স্বামীর আনুগত্য কতোটুকু করতে হবে?
Family Life · Hanafi
Question
আমার স্বামী বলেন, কোনো হারাম কাজ ছাড়া উনি যা-ই আদেশ করবেন তা-ই আমাকে করতে হবে। উনি ওনার মা এবং বোনের সেবা করতে বললে তাও করতে হবে। প্রসঙ্গত আমি বিয়ের পর থেকেই তার মা ও বোনের জন্য নিজ সাধ্যমত সবটুকু করেছি, শুধু স্বামীকে সন্তুষ্ট করার জন্য। আমি জানতাম তাদের সেবা আমার উপর ফরয না, আর তাদের দুজনের কেউই অপারগও না। তারা সুস্থ সবল মানুষ। আমি যতোই যা করি না কেন, আমার ভুলগুলা খুঁজে খুঁজে খোঁচা দেওয়া, আর আমার দুর্বলতা নিয়ে বার বার আমাকে কথা শোনানো কষ্ট দেয়া থেকে আমার স্বামীর মা ও বোন কখনোই বিরত ছিলেন না। তারা হাসতে হাসতে আমাকে কষ্ট দিতেন। এখন আমি যদি তাদের জন্য আর কিছুই করতে না চাই, স্বামী আদেশ করার পরও তাহলে কি আমার গুনাহ হবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة
প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার আগে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী নীতি পরিষ্কার করব:
১. স্বামীর আদেশ মানার সীমা
ইসলামে স্ত্রীর জন্য স্বামীর আদেশ মানা ফরয, তবে তা হারাম কাজ না হওয়া শর্ত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"لا طاعة لمخلوق في معصية الخالق"
"সৃষ্টিকর্তার নাফরমানীতে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য নেই।"
(মুসনাদে আহমদ, হাদীস: ১০৯৫; সহীহ বুখারী, হাদীস: ৭২৫৭)
অর্থাৎ, স্বামী যদি স্ত্রীকে এমন কোনো কাজের আদেশ দেন যা হারাম বা অন্যায়, তবে তা মানা জরুরি নয়। তবে যদি কাজটি হারাম না হয় (যেমন শ্বশুর-শাশুড়ি বা দেবরের সেবা), তবে তা মানা উচিত।
২. শ্বশুর-শাশুড়ি ও দেবরের সেবা স্ত্রীর উপর ফরয কি না?
হানাফী ফিকহ অনুযায়ী:
- স্বামীর পিতা-মাতার সেবা করা স্ত্রীর উপর ফরয নয়, বরং এটি একটি নফল ও উত্তম কাজ। স্বামীর পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ ও সেবার দায়িত্ব স্বামীর ওপর (তাদের ছেলে হিসেবে) এবং তাদের নিজের সন্তানদের ওপর।
(রদ্দুল মুহতার, ৩/৬০৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৫৪৮) - তবে স্বামী যদি আদেশ করেন, তবে স্ত্রীর জন্য তা মানা ওয়াজিব বা জরুরি হবে, যতক্ষণ না তা শরীয়তের কোনো নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়ে।
(আল-হিদায়া, ২/৩৪০; ফাতাওয়া শামী, ৩/৫৬২)
৩. স্ত্রীর কষ্ট ও শ্বশুর-শাশুড়ির দুর্ব্যবহার
যদি শ্বশুর-শাশুড়ি বা দেবর স্ত্রীকে অযৌক্তিক কষ্ট দেন, হেয় করেন, বা তার দুর্বলতা নিয়ে বারবার কথা বলেন এবং স্বামী এতে স্ত্রীর পক্ষ না নেন, তাহলে এটি অন্যায় ও জুলুম।
- স্বামীর উচিত স্ত্রীকে এই অন্যায় থেকে রক্ষা করা। যদি তিনি না করেন, তবে স্ত্রী নিজের নিরাপত্তা ও মানসিক শান্তির জন্য তাদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমারেখা নির্ধারণ করতে পারেন।
৪. এখন উত্তর (হ্যাঁ/না):
আপনার প্রশ্ন: "যদি স্বামী আদেশ করার পরও আমি আর কিছুই না করি, তাহলে কি আমার গুনাহ হবে?"
