জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার সময় জোহর, আসর, মাগরিব ও এশার নামাজ ছুটে যাচ্ছে, এমন পরিস্থিতে করণীয় কি?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
আমাদের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা সাধারনত দুপুর ১ টা থেকে শুরু হয়। যার জন্য আমরা যারা দূরে থাকি তারা প্রায় দেড় থেকে দুঘন্টা আগে বাসা থেকে বের হই এক্সাম দেওয়ার জন্য। যার কারনে আমরা জোহরের স্বলাত পড়তে পারিনা। গতবার তবুও হলের গেট আগে খুলে দেওয়ায় মেয়েদের কমন রুম থাকে সেখানে স্বলাত পড়েছিলাম। কিন্তু এবার মাত্র ১৫ মিনিট আগে খুলে দেয় হলের গেট যার কারনে এবার যোহরের স্বলাত পড়তে পারিনা।আর আমাদের এক্সাম ৪ ঘন্টা হয় দুপুর ১ টা থেকে ৫ টা। তাই বর্তমান সময় হিসেবে আসরের স্বলাত এক্সাম হলেই থাকি আর বাকি মাগরিবের স্বলাত আবার বাসায় ফিরতে হয় গাড়ি খুজতে বা গাড়িতে থাকি তাই পড়তে পারিনা।আর এতক্ষণ ওজুও থাকেনা।বাসায় আসতে আসতে এশার আজান দিয়ে দেয়। তখন হয়তো কিছু খাবার খেয়ে কতদিন এশারের স্বলাত পড়ে ঘুমাই কতদিন শেষ রাতের দিকে পড়ি। এক্ষেত্রে এতগুলো স্বলাত বাদ দেওয়ার জন্য আমার কি অনেক গুনাহ হচ্ছে? আর আমার করনীয় কি? যদিও স্বলাত গুলো কাজা পড়ার চেষ্টা করি। আমাকে দয়া করে জানাবেন উস্তায মিন ফাদ্বলিক
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
উত্তর (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী):
আপনার পরীক্ষার ব্যস্ততা, যাতায়াতের দূরত্ব এবং নামাযের ওয়াক্ত নিয়ে আকুলতা ও চিন্তিত হওয়ার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব ও সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করা হয়েছে।
ফিকহে হানাফী ও প্রামাণ্য কিতাবসমূহের আলোকে আপনার প্রশ্নাবলীর সুনির্দিষ্ট শরঈ ফয়সালা এবং নামায আদায়ের সহজ আমলি পথ নিচে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. নামায বাদ যাওয়ার ফিকহী বিধান ও গোনাহের বিষয়টি:
- নামাযের ওয়াক্ত বজায় রাখা বাধ্যতামূলক: ইসলামে নামায নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আদায় করা একটি অকাট্য ফরয বিধান।
- পরীক্ষা কি শরঈ ওজর? পরীক্ষা, যাতায়াত বা ব্যস্ততা শরীআতের দৃষ্টিতে নামায একেবারে ছেড়ে দেওয়া বা ওয়াক্ত পার করে দেওয়ার জন্য গ্রহণযোগ্য শরঈ ওজর হিসেবে গণ্য হয় না।
- গোনাহ ও তওবা: শরীআতসম্মত কোনো মারাত্মক ওজর (যেমন: বেহুশ বা অজ্ঞান হওয়া, ঘুমিয়ে থাকা বা শত্রুর চরম ভয়) ছাড়া জেনেশুনে নামাযের ওয়াক্ত পার করে দেওয়া মারাত্মক কবিরা গোনাহ। অতএব, অতীতের নামাযগুলো ছুটে যাওয়ার জন্য আল্লাহর দরবারে লজ্জিত হয়ে আন্তরিকভাবে তওবা-ইস্তিগফার করা এবং দ্রুত সেগুলোর কাজা আদায় করে নেওয়া আবশ্যক।
২. পরীক্ষা ও যাতায়াতের দিনে ৩টি নামায আদায়ের সহজ শরঈ সমাধান:
আল্লাহ তাআলা বান্দাকে সাধ্যের বাইরে কোনো কষ্ট দেন না এবং শরীআতে প্রতিটি পরিস্থিতির জন্য সহজ পথ রয়েছে [৩, ৭০]। সামান্য পূর্বপ্রস্তুতি ও সদিচ্ছা থাকলে আপনার একটি নামাযও আর কাজা হবে না:
ক. জোহরের নামায (দুপুর ১২:০০ - ১২:১৫ থেকে শুরু):
- সমাধান: জোহরের ওয়াক্ত দুপুর ১২:০০ বা ১২:১৫ মিনিটে শুরু হয়ে যায়। আপনি বেলা ১২:৪৫ এ হলের গেট খোলার আগেই পরীক্ষার কেন্দ্রে বা ক্যাম্পাসে পৌঁছে যান।
- বাসা থেকে অজু করে আসবেন অথবা কেন্দ্রে পৌঁছে ১২:১৫ থেকে ১২:৪৫ এর মধ্যবর্তী সময়টুকুতে পরীক্ষাকেন্দ্রের মহিলা কমন রুম, কলেজের কোনো খালি কক্ষ, গেটের ভেতরের বারান্দা বা ক্যাম্পাসের ছায়াযুক্ত নিরিবিলি স্থানে মাত্র ৩-৪ মিনিটে জোহরের ৪ রাকাত ফরয নামায আদায় করে নেবেন। কেবল ফরয নামাযটুকু পড়ে নিতে মাত্র ৩ থেকে ৫ মিনিট সময় লাগে।
খ. আসরের নামায (বিকেল ৩:৩০ - ৪:১৫ এর মধ্যে শুরু):
- সমাধান ১ - (পরীক্ষা চলাকালীন): দুপুর ১:০০ থেকে বিকেল ৫:০০ টা পর্যন্ত দীর্ঘ ৪ ঘণ্টার পরীক্ষার মাঝে ৩:৩০ বা ৪:০০ টার দিকে হলের পরিদর্শকের (Invigilator) কাছে ১-২ মিনিটের অনুমতি নিয়ে হল সংলগ্ন ওয়াশরুম বা পাশের খালি স্থানে গিয়ে ওজু বা অজু থাকলে কেবল আসরের ৪ রাকাত ফরয নামায ইশারায় বা স্বাভাবিকভাবে পড়ে নেবেন।
- সমাধান ২ - (পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাথে সাথে): যদি হল থেকে বের হতে কোনোভাবেই অনুমতি না দেওয়া হয়, তবে বিকেল ৫:০০ টায় পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই খাতা জমা দিয়ে হল বা বারান্দা থেকেই আসরের সময় চলে যাওয়ার পূর্বেই আসরের ৪ রাকাত ফরয পড়ে নেবেন ।
গ. মাগরিবের নামায (সূর্যাস্তের পর বিকেল ৫:১৫ - ৫:৪৫ থেকে শুরু):
- সমাধান ১ - (বাসে ওঠার পূর্বে): বিকেল ৫:০০ টায় পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তড়িঘড়ি করে বাসে না উঠে পরীক্ষার হল বা কলেজের নামাযের স্থানেই মাগরিবের আযান হলে ৩ রাকাত ফরয নামায পড়ে তারপর গাড়িতে উঠবেন।
- সমাধান ২- (চলন্ত গাড়িতে): যদি বাসে উঠে পড়েন এবং যানজটের কারণে মাগরিবের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে বাসে বসেই কিবলার দিকে মুখ করে বা সিটে বসেই ইশারায় (রুকু-সিজদা করে) মাগরিবের নামায আদায় করে নেবেন। চলন্ত বাহনে হলেও নামায পড়ে নেওয়া ওয়াজিব, নামায ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
৩. দুই নামায একসাথে জমা করা (জাম' বাইনাস সালাতাইন) সংক্রান্ত বিধান:
হানাফী মাযহাবের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হজ্বের সময় (আরাফা ও মুযদালিফা) ব্যতিরেকে অন্য কোনো সময়ে বা পরীক্ষা/ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে দুই নামায এক ওয়াক্তে (যেমন: জোহর ও আসর একসাথে বা মাগরিব ও ইশা একসাথে) পড়ে নেওয়া জায়েয নেই। প্রতিটি নামাযকে তার সুনির্দিষ্ট ওয়াক্তের ভেতরেই পড়তে হবে।
