত্বাবধানে মেয়েরা ব্যায়াম করেন। তবে সেখানে গান-বাজনা বাজে, যা হেডফোন লাগিয়ে এড়ানো যায়। এমন অবস্থায় শরীর ঠিক রাখতে জিমে যাওয়া জায়েয হবে কি?


সংক্ষিপ্ত উত্তর

শরীর ঠিক রাখার উদ্দেশ্যে জিমে যাওয়া মূলত জায়েয, তবে শর্তসাপেক্ষ। যদি নিম্নোক্ত শর্তগুলো পূর্ণ হয়, তাহলে জিমে যাওয়া জায়েয হবে; অন্যথায় নয়:

  1. পূর্ণ পর্দা রক্ষা: শরীরের যে অংশগুলো ঢাকা ফরজ (সতর), তা সম্পূর্ণ ঢাকা থাকতে হবে। ঢিলেঢালা, শরীরের গঠন প্রকাশ করে না এমন পোশাক পরতে হবে।
  2. নারী-পুরুষের اختلاط না থাকা: যেহেতু শুধু মেয়েদের জিম এবং মেয়ে ট্রেইনার, তাই এ দিকটি ঠিক আছে—তবে ট্রেইনার ও অন্যান্য উপস্থিত সবাই মুসলিম নারী হওয়া উত্তম; অমুসলিম নারী থাকলে সতর্কতা প্রয়োজন।
  3. গান-বাজনা সম্পূর্ণ এড়ানো: শুধু হেডফোনে গান শোনা থেকে বিরত থাকাই যথেষ্ট নয়; বরং জিমের পরিবেশে গান-বাজনা বাজতে থাকা নিজেই একটি গুনাহের পরিবেশ। হেডফোন লাগিয়ে কান ঢেকে রাখলে নিজে শোনা থেকে বাঁচা যায়, কিন্তু অন্যরা শুনছে—এবং নিজেও সেই মজলিসে উপস্থিত থাকছেন। এমতাবস্থায় সেখানে উপস্থিত থাকা সম্পূর্ণ নিষ্কণ্টক নয়।
  4. প্রদর্শন ও অহংকার থেকে বিরত থাকা: ব্যায়ামের সময় শরীরের গঠন প্রদর্শন, আত্মপ্রশংসা বা পরপুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণের কোনো সুযোগ না থাকা।
  5. নামাজ-ইবাদতের ক্ষতি না হওয়া: জিমে যাওয়ার কারণে ফরজ নামাজ, পর্দা বা পরিবারের দায়িত্বে অবহেলা না হওয়া।

কুরআন ও হাদীসের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ

১. শরীরের হেফাজত ইসলামের নির্দেশ

আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আর তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না।" (সূরা আল-বাকারা: ১৯৫)

আরও ইরশাদ হয়েছে:

"নিশ্চয়ই তোমাদের শরীরেরও তোমাদের উপর হক (অধিকার) রয়েছে।" (সহীহ বুখারী: ১৯৭৫; সহীহ মুসলিম: ১১৫৩)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"তোমার শরীরের উপর তোমার অধিকার রয়েছে।" (সহীহ বুখারী: ১৯৭৫)

সুতরাং শরীর সুস্থ রাখা ও দুর্বলতা দূর করা ইসলামসম্মত উদ্দেশ্য। তবে এই উদ্দেশ্য অর্জনের الوسيلة (মাধ্যম) অবশ্যই শরীয়তসম্মত হতে হবে। ইসলামী মূলনীতি হলো: "যে কাজের الوسيلة (মাধ্যম) হারাম, সেই কাজও হারাম।" (আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ইবন নুজাইম)

২. নারীদের জন্য পর্দার বিধান

আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আর তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে; আর নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে..." (সূরা আন-নূর: ৩১)

"আর তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো এবং প্রাচীন জাহেলিয়াতের মতো সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না।" (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)

৩. গান-বাজনার বিধান

আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ অজ্ঞতাবশত আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করার জন্য 'লাহওয়াল হাদীস' (বাজে কথা/গান-বাজনা) ক্রয় করে।" (সূরা লুকমান: ৬)

ইমাম ইবন কাসীর (রহ.) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন, অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে 'লাহওয়াল হাদীস' দ্বারা গান-বাজনা উদ্দেশ্য। (তাফসীর ইবন কাসীর)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোক আসবে যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও গান-বাজনাকে হালাল মনে করবে।" (সহীহ বুখারী, তাআলীকসহ: ৫৫৯০)

হানাফী ফিকহের সিদ্ধান্ত: গান-বাজনা শোনা হারাম। ইমাম ইবন আবিদীন শামী (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন, গান-বাজনা শ্রবণ করা কবীরা গুনাহ। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৪৮)


হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত

জিমে যাওয়ার মূল হুকুম

মূলনীতি: নারীদের জন্য ঘরের বাইরে যাওয়া মূলত অনুমোদিত নয়, তবে প্রয়োজনবশত শর্তসাপেক্ষে অনুমতি আছে। ইমাম ইবন আবিদীন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন, নারীদের জন্য বাইরে যাওয়ার অনুমতি কেবল প্রয়োজন পূরণের জন্য, এবং তখন পর্দা ও শালীনতা রক্ষা করা আবশ্যক। (রাদ্দুল মুহতার: ২/৫২৮-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য)

ফাতাওয়া উসমানী-তে হযরত মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) নারীদের ব্যায়াম ও খেলাধুলা প্রসঙ্গে বলেন, যদি সম্পূর্ণ পর্দার সাথে হয়, পরপুরুষের সামনে না হয় এবং কোনো হারাম কাজ না হয়, তাহলে স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য অনুমতি আছে; কিন্তু বেপর্দা অবস্থায় বা পুরুষদের সাথে মিশে হলে নিষিদ্ধ। (ফাতাওয়া উসমানী: ৩/৫৬০-এর আলোচনা)

গান-বাজনার পরিবেশে উপস্থিত থাকা

এখানে দুটি দিক রয়েছে:

ক) নিজে শোনা: হেডফোন লাগিয়ে কান ঢেকে রাখলে নিজে গান শোনা থেকে বাঁচা যায়—এটি ঠিক। কিন্তু যদি হেডফোনে অন্য কিছু (যেমন নাশিদ, ইসলামি গজল) না শুনে শুধু কান বন্ধ রাখেন, তবুও সমস্যা থেকে যায়।

খ) মজলিসে উপস্থিত থাকা: হানাফী ফিকহের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলো—গুনাহের মজলিসে উপস্থিত থাকা নিজেই গুনাহ, যদিও নিজে সেই গুনাহ না করেন। কেননা এতে গুনাহের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ না হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং গুনাহকারীদের সাহস বাড়ে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আর যখন তারা বাজে কথা শোনে, তখন তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।" (সূরা আল-কাসাস: ৫৫)

"আর যারা মিথ্যা সাক্ষ্যে উপস্থিত থাকে না..." (সূরা আল-ফুরকান: ৭২)

ইমাম ইবন আবিদীন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন, গুনাহের মজলিসে উপস্থিত থাকা জায়েয নয়, যদি না অসন্তোষ প্রকাশ করা যায়। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৪৮-৩৪৯)

তবে একটি সমাধান: যদি জিম কর্তৃপক্ষকে গান-বাজনা বন্ধ করার অনুরোধ করা যায়, অথবা এমন সময়ে যাওয়া যায় যখন গান বাজে না, অথবা সম্পূর্ণ আলাদা রুমে ব্যায়ামের ব্যবস্থা থাকে—তাহলে সমস্যাটি দূর হয়। আপনার নিষেধ সত্বেও যদি গাজ বাজে এবং আপনার অনিচ্ছায় কানে গানের আওয়াজ আসে, তাহলে আপনার কোনো গোনাহ হবে না। তবে সর্বোত্তম হল নিজ ঘরে বা এমন কোনো স্থানে জিম করা যেখানে গানের আওয়াজ আপনার কানে আসবে না।

মেয়ে ট্রেইনারের বিষয়

মেয়ে ট্রেইনার দ্বারা ব্যায়াম শেখানো মূলত জায়েয, যদি:

