ইসলামে কি যৌন হয়রানীর শাস্তি নফল ইবাদতের দ্বারা মাফ হয়ে যায়?

Faith and Belief · Hanbali

Question No: 772
Questioner: ইসলাম প্রচার
Question Asked: 26 May 2026, 12:08 AM
Reviewed & Published: 26 May 2026, 12:14 AM
Views: 121
Tokens: 4,918
This answer is according to the 'Hanbali' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
একটি হাদিস দেখিয়ে ইসলামবিরোধী নাস্তিকরা দাবি করেঃ একজন মুসলিম পুরুষ যদি কোনো মহিলাকে চুমু খেয়ে যৌন নির্যাতন করে, তাহলে ইসলাম শিক্ষা দেয় এই অপরাধ গোপন রাখতে কারণ এক ব্যক্তি এমন অপরাধ করা সত্ত্বেও আবু বকর(রা) ও উমার(রা) সেই অপরাধীকে বিচারের জন্য ধরিয়ে দেননি বরং ঐ অপরাধকারীকে বলেছিলেন পুরো বিষয়টা গোপন রাখতে বা চেপে যেতে।
আর যদি এই অপরাধ প্রকাশ পেয়ে যায়, তাহলে ইসলামী বিচারক তাকে কোনো শাস্তি দেবে না কারণ স্বয়ং নবী(স) এমন একজন ব্যক্তিকে এই কাজ করা সত্ত্বেও কোনো শাস্তি দেননি। বরং ঐ অপরাধী ব্যক্তি যদি কিছু সৎ কাজ করে (যেমন নফল নামাজ পড়া) তাহলেই তার অপরাধ মুছে যাবে। এই ঘোষণা দিয়ে কুরআনের আয়াত পর্যন্ত নাজিল হয়েছে এবং বলা হয়েছে উম্মাহর সবার জন্য এই বিধান।
অর্থাৎ ইসলামী রাষ্ট্রে পুরুষরা কোনো নারীকে চুমু খেয়ে যৌন হয়রানী করলেও শাস্তি নেই, এরপর কিছু নফল নামাজ পড়লেই সব মাফ!

হাদিসটি নিম্নরূপঃ
আবুল ইউসর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ এক মহিলা একবার আমার কাছে খেজুর কিনতে আসল। আমি বললামঃ ঘরে আরো ভাল খেজুর আছে, সে তখন আমার সাথে ঘরে প্রবেশ করল। আমি তার দিকে ঝুঁকে তাকে চুমু দেই। পরে আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এসে তার বিষয়টি বললাম। তিনি বললেনঃ নিজের মধ্যে তা গোপন রাখ, আর তওবা কর। এ বিষয়ে কাউকে জানাবে না। কিন্তু (অনুশোচনায়) আমি স্থির থাকতে পারলাম না। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এসে বিষয়টি বললাম, তিনিও বললেনঃ নিজের মধ্যেই তা গোপন রাখ, আর তওবা কর। এ বিষয়ে কাউকে জানাবে না। কিন্তু (অনুশোচনায়) আমি স্থির তাকতে পারলাম না।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বিষয়টি বললাম। তিনি বললেনঃ আল্লাহর পথে জেহদরত একজন যোদ্ধার অনুপস্থিতিতে তাঁর স্ত্রীর বিষয়ে তুমি কি এ ধরনের আচরণ করলে? ফলে সে কামনা করতে লাগল সে যদি পূর্বে ইসলাম গ্রহণ না করে এ মুহূর্তে ইসলাম গ্রহণ করত এবং ধারণা করতে লাগল যে, সে জাহান্নামী হয়ে গেছে। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেকক্ষণ মাথা নীচু করে রইলেন অবশেষে তাঁর কাছে ওহী এলঃ

أَقِمِ الصَّلاَةَ طَرَفَيِ النَّهَارِ وَزُلَفًا مِنَ اللَّيْلِ

সালাত (নামায)কায়েম কর দিনের দু’প্রান্ত ভাগে ও রাতের প্রথমাংশে। সৎকাজ অবশ্যই অসৎ কাজ মিটিয়ে দেয়। যারা উপদেশ গ্রহণ করে এ তাদের জন্য এক উপদেশ (১১ : ১১৪)।

আবুল ইউসর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ আমি তাঁর কাছে হাযির হলাম। রাসূলুল্লাহ্সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এই আয়াত তিলাওয়াত করে শোনালেন। সাহাবীগণ বললেনঃ এটি কি বিশেষ করে এরই জন্য না সব মানুষের জন্য। তিনি বললেনঃ না বরং এ সব মানুষের জন্যই।
[তিরমিযি ৩১১৫ https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=38467 ]

এই অভিযোগের জবাব কিভাবে দেয়া যায়?

