কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত, নিসাবের হিসাব, ঋণগ্রস্ত পরিবারের কোরবানির বিধান।
Qurbani-Slaughtering · Hanafi
Question
এছাড়া মা ও স্ত্রীও সংসারের কাজে সহযোগিতা করেন। তারা হাঁস-মুরগি ও গরু পালন করেন এবং দুধ-ডিম বিক্রি করে মাঝে মধ্যে সংসারে কিছু আর্থিক সহায়তা করেন।
অন্যদিকে—
- তার স্ত্রীর কাছে বাবার দেওয়া কিছু স্বর্ণ এবং স্বামীর দেওয়া অল্প কিছু রৌপ্য আছে, যা মিলিয়ে সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার নিসাব সমপরিমাণ সম্পদের মূল্য হতে পারে। তবে এই গহনা ছাড়া স্ত্রীর হাতে অন্য কোনো সঞ্চয়, আয় বা অতিরিক্ত সম্পদ নেই। অর্থাৎ তার সম্পদের পরিমাণ এমন যে, কেবল নিসাব পরিমাণ বা তার সামান্য বেশি হতে পারে; নিসাবের বাইরে উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত সম্পদ নেই। এমনকি দুই-তিন মাস পরও কোরবানির জন্য আলাদা টাকা হাতে আসার সম্ভাবনা নেই।
- একইভাবে তার মায়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নিসাব পরিমাণ বা তার সামান্য বেশি টাকা রয়েছে। তবে নিসাবের বাইরে অতিরিক্ত উল্লেখযোগ্য সম্পদ নেই। তিনি বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত এবং চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় খাতে নিয়মিত খরচ রয়েছে।
বাস্তবে পুরো পরিবার একটি যৌথ আর্থিক ব্যবস্থার মতো পরিচালিত হয়। কারণ সংসারের দৈনন্দিন ব্যয়, চিকিৎসা, প্রয়োজন ও সংকটের বড় অংশ ওই ব্যক্তিই ঋণ বা হাওলাত করে বহন করেন। তিনি খরচ বহন না করলে হয়তো স্ত্রীকে তার পিতা-মাতা বা আত্মীয়-স্বজনের সাহায্যে চলতে হতো, অথবা গহনা বিক্রি করতে হতো; একইভাবে মাকেও ব্যাংকের টাকা খরচ করতে হতো।
এছাড়া স্ত্রী ও মা উভয়েই পারিবারিক বড় প্রয়োজন বা বিপদে নিজেদের সম্পদ ব্যয় করতে প্রস্তুত। যেমন—স্বামী গুরুতর অসুস্থ হলে স্ত্রী গহনা বিক্রি করে সাহায্য করতে রাজি, আবার সন্তানের চিকিৎসা বা পারিবারিক সংকটে মা-ও ব্যাংকের টাকা ব্যয় করতে প্রস্তুত।
সব মিলিয়ে পরিবারটি কষ্টের মধ্য দিয়েই জীবনযাপন করছে। চিকিৎসা, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় নানা সংকট থাকা সত্ত্বেও তারা ধীরে ধীরে সংসারের উন্নতির চেষ্টা করছে—যেমন কিছু জমি রাখা, গরু পালন করা ইত্যাদি। অর্থাৎ অনেক কষ্ট ও সাশ্রয়ের মাধ্যমে তারা ভবিষ্যতের জন্য কিছু গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
এমন অবস্থায় প্রশ্ন হলো—
১. এই পরিস্থিতিতে স্ত্রী ও মায়ের উপর কি আলাদাভাবে কোরবানি ওয়াজিব হবে?
২. নাকি পুরো পরিবার একই আর্থিক বাস্তবতার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় পরিবারের পক্ষ থেকে একটি কোরবানি দিলেই যথেষ্ট হবে?
৩. যদি স্ত্রী বা মায়ের উপর কোরবানি ওয়াজিব হয়ে থাকে, তাহলে কি তাদের জন্য গহনা বিক্রি করা বা ব্যাংকের টাকা খরচ করে কোরবানি দেওয়া আবশ্যক হবে, যদিও পরিবারটি আর্থিক সংকট, ঋণ, চিকিৎসা ব্যয় ও কষ্টের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছে?