  • ট্রেইনার মুসলিম ও পর্দানশীন হন,
  • সতর ঢাকা থাকে,
  • কোনো ধরনের অশ্লীলতা বা অবাঞ্ছিত স্পর্শ না থাকে।

তবে উত্তম হলো, নিজে ব্যায়ামের পদ্ধতি শিখে নিয়ে ঘরে বা নিরাপদ পরিবেশে ব্যায়াম করা—এটি পর্দার দিক থেকে সর্বাধিক নিরাপদ।


ব্যবহারিক পরামর্শ

  1. প্রথমে ঘরে ব্যায়ামের চেষ্টা করুন: ইউটিউব/অ্যাপ থেকে ব্যায়াম শিখে ঘরে করা সম্ভব। এটি পর্দা ও গান-বাজনা—উভয় দিক থেকে নিরাপদ।
  2. জিমে যেতে হলে: এমন জিম বেছে নিন যেখানে গান-বাজনা নেই, অথবা কর্তৃপক্ষকে বন্ধ করার অনুরোধ করুন।
  3. সময় নির্বাচন: যদি গান-বাজনা নির্দিষ্ট সময়ে বাজে, সেই সময় এড়িয়ে যান।
  4. পূর্ণ পর্দা: ঢিলেঢালা পোশাক, হিজাব/নিকাব—সতর সম্পূর্ণ ঢাকা।
  5. নিয়ত ঠিক রাখুন: শরীর সুস্থ রাখা আল্লাহর আমানত রক্ষার উদ্দেশ্যে হবে, প্রদর্শন বা ফ্যাশনের জন্য নয়।
  6. নামাজ-ইবাদত প্রাধান্য: জিমের সময় নামাজের সময়ের সাথে সংঘর্ষ সৃষ্টি করবে না।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

শরীর ঠিক রাখার জন্য জিমে যাওয়া মূলত জায়েয, তবে শর্ত হলো—পূর্ণ পর্দা, নারী-পুরুষের اختلاط না থাকা, গান-বাজনার পরিবেশ সম্পূর্ণ এড়ানো (শুধু হেডফোনে কান ঢাকা যথেষ্ট নয়), এবং কোনো হারাম কাজ না হওয়া। যদি গান-বাজনা বন্ধ করা সম্ভব না হয়, তাহলে ঘরে ব্যায়াম করাই উত্তম ও নিরাপদ। আর যদি জিমে গান-বাজনা বাজতেই থাকে এবং বন্ধ করার কোনো উপায় না থাকে, কানে হেড ফোন লাগিয়ে উচ্ছ আওয়াজে ইসলামী গজল ইত্যাদি শুনে শুনে জিম করার রুখসত থাকবে। তবে নিজ ঘরে বা গান বাজনা মুক্ত পরিবেশ বাছাই করাই সর্বোত্তম।

"আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।" (সূরা আত-তালাক: ২)


তথ্যসূত্র

  • আল-কুরআনুল কারীম (সূরা আল-বাকারা: ১৯৫; আন-নূর: ৩১; আল-আহযাব: ৩৩; লুকমান: ৬; আল-কাসাস: ৫৫; আল-ফুরকান: ৭২; আত-তালাক: ২)
  • সহীহ বুখারী: ১৯৭৫, ৫৫৯০
  • সহীহ মুসলিম: ১১৫৩
  • তাফসীর ইবন কাসীর (সূরা লুকমান: ৬-এর তাফসীর)
  • ইবন নুজাইম, আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর
  • ইবন আবিদীন শামী, রাদ্দুল মুহতার: ২/৫২৮; ৬/৩৪৮-৩৪৯
  • মুফতি তাকী উসমানী, ফাতাওয়া উসমানী: ৩/৫৬০ (আলোচনা)
  • মুফতি মুহাম্মদ শফী, মাআরিফুল কুরআন (সংশ্লিষ্ট আয়াতের তাফসীর)
  • আশরাফ আলী থানভী, বেহেশতী জেওর (পর্দা ও গান-বাজনা অধ্যায়)

আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.