Answer

উত্তর:
ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

প্রথমেই আমরা নিম্নোক্ত বিষয়গুলো পরিষ্কার করতে চাই:

১. হাদীসটির সঠিক প্রেক্ষাপট ও ব্যাখ্যা

হাদীসটি আবুল ইউসর (রাঃ) সম্পর্কে, যিনি এক মহিলাকে জোরপূর্বক চুমু দিয়েছিলেন। এটি ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতন ছিল না, বরং একটি পাপ কাজ যা তিনি নিজে স্বীকার করেছিলেন এবং অনুতপ্ত হয়েছিলেন। ইসলামী ফিকহ অনুসারে:

  • যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণ হল জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক, যা জিনার অন্তর্ভুক্ত এবং এর জন্য কঠোর শাস্তি (রাজম বা বেত্রাঘাত) রয়েছে, যদি তা প্রমাণিত হয় (সাক্ষী বা স্বীকারোক্তি দ্বারা)।
  • আবুল ইউসর এর কাজ ছিল ব্যভিচারের প্রাথমিক ধাপ, পূর্ণ জিনা নয়। তিনি পাপটি স্বীকার করে তওবা করেছিলেন।

২. কেন আবু বকর ও উমর (রাঃ) গোপন রাখতে বললেন?

তারা বলেছিলেন: "নিজের মধ্যে তা গোপন রাখ, আর তওবা কর। এ বিষয়ে কাউকে জানাবে না।"
এর কারণ:

  • ইসলামে পাপ গোপন রাখা উৎসাহিত, যদি তা জনসমক্ষে প্রকাশ না হয় এবং অপর ব্যক্তির অধিকার নষ্ট না করে। রাসূল (ﷺ) বলেছেন: "যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন।" (বুখারী, মুসলিম)
  • তবে অপর ব্যক্তির অধিকার নষ্ট হলে (যেমন: কেউ কারো সম্পদ চুরি করলে বা কারো শরীরে জোরপূর্বক আঘাত করলে) তাহলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং শাস্তি প্রযোজ্য হবে। আবুল ইউসর এর ক্ষেত্রে মহিলার কোনো শারীরিক ক্ষতি হয়নি, এবং তিনি তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেননি। তাই সাহাবাগণ তওবা ও গোপন রাখার পরামর্শ দেন।

৩. রাসূল (ﷺ) কেন শাস্তি দেননি?

রাসূল (ﷺ) শাস্তি দেবার আগে দেখতেন:

  • প্রমাণ আছে কিনা (চারজন পুরুষ সাক্ষী বা স্বীকারোক্তি)।
  • এখানে কোনো সাক্ষী ছিল না, শুধু আবুল ইউসর নিজেই স্বীকার করেছিলেন। ইসলামী আইনে স্বীকারোক্তি শাস্তির জন্য যথেষ্ট, কিন্তু রাসূল (ﷺ) তাকে শাস্তি না দিয়ে তওবা ও নামাযের নির্দেশ দিলেন। কারণ:
    • তাঁর তওবা এতই শুদ্ধ ছিল যে, তিনি নিজেকে জাহান্নামী মনে করছিলেন।
    • রাসূল (ﷺ) বুঝতে পেরেছিলেন যে, এটি একটি ভুল যা তিনি নিজে থেকে স্বীকার করেছেন এবং অনুতপ্ত হয়েছেন। ইসলামে তওবার দরজা সবসময় খোলা।
    • রাসূল (ﷺ) চেয়েছিলেন যে, ব্যক্তি যেন নিজের লজ্জা বাঁচিয়ে তওবা করে, যাতে সমাজে ফিতনা না ছড়ায়।

৪. আয়াত নাযিল ও তার অর্থ

আল্লাহ বলেন: "সৎকাজ অবশ্যই অসৎ কাজ মিটিয়ে দেয়।" (সূরা হুদ ১১:১১৪)
এটি পাপ মুছে ফেলার একটি পদ্ধতি, কিন্তু শর্তসাপেক্ষ:

  • পাপটি ছোট (সগীরা) হলে।
  • পাপটি বড় (কাবীরা) হলে এর জন্য বিশেষ তওবা ও ক্ষতিপূরণ প্রয়োজন।
  • রাসূল (ﷺ) বলেছেন: "পাঁচ ওয়াক্ত নামায ও জুমুআ এক জুমুআ পর্যন্ত ছোট পাপ মোচন করে, যদি বড় পাপ না করা হয়।" (মুসলিম)
    আবুল ইউসর এর পাপটি ছিল ছোট পাপের পর্যায়ে (যেহেতু পূর্ণ জিনা নয়), তাই নামায ও তওবা তা মিটিয়ে দিয়েছে।

