ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কীভাবে নামাজ আদায় করতেন?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
Answer
রফে ইয়াদাইন (রুকুর পর হাত উঠানো) — বিস্তারিত ফিকহি আলোচনা
প্রশ্ন: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কীভাবে নামাজ আদায় করতেন — রুকু-সিজদা? নবীজি (সা.) রুকুর পর রফে ইয়াদাইন করতেন — তা আমল করা যাবে কি?
ভূমিকা
রফে ইয়াদাইন অর্থ নামাজে নির্দিষ্ট স্থানে উভয় হাত কান বা কাঁধ পর্যন্ত উঠানো। হানাফি মাজহাবে তাকবিরে তাহরিমার সময় এবং কিয়াম থেকে রুকুতে যাওয়ার সময় হাত উঠানো সুন্নত; কিন্তু রুকু থেকে উঠে (কাওমায়) হাত উঠানো — যা "রফে ইয়াদাইন বাদাল রুকু" নামে পরিচিত — হানাফি মাজহাবে মানসূখ (রহিত) এবং আমল করা হয় না। নিচে দলিলসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর নামাজের পদ্ধতি
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর নামাজ ছিল সম্পূর্ণ সুন্নাহ অনুযায়ী। তাঁর নামাজের বর্ণনা এসেছে তাঁরই শিষ্য ও নির্ভরযোগ্য তাবেয়ীদের সূত্রে:
(ক) তাকবিরে তাহরিমা ও হাত বাঁধা
- তাকবিরে তাহরিমার সময় কান পর্যন্ত হাত উঠানো, তারপর নাভির নিচে হাত বাঁধা।
- দলিল: হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর (রা.) থেকে বর্ণিত — তিনি নবী (সা.)-কে দেখেছেন, তিনি তাকবির বলার সময় হাত উঠিয়েছেন, তারপর ডান হাত বাম হাতের উপর রাখেছেন। (সুনানে আবু দাউদ: ৭২৬; সুনানে নাসাঈ: ৮৮৯)
(খ) কিয়াম ও কিরাআত
- সানা, তাআউউয, তাসমিয়া, সূরা ফাতিহা ও কুরআন মজিদ তিলাওয়াত।
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, সূরা ফাতিহার পর সূরা মিলানো ওয়াজিব (ফরজ নামাজের প্রথম দুই রাকাতে)।
(গ) রুকু
- "আল্লাহু আকবার" বলে রুকুতে যাওয়া, হাঁটুতে হাত রাখা, পিঠ সোজা রাখা, তিনবার "সুবহানা রাব্বিয়াল আযীম" পড়া।
- রুকু থেকে উঠার সময় "সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ" বলা, এবং ইমাম ও মুক্তাদি উভয়েই "রাব্বানা লাকাল হামদ" বলা (হানাফি মাজহাব মতে মুক্তাদিও বলেন — এটি ইমাম আবু হানিফার মত)।
(ঘ) সিজদা
- "আল্লাহু আকবার" বলে সিজদায় যাওয়া, সাত অঙ্গ মাটিতে রাখা, তিনবার "সুবহানা রাব্বিয়াল আ'লা" পড়া।
- দুই সিজদার মাঝে বসা (জলসা) এবং "আল্লাহুম্মাগফিরলি" পড়া।
(ঙ) রুকু থেকে উঠার পর হাত উঠানো
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) রুকু থেকে উঠে হাত উঠাতেন না। এটি তাঁর সুপ্রসিদ্ধ ও প্রমাণিত মত। কারণ তাঁর কাছে পৌঁছেছে যে, নবী (সা.) শেষ জীবনে রফে ইয়াদাইন বাদাল রুকু পরিত্যাগ করেছেন।
২. রফে ইয়াদাইন বাদাল রুকু — হানাফি মাজহাবের দলিল
(ক) হাদিস: ইবনে মাসউদ (রা.)-এর বর্ণনা
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: أَلَا أُصَلِّي بِكُمْ صَلَاةَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ فَصَلَّى فَلَمْ يَرْفَعْ يَدَيْهِ إِلَّا مَرَّةً وَاحِدَةً
অনুবাদ: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বললেন, "আমি কি তোমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নামাজের মতো নামাজ পড়িয়ে দেখাব না?" তারপর তিনি নামাজ পড়ালেন এবং একবার ছাড়া (তাকবিরে তাহরিমা) আর কোথাও হাত উঠালেন না। (সুনানে আবু দাউদ: ৭৪৮; সুনানে তিরমিজি: ৩৪২; সুনানে নাসাঈ: ১০২৬)
ইমাম তিরমিজি (রহ.) বলেন, এই হাদিস হাসান। ইমাম আবু হানিফা, সুফিয়ান সাওরি ও কুফাবাসীগণ এই হাদিসের উপর আমল করেছেন।
(খ) হাদিস: আলকামা (রহ.)-এর বর্ণনা
عَنْ عَلْقَمَةَ قَالَ: قَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْعُودٍ: أَلَا أُصَلِّي بِكُمْ صَلَاةَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ فَصَلَّى فَلَمْ يَرْفَعْ يَدَيْهِ إِلَّا فِي أَوَّلِ مَرَّةٍ
(মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা: ২৪৪০; দারাকুতনী)
(গ) হাদিস: হযরত বারা ইবনে আযিব (রা.)
عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا افْتَتَحَ الصَّلَاةَ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى يَكُونَ حَاذِيَ أُذُنَيْهِ ثُمَّ لَا يَعُودُ
অনুবাদ: রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন নামাজ শুরু করতেন, তখন কান বরাবর হাত উঠাতেন, তারপর আর (কোথাও) হাত উঠাতেন না। (সুনানে দারাকুতনী: ১১৩৩; তাবরানি)
(ঘ) হযরত হাম্মাদ ইবনে আবি সুলাইমান (রহ.)-এর বর্ণনা
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) তাঁর উস্তাদ হাম্মাদ (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, রুকুর পর হাত উঠানো সম্পর্কে। হাম্মাদ (রহ.) বললেন, ইবরাহিম নাখঈ (রহ.) এটা করতেন না। ইমাম আবু হানিফা বলেন, "আমি হাম্মাদের মত গ্রহণ করেছি, কারণ তিনি ছিলেন ইবরাহিম নাখঈ ও আলকামার ছাত্র, এবং তাঁরা ইবনে মাসউদ (রা.)-এর ছাত্র।" (মুয়াত্তা মুহাম্মাদ: ৯৬)
৩. "রফে ইয়াদাইন" সংক্রান্ত হাদিসগুলোর সমন্বয় (জামউল আদিল্লা)
হানাফি উলামায়ে কেরাম বলেন, রুকুর পর রফে ইয়াদাইনের হাদিসগুলো মানসূখ (রহিত) অথবা মুবাহ (জায়েজ) অর্থে প্রযোজ্য। এর সমর্থনে:
(ক) হযরত ইবনে উমর (রা.)-এর আমল পরিবর্তন
হযরত ইবনে উমর (রা.) প্রথমে রুকুর পর হাত উঠাতেন, কিন্তু পরে তা পরিত্যাগ করেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা) — এটি প্রমাণ করে যে, পরবর্তীতে এই আমল রহিত হয়েছে।
(খ) হযরত জাবির (রা.)-এর বর্ণনা
عَنْ جَابِرٍ قَالَ: خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى أَصْحَابِهِ فَقَالَ: إِنِّي لَأَرَى كَأَنَّكُمْ تَرْفَعُونَ أَيْدِيَكُمْ فِي الرُّكُوعِ وَالسُّجُودِ... فَلَا تَرْفَعُوا أَيْدِيَكُمْ
অনুবাদ: রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদের কাছে এসে বললেন, "আমি দেখছি তোমরা রুকু-সিজদায় হাত উঠাচ্ছ।... সুতরাং তোমরা হাত উঠিও না।" (সুনানে আবু দাউদ: ৭৪৯)
(গ) ইমাম তহাবি (রহ.)-এর বক্তব্য
ইমাম আবু জাফর তহাবি (রহ.) তাঁর "শরহু মাআনিল আসার"-এ বলেন, রুকুর পর রফে ইয়াদাইনের হাদিসগুলো প্রথম যুগের আমল, পরে তা রহিত হয়েছে। ইবনে মাসউদ (রা.)-এর হাদিস শেষ আমলের প্রমাণ বহন করে।
(ঘ) ইমাম আবু হানিফার ফিকহি উসূল
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর উসূল হলো — "আখিরুল আমাল" (শেষ আমল) গ্রহণযোগ্য, কারণ তা নাসিখ (রহিতকারী) হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। ইবনে মাসউদ (রা.) নবী (সা.)-এর সাথে দীর্ঘ সময় ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর আমলই বর্ণনা করেছেন।
৪. হানাফি মাজহাবে রফে ইয়াদাইনের বিধান
| অবস্থান | হানাফি মাজহাবের হুকুম | |---|---| | তাকবিরে তাহরিমা | সুন্নত (হাত কান পর্যন্ত উঠানো) | | কিয়াম থেকে রুকুতে যাওয়া | সুন্নত (হাত কান পর্যন্ত উঠানো) | | রুকু থেকে উঠা (কাওমা) | সুন্নত নয়, মানসূখ — হাত উঠানো হবে না | | দুই সিজদার মাঝে | হাত উঠানো হবে না | | তাশাহহুদ থেকে তৃতীয় রাকাতে উঠা | হাত উঠানো হবে না (হানাফি মতে) |
দলিল: রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন) ১/৪৩৬; ফাতাওয়া আলমগিরি ১/৭৩; আল-হিদায়া ১/৫০; ফাতাওয়া উসমানি ১/২৩৬; ইমদাদুল ফাতাওয়া ১/৪৫৬
৫. প্রশ্নের সরাসরি উত্তর
প্রশ্ন ১: ইমাম আবু হানিফা কীভাবে নামাজ আদায় করতেন?
উত্তর: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সম্পূর্ণ সুন্নাহ অনুযায়ী নামাজ আদায় করতেন — তাকবিরে তাহরিমায় হাত উঠানো, নাভির নিচে হাত বাঁধা, রুকু-সিজদা পূর্ণ তামানিনার সাথে আদায়, এবং রুকুর পর হাত উঠাতেন না। তাঁর এই পদ্ধতিই হানাফি মাজহাবের প্রমাণিত পদ্ধতি।
প্রশ্ন ২: নবীজি (সা.) রুকুর পর রফে ইয়াদাইন করতেন — তা আমল করা যাবে কি?
উত্তর:
- হানাফি মাজহাব অনুযায়ী: রুকুর পর রফে ইয়াদাইন মানসূখ হিসেবে গণ্য, তাই আমল করা হবে না। এটি হানাফি মাজহাবের সুপ্রসিদ্ধ ও প্রমাণিত মত।
- তবে: এটি ফিকহি ইজতিহাদের বিষয়। শাফেঈ ও হাম্বলি মাজহাবে রুকুর পর রফে ইয়াদাইন সুন্নত হিসেবে আমল করা হয়। কেউ যদি শাফেঈ মাজহাব অনুসরণ করেন, তিনি তা করতে পারেন।
- হানাফি হিসেবে: আপনি হানাফি মাজহাবের অনুসারী হলে রুকুর পর হাত উঠাবেন না। এটি ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর সর্বসম্মত মত।