অসুস্থতার মাধ্যমে কি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা কি আমাদের গুনাহ গুলো মুছে দেন?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
অসুস্থতার মাধ্যমে গুনাহ মোচন: একটি বিশ্লেষণ
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নটি হলো—অসুস্থতার মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা কি আমাদের গুনাহগুলো মুছে দেন?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
হ্যাঁ, সহীহ হাদীসের সুস্পষ্ট বর্ণনা অনুযায়ী অসুস্থতা, রোগ-ব্যাধি, দুঃখ-কষ্ট, এমনকি শরীরে কাঁটা ফোটার মতো তুচ্ছ কষ্টও মুমিনের গুনাহ মোচনের মাধ্যম হতে পারে—শর্ত হলো ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। তবে এটি কবীরা গুনাহ বা হক-সম্পর্কিত (বান্দার হক) বিষয়ের ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষ।
কুরআনুল কারীমের দলিল
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ
"আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদেরকে।" — (সূরা আল-বাকারা: ১৫৫)
إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ
"নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদেরকে তাদের প্রতিদান বিনা হিসাবে দেওয়া হবে।" — (সূরা আয-যুমার: ১০)
মা'আরিফুল কুরআনে (মুফতি মুহাম্মদ শাফী রহ.) উল্লেখ করেন—এ আয়াতগুলোতে বিপদ-আপদকে "পরীক্ষা" বলা হয়েছে, যা মুমিনের জন্য গুনাহ মোচন ও দরজা বৃদ্ধির الوسيلة।
হাদীসের দলিল
১. সহীহ বুখারী ও মুসলিম
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ وَلَا هَمٍّ وَلَا حُزْنٍ وَلَا أَذًى وَلَا غَمٍّ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ
"কোনো মুসলিমকে যে-ই ক্লান্তি, রোগ, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট বা বিষণ্নতা স্পর্শ করে—এমনকি যে কাঁটা তার শরীরে ফোটে—আল্লাহ তাআলা এর বিনিময়ে তার গুনাহগুলো মিটিয়ে দেন।" — (সহীহ বুখারী: ৫৬৪১; সহীহ মুসলিম: ২৫৭৩)
২. সহীহ মুসলিমের অপর বর্ণনা
مَا يَزَالُ الْبَلَاءُ بِالْمُؤْمِنِ وَالْمُؤْمِنَةِ فِي نَفْسِهِ وَوَلَدِهِ وَمَالِهِ حَتَّى يَلْقَى اللَّهَ وَمَا عَلَيْهِ خَطِيئَةٌ
"মুমিন পুরুষ ও নারীর ওপর তার নিজের, তার সন্তান-সন্ততি ও সম্পদের ব্যাপারে বিপদ আসতেই থাকে, এমনকি সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করে এ অবস্থায় যে তার কোনো গুনাহই অবশিষ্ট থাকে না।" — (সহীহ মুসলিম: ২৫৭৩; মুসনাদে আহমাদ: ১৪৮৩৯)
৩. তিরমিযীর বর্ণনা
إِذَا مَرِضَ الْعَبْدُ الْمُسْلِمُ قِيلَ لِلْمَلَكِ: اكْتُبْ لَهُ مَا كَانَ يَعْمَلُ فِي صِحَّتِهِ
"যখন কোনো মুসলিম বান্দা অসুস্থ হয়, তখন ফেরেশতাকে বলা হয়—সে সুস্থ থাকাকালে যে আমল করত, তা তার জন্য লিখতে থাকো।" — (মুসনাদে আহমাদ, সহীহ সনদ)
হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি ও শর্তাবলি
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) — রাদ্দুল মুহতার
ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে উল্লেখ করেন—বিপদ-আপদ ও রোগ-ব্যাধি গুনাহ মোচনের কারণ, তবে তা সগীরা গুনাহ (ছোট গুনাহ)-এর ক্ষেত্রে। কবীরা গুনাহের জন্য তাওবা ও ইস্তিগফার আবশ্যক। আর বান্দার হক (ঋণ, জুলুম, কারো সম্পদ ইত্যাদি) কেবল রোগ-ব্যাধিতে মাফ হয় না—সেগুলো ফিরিয়ে দেওয়া বা মাফ চাওয়া জরুরি।
ইমাম তহতাবী ও আল-হিদায়া
"আল-হিদায়া" ও "শরহু মা'আনিল আছার"-এ বর্ণিত আছে—মুমিনের বিপদ কাফফারাতুল যুনুব (গুনাহের কাফফারা) হিসেবে কাজ করে, তবে শর্ত হলো সবর ও ইহতিসাব (আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশা রাখা)।
মোল্লা আলী কারী (রহ.) — মিরকাত
"মিরকাত" গ্রন্থে উল্লেখ আছে—হাদীসে "حَتَّى الشَّوْكَةِ" (এমনকি কাঁটা) শব্দটি প্রমাণ করে যে, কষ্টের পরিমাণ যতই ছোট হোক, তা মুমিনের জন্য গুনাহ মোচনের মাধ্যম হতে পারে।
মুফতি মুহাম্মদ শাফী (রহ.) — মা'আরিফুল কুরআন
তিনি সূরা বাকারার ১৫৫ নং আয়াতের তাফসীরে লেখেন—বিপদ-আপদ মুমিনের জন্য দুটি কাজ করে: (১) গুনাহ মোচন, (২) দরজা বৃদ্ধি। কিন্তু এটা তখনই যখন বান্দা ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর প্রতি অসন্তুষ্ট না হয়।
মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) — ইনআমুল বারী
তিনি "ইনআমুল বারী" (বুখারীর উর্দু শরহ)-তে উল্লেখ করেন—অসুস্থতা মুমিনের জন্য রহমত, কিন্তু কাফিরের জন্য শুধু কষ্ট; কারণ মুমিন এর মাধ্যমে প্রতিদান লাভ করে।
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) — বেহেশতী জেওর
"বেহেশতী জেওর"-এ উল্লেখ আছে—অসুস্থ ব্যক্তির উচিত আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা, বেশি বেশি ইস্তিগফার করা এবং নিজের গুনাহের কথা স্মরণ করে তাওবা করা। রোগকে গালি দেওয়া বা অসন্তুষ্ট হওয়া নিষিদ্ধ।
গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও সতর্কতা
| শর্ত | বিবরণ | |------|--------| | সবর (ধৈর্য) | অসন্তোষ, অভিযোগ বা আল্লাহর প্রতি অবাধ্যতা নয় | | ইহতিসাব | আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশা রাখা | | সগীরা গুনাহ | ছোট গুনাহ মাফ হয়; কবীরা গুনাহের জন্য তাওবা জরুরি | | বান্দার হক | ঋণ, জুলুম, আমানত—এসব রোগে মাফ হয় না; ফিরিয়ে দেওয়া আবশ্যক | | নামাজ-ইবাদত | সামর্থ্য অনুযায়ী ইবাদত চালিয়ে যাওয়া (বসে বা শুয়ে হলেও) |
উপসংহার
হ্যাঁ, অসুস্থতা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুমিনের জন্য গুনাহ মোচনের একটি বড় মাধ্যম—এটি কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এবং হানাফী ফিকহের সকল প্রামাণ্য গ্রন্থে স্বীকৃত। তবে এটি শর্তসাপেক্ষ: ধৈর্য, সন্তুষ্টি ও ইহতিসাব থাকতে হবে; কবীরা গুনাহের জন্য তাওবা করতে হবে; এবং বান্দার হক আদায় করতে হবে। অসুস্থ ব্যক্তির উচিত রোগকে গালি না দেওয়া, বরং এটিকে আল্লাহর রহমত হিসেবে গ্রহণ করে বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দরুদ পড়া। আল্লাহ ভালো জানেন।
তথ্যসূত্র:
- সূরা আল-বাকারা: ১৫৫; সূরা আয-যুমার: ১০
- সহীহ বুখারী: ৫৬৪১; সহীহ মুসলিম: ২৫৭৩; মুসনাদে আহমাদ
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী)
- মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শাফী)
- ইনআমুল বারী (মুফতি তাকী উসমানী)
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী)
- মিরকাত (মোল্লা আলী কারী)
- আল-হিদায়া; শরহু মা'আনিল আছার