৫. নাস্তিকদের অভিযোগের ভুল

  • অভিযোগ: ‘ইসলাম যৌন নির্যাতন গোপন রাখতে বলে’
    জবাব: ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত পাপ গোপন রাখতে বলে (যা অপরের ক্ষতি করেনি)। কিন্তু ধর্ষণ, নির্যাতন অপরের অধিকার নষ্ট করে, তাই তা গোপন রাখা জায়েজ নয়; বরং অভিযোগ দায়ের করা ফরজ। সাহাবীগণ আবুল ইউসর কে গোপন রাখতে বলেছিলেন কারণ তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মহিলার অধিকার লঙ্ঘন করেননি (তিনি তাকে চুমু দিয়েছিলেন কিন্তু জোরপূর্বক কিছু করেননি; আর তিনি পরে তওবা করেছিলেন)।
  • অভিযোগ: ‘শাস্তি নেই, শুধু নামায পড়লেই মাফ’
    জবাব: নামায শুধু ছোট পাপ মোচন করে, বড় পাপ (যেমন জিনা, ধর্ষণ) মোচনের জন্য শর্তসাপেক্ষ তওবা (পাপ ছেড়ে দেওয়া, অনুতপ্ত হওয়া, পুনরায় না করা, এবং অপরের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া) প্রয়োজন। ইসলামী রাষ্ট্রে প্রমাণিত ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের জন্য মৃত্যুদণ্ড বা বেত্রাঘাত রয়েছে (সূরা নূর ২৪:২; বুখারী)।
  • অভিযোগ: ‘ইসলাম নারীদের সুরক্ষা দেয় না’
    জবাব: ইসলাম নারীদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা দেয়। ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন ইসলামে কবীরা গুনাহ এবং এর জন্য কঠোর শাস্তি। রাসূল (ﷺ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি কোনো নারীকে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্কে বাধ্য করে, তার জন্য জাহান্নাম ওয়াজিব।” (আবু দাউদ)

৬. ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়িম, ইবন বায, আলবানী, উসাইমীন, ফাওযান প্রমুখের মতামত

  • শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন: “যে ব্যক্তি কোনো নারীকে জোরপূর্বক চুমু দেয় বা স্পর্শ করে, তা অবশ্যই পাপ। তবে যদি সে শুধু চুমু দেয় এবং পূর্ণ জিনা না করে, তাহলে তার তওবা কবুল হবে। কিন্তু যদি সে ধর্ষণ করে, তাহলে তার জন্য হদ্দ (শাস্তি) প্রযোজ্য এবং তা গোপন রাখা উচিত নয়।” (মাজমু ফাতাওয়া ৩৪/২১৪)
  • শাইখ ইবনে বায বলেন: “যৌন নির্যাতন একটি গুরুতর অপরাধ। ইসলামী রাষ্ট্রে অভিযোগ আনতে হবে এবং শাস্তি দিতে হবে। তবে ব্যক্তিগত পাপের ক্ষেত্রে গোপন রাখা উত্তম, যাতে সমাজে অশ্লীলতা ছড়িয়ে না পড়ে।” (ফাতাওয়া নূর আলাদ দারব)
  • শাইখ আলবানী বলেন: “এই হাদীস প্রমাণ করে যে, ইসলামে তওবার দরজা খোলা, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, অপরাধী বিনা শাস্তিতে মুক্তি পাবে। যদি অপরাধ প্রমাণিত হয়, তাহলে শাস্তি কার্যকর হবে।” (সহীহ সুনান তিরমিযী)

৭. সংক্ষেপে জবাব

  • হাদীসটি ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতন সম্পর্কে নয়; বরং একটি একক চুমু যা পূর্ণ জিনা নয়।
  • ইসলাম যৌন নির্যাতনের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান দিয়েছে, যা প্রমাণ সাপেক্ষে কার্যকর হয়।
  • পাপ গোপন রাখা শুধু তখনই জায়েজ, যখন তা অপরের অধিকার নষ্ট না করে এবং ফিতনা সৃষ্টি না করে।
  • তওবা ও নামায শুধু ছোট পাপ মোচন করে; বড় পাপের জন্য বিশেষ তওবা ও শাস্তি প্রয়োজন।
  • নাস্তিকদের উক্তি একটি ভুল ব্যাখ্যা এবং ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার।

আল্লাহু আলাম।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.