প্রশ্ন:বাংলাদেশে অনেক ফ্যামিলি আছে যারা কষ্টে দিনাতিপাত করে ব্যাংকে প্রতিমাসে এক হাজার করে টাকা রাখে এভাবে রাখতে রাখতে নেসাব পরিমাণ সবেমাত্র আসছে অর্থাৎ কুরবানীর তিনদিন নিসাব হয়ে গেছে কোরবানি দেবার মতন তার আরো অন্য কোন সম্পদ নেই কিছুদিন পর হবে এমন সুযোগও নেই এমন অবস্থায় তাকে মূল টাকা থেকে কুরবানী দিতে হবে ব্যাংক থেকে তুলে। উদাহরণস্বরূপ ১২০০০ হাজার টাকা ব্যাংক থেকে তুলে তাকে কোরবানি দিতে হবে এভাবে আবার প্রতিমাসে ১০০০ করে রাখতে রাখতে আবার নিসাবে পৌঁছাবে তখন তাকে আবার ১২০০০ টাকা তুলে কোরবানি দিতে হবে এভাবে কোরবানি দেয়া কি ওয়াজিব হবে। যদি তাই হয় তাহলে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তো সামনের দিকে কখনোই অগ্রসর হবে না কারণ তাকে প্রতিবছর এখান থেকে কুরবানী দিতে হচ্ছে। বাড়িতে করে সামনের দিকে সংসারের উন্নতি করতে পারবে না।
Answer
প্রশ্নের উত্তর
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
১. স্ত্রী ও মায়ের উপর কি আলাদাভাবে কোরবানি ওয়াজিব হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, বর্ণিত পরিস্থিতিতে স্ত্রী ও মায়ের উপর আলাদাভাবে কোরবানি ওয়াজিব হবে। কারণ কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত হলো—কোরবানির দিনগুলোতে (১০, ১১, ১২ জিলহজ) ব্যক্তি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবেন। নিসাব হলো সাড়ে বায়ান্ন তোলা (৫২.৫ তোলা) রুপা বা তার সমমূল্যের সম্পদ (বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী প্রায় ৬৫-৭০ হাজার টাকা বা তার বেশি)।
(ক) স্ত্রীর ক্ষেত্রে: তার কাছে বাবার দেওয়া স্বর্ণ ও স্বামীর দেওয়া রৌপ্য রয়েছে, যা নিসাব পরিমাণ বা তার সামান্য বেশি হতে পারে। হানাফি ফিকহের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, মহিলাদের ব্যবহারের জন্য গহনাও নিসাব গণনায় অন্তর্ভুক্ত হবে। তাই তার উপর কোরবানি ওয়াজিব হবে।
(খ) মায়ের ক্ষেত্রে: তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নিসাব পরিমাণ টাকা রয়েছে। ব্যাংকের টাকা তরল সম্পদ, যা নিসাবের অন্তর্ভুক্ত। তাই তার উপরও কোরবানি ওয়াজিব হবে।
সতর্কীকরণ: বর্তমানে নিসাবের মূল্য অনেক কমে গেছে (প্রায় ৫৫-৬৫ হাজার টাকা)। তাই অনেকের কাছেই নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তারা সচেতন নন। আপনাকে বাস্তবিকই নিসাবের মূল্য নির্ধারণ করে দেখতে হবে।
দলিল:
- বাদায়েউস সানায়ে (৫/৬৮): "কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য নিসাব হলো সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা বা তার সমমূল্যের সম্পদ।"
- রদ্দুল মুহতার (৬/৩১২): "মহিলাদের ব্যবহারের গহনাও নিসাব গণনায় ধরা হবে।"
২. পুরো পরিবারের পক্ষ থেকে একটি কোরবানি দিলেই কি যথেষ্ট হবে?
উত্তর: না, যথেষ্ট হবে না। কারণ কোরবানি ব্যক্তিগত ইবাদত। প্রত্যেক স্বতন্ত্রভাবে নিসাবের মালিক ব্যক্তির উপর কোরবানি ওয়াজিব হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে একটি কোরবানি দিয়ে শুধু যে ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোরবানি করা হয়েছে তার ওয়াজিব আদায় হবে। অন্যদের (স্ত্রী ও মায়ের) ওয়াজিব বাকি থেকে যাবে।
তবে যদি পুরো পরিবার একই নিসাবের মালিক হয় (অর্থাৎ যৌথ সম্পত্তি), তাহলে একটি কোরবানি যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু এখানে স্ত্রী ও মায়ের আলাদা ও স্বতন্ত্র সম্পদ রয়েছে, তাই তাদের ওপর পৃথক কোরবানি ওয়াজিব।
৩. যদি ওয়াজিব হয়, তাহলে কি তাদের জন্য গহনা বা ব্যাংকের টাকা খরচ করে কোরবানি দেওয়া আবশ্যক?