কিছু সংখ্যক হানাফি আলেম, দুই নামায একত্রকরণের বিরাট সংখ্যক হাদীস বিবেচনা করে আরাফা মুযদালিফা ব্যতিতও দুই নামাযকে একত্র করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। সুতরাং উপরে বর্ণিত কোনো পদ্ধতিতে নামায পড়া সম্ভব না হলে তখন দুই নামায কে একত্র করে পড়া যেতেও পারে। ইনশাআল্লাহ, নামায আদায় হয়ে যাবে। অর্থাৎ জোহর আসরকে জোহরের প্রথম ওয়াক্তে। এবং এভাবে মাগরিব, এশাকে।
৪. অতীতের কাজা নামায আদায়ের নিয়ম:
১. তওবা করা: অতীতের যে নামাযগুলো অনিচ্ছাসত্ত্বেও বা না জানার কারণে ছুটে গেছে, তার জন্য আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে ক্ষমা চান [১২৬]। ২. কাজা আদায়: প্রতিদিন সাধারণ ওয়াক্তিয়া নামাযের সাথে সাথে বা সুবিধাজনক সময়ে অতীতের এক একদিনের কাজা (যেমন: ১টি জোহর, ১টি আসর, ১টি মাগরিব) নিয়ম করে আদায় করতে থাকুন [১২৬, ১৫১]।
সংযুক্ত কিতাবসমূহের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
-
দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৪৮, ৫৫ (দরসুল ফিকহ ১/৪৮, ৫৫) (অধ্যায়: নামায — 'মহিলাদের নামায আদায়ের স্থান ও নামায কাজা না করার কঠোর নির্দেশ')।
- পৃষ্ঠা: ২৮, ২৯ (দরসুল ফিকহ ১/২৮, ২৯) (অধ্যায়: নামায — 'শরীআতের বিধান সাধ্যানুযায়ী হওয়া ও ওয়াক্তের গুরুত্ব')।
- পৃষ্ঠা: ৮৫, ৮৬ (দরসুল ফিকহ ১/৮৫, ৮৬) (অধ্যায়: 'চেয়ারে বসে নামায ও সওয়ারি/যানবাহনে ফরয নামায আদায়ের ফিকহী প্রমাণ')।
- পৃষ্ঠা: ১৩৩, ১৩৪, ১৩৫ (দরসুল ফিকহ ১/১৩৩, ১৩৪, ১৩৫) *(অধ্যায়: 'দুই নামায একসাথে আদায় না করা এবং সফরে/ব্যস্ততায় ফরয নামায সংক্ষিপ্ত করার সুন্নাত নিয়ম')।
-
দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১০৫ (দরসুল ফিকহ ২/১০৫) (অধ্যায়: হজ্জে বাইতুল্লাহ — 'মুযদালিফা ব্যতিরেকে অন্য স্থানে দুই নামায জমা না করার ফতোয়া')।
- পৃষ্ঠা: ৪৬৯, ৪৭০ (দরসুল ফিকহ ২/৪৬৯, ৪৭০) (অধ্যায়: 'প্রয়োজনের খাতিরে শরঈ সহজতা ও ওজরের মাসাইল')।
-
ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড - বাংলা সংস্করণ):
- পৃষ্ঠা: ১৮৪, ১৮৫, ১৮৬ (হিন্দিয়াহ ১/১৪১, ১৪২) (অধ্যায়: সালাত, ১ম পরিচ্ছেদ — 'সালাতের ওয়াক্তসমূহ, ওয়াক্তমতে নামায ফরয হওয়া এবং দুই ওয়াক্তের নামায একসাথে না পড়ার ফিকহী মাসআলা') ।
- পৃষ্ঠা: ২৫১, ২৫২ (হিন্দিয়াহ ১/১১২, ১১৩) (অধ্যায়: সালাত, ১১শ পরিচ্ছেদ — 'কাজা সালাতের বিবরণ ও কাজা আদায় ওয়াজিব হওয়া') ।
- পৃষ্ঠা: ৩২১ (হিন্দিয়াহ ১/১৪৩) (অধ্যায়: সালাত, সওয়ারী ও নৌকায় নামায — 'গাড়িতে বা সওয়ারীতে নামায আদায়ের ফিকহী নিয়ম')।
-
নূরুল ঈযাহ (বাংলা সংস্করণ):
- পৃষ্ঠা: ৫৩, ১২৫ (নূরুল ঈযাহ পৃষ্ঠা ৫৩, ১২৫) (পরিচ্ছেদ: নামাযের সময়সমূহ ও কসর নামায — 'নামাযের ওয়াক্তের বর্ণনা')।
- পৃষ্ঠা: ১০৮, ১০৯ (নূরুল ঈযাহ পৃষ্ঠা ১০৮, ১০৯) (পরিচ্ছেদ: নামায বিনষ্টকারী বিষয়সমূহ — 'ওয়াক্তিয়া নামায বিলম্ব করার নিষেধাজ্ঞা')।
- পৃষ্ঠা: ১২৯, ১৩০ (নূরুল ঈযাহ পৃষ্ঠা ১২৯, ১৩০) (পরিচ্ছেদ: কাজা নামায আদায় করা — 'কাজা নামায আদায়ের শরঈ বাধ্যবাধকতা')।
والله أعلم بالصواب