উত্তর:
- স্বামী যদি আদেশ দেন এবং কাজটি জায়েয (হালাল) হয়, তবে তা না করলে স্ত্রী গুনাহগার হবেন। কারণ স্বামীর জায়েয আদেশ মানা ফরয।
(সূরা নিসা, আয়াত ৩৪; তাফসীর মাআরিফুল কুরআন, ২/৪২০) - কিন্তু এখানে বিশেষ পরিস্থিতি আছে: শ্বশুর-শাশুড়ি ও দেবর আপনাকে অযৌক্তিক কষ্ট দিয়ে আসছেন এবং আপনি এখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এই অবস্থায় স্বামীকে বোঝানো উচিত যে, তাদের সেবা করতে গিয়ে আপনি মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। যদি স্বামী তা বুঝে না নেন এবং আপনি মনে করেন যে সেবা করা আপনার জন্য গুনাহ বা ক্ষতির কারণ হচ্ছে (যেমন, আপনাকে অপমান করা বা দুর্বলতা নিয়ে কটূক্তি করা), তাহলে আপনি স্বামীর আদেশ শর্তসাপেক্ষে মানতে পারেন।
উপায়:
১. স্বামীকে স্পষ্ট করে বলুন: "আমি আপনার আদেশ মানতে চাই, কিন্তু আপনার মা-বোন আমার প্রতি যে আচরণ করেন, তা সহ্য করা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ছে। আপনি যদি তাদেরকে আমার সাথে ভালো ব্যবহার করতে বোঝান, তাহলে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।"
২. স্বামী যদি এর পরও আদেশ করেন এবং আপনার কষ্ট লাঘবের কোনো উদ্যোগ না নেন, তাহলে আপনি শরীয়তের সীমার মধ্যে থেকে তাদের সাথে সম্পর্কের মাত্রা কমাতে পারেন। তবে সরাসরি 'না' বলা বা পুরোপুরি সেবা বন্ধ করা উচিত নয়, কারণ এটি স্বামীর গোস্বার কারণ হবে এবং দাম্পত্য কলহ বাড়াবে।
৩. সবচেয়ে ভালো হয়, ধৈর্য ও হিকমতের সাথে স্বামীকে বোঝান এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
সংক্ষিপ্ত ফতোয়া:
- স্বামীর আদেশ মানা ফরয, তবে শর্ত হলো কাজটি হারাম না হওয়া।
- শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা ফরয না হলেও, স্বামী আদেশ করলে তা মানা জরুরি।
- তবে যদি সেবা করতে গিয়ে আপনি অন্যায় কষ্ট বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হন, তাহলে স্বামীকে বিষয়টি জানিয়ে সীমারেখা নির্ধারণ করতে পারেন।
- সরাসরি অস্বীকার না করে বরং স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করুন এবং দোয়া করুন।
আপনার দায়িত্ব:
স্বামীর জায়েয আদেশ মানা, কিন্তু আপনাকে জুলুম (অন্যায় কষ্ট) সহ্য করতে হবে না। স্বামীর উচিত স্ত্রীকে রক্ষা করা। যদি স্বামী না শোনে, তাহলে পরিবারের বড় কেউ বা জ্ঞানী আলেমের মাধ্যমে মীমাংসা করার চেষ্টা করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে ধৈর্য ও হিকমত দান করুন এবং আপনার দাম্পত্য জীবনে শান্তি বজায় রাখুন। (আমীন)
তথ্যসূত্র:
- রদ্দুল মুহতার (৩/৬০৪, ৩/৫৬২)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৫৪৮)
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৫২০)
- বাহিশতি জেওর (২/৪২-৪৪)
- মাআরিফুল কুরআন (২/৪২০)
সর্বোপরি, আল্লাহই সর্বজ্ঞ।