উত্তর: হ্যাঁ, কোরবানি ওয়াজিব হলে তা আদায় করা আবশ্যক। যদি তাদের কাছে নগদ টাকা না থাকে, তাহলে তাদের অন্য সম্পদ (গহনা বা ব্যাংক ব্যালান্স) থেকে টাকা বের করে কোরবানি দিতে হবে।
তবে কিছু ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে ফকিহগণ রুখসত (ছাড়) দিয়েছেন:
- যদি সম্পদটি একমাত্র ভরসা হয় এবং তা বিক্রি করলে চরম দুর্ভোগ দেখা দেয় (যেমন অনাহার, চিকিৎসা না করানো), তাহলে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) এর মতে কোরবানি না দেওয়ার অনুমতি আছে।
- তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও অধিকাংশ হানাফি ফকিহের মতে, নিসাব থাকলে কোরবানি ওয়াজিব এবং তা আদায় করতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ:
- স্ত্রী ও মায়ের মৌলিক প্রয়োজন (খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা) স্বামী/ছেলে বহন করছেন। এ কারণে তাদের নিজস্ব সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ নেই।
- তবে স্বামী/ছেলে ঋণগ্রস্ত এবং তিনি খরচ দিতে না পারলে তাদের সম্পদ খরচ করতে হতে পারে। এটা ভবিষ্যতের সম্ভাবনা, নিশ্চিত প্রয়োজন নয়।
- তাই বর্তমান অবস্থায় তাদের জন্য কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
উপসংহার: স্ত্রী ও মায়ের উপর কোরবানি ওয়াজিব হয়েছে বলে গণ্য করা উচিত এবং তাদের সম্পদ থেকে কোরবানি দেওয়া আবশ্যক। তবে চরম অসুবিধা হলে (যেমন সম্পদ বিক্রি করলে অনাহারে পড়তে হবে) তখন ফকিহদের দেওয়া রুখসত অনুযায়ী সতর্ক অবস্থান নেওয়া যেতে পারে।
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন: যদি কেউ কষ্ট করে মাসে ১০০০ টাকা সঞ্চয় করে নিসাব পূর্ণ করে, কিন্তু কোরবানি দিলে সব টাকা শেষ হয়ে যায় এবং ভবিষ্যতে আর সঞ্চয় বাড়ানো সম্ভব হয় না, তাহলে কি তার জন্য কোরবানি ওয়াজিব?
উত্তর: হ্যাঁ, কোরবানি ওয়াজিব হবে। কারণ কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত হলো কোরবানির দিনগুলোর যে কোনো সময় নিসাবের মালিক হওয়া। নিসাব পূর্ণ হওয়ার পর তা সঞ্চিত থাকা বা না থাকা—এটা বিবেচ্য নয়। কোরবানি দিলে সম্পদ কমে গেলেও ওয়াজিব আদায় হয়েছে বলে গণ্য হবে।
সমস্যার সমাধান:
- যদি কোরবানি দেওয়ার কারণে মৌলিক প্রয়োজন (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা) বিপন্ন হয়, তাহলে কিছু ফকিহের মতে রুখসত আছে। তবে সাধারণত আমাদের সমাজে কোরবানির পশুর দাম অনেক বেশি না হলে এমন সংকট তৈরি হয় না।
- ইসলামী সমাধান: আপনি যদি আগে থেকে কোরবানির পশু কিনে রাখেন বা কিস্তিতে কোরবানি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন, তাহলে একবারে সব টাকা খরচ হবে না।
- আরেকটি সমাধান: আপনি যদি ঋণ (কর্জ) নিয়ে নেন এবং সেটা নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে আপনার নিসাব কমে যাবে এবং কোরবানি ওয়াজিব থাকবে না। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ নেওয়া উচিত নয়।
সতর্কবাণী: নিসাব পূর্ণ হওয়ার পর যদি ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পদ কমিয়ে ফেলা হয় (যেমন উপহার দেওয়া), তাহলে কোরবানি ওয়াজিব রহিত হবে না।
উপসংহার
১. স্ত্রী ও মায়ের উপর আলাদাভাবে কোরবানি ওয়াজিব হবে, যদি তাদের নিসাব পরিমাণ সম্পদ কোরবানির দিনগুলোতে থাকে। ২. পুরো পরিবারের পক্ষ থেকে একটি কোরবানি যথেষ্ট নয়; প্রত্যেকের নিজস্ব কোরবানি ওয়াজিব। ৩. গহনা বা ব্যাংকের টাকা ব্যবহার করে কোরবানি দেওয়া আবশ্যক; তবে চরম অসুবিধায় ফকিহদের রুখসত গ্রহণ করা যেতে পারে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।