৫ ওয়াক্ত নামাযের প্রথম ওয়াক্ত কখন, কত মিনিট দেরি করলে আওয়াল ওয়াক্তে গণ্য হবে না, বিনা ওজরে দেরি করার হুকুম কি?

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 7362
Questioner: Tauhida Tina
Question Asked: 24 Oct 2026, 10:17 PM
Reviewed & Published: 24 Oct 2026, 10:28 PM
Views: 9
Tokens: 6,353
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

السلام عليكم ورحمة الله وبركاته
আমার সলাত কি আওয়াল ওয়াক্তে হয়েছে?

১) ৫ ওয়াক্ত সলাতেরই ওয়াক্ত হওয়ার পর পরই সলাতে দাড়িয়ে গেলেই কি শুধু আওয়াল ওয়াক্তে সলাত হিসেবে ধরতে পারব?

২)যদি ওয়াক্ত হওয়ার পর ৩/৪ মিনিট পর সলাতে দাঁড়াই তাহলে কি আমার সলাত আওয়াল ওয়াক্তে হয়েছে বলে গন্য হবে?

৩)যদি ১০-১৫ মিনিট লেইট করি, তাহলে কি আওয়াল ওয়াক্তে সলাত হিসেবে গন্য হবে?

৪) যদি ৩০ মিনিট/ ১ ঘণ্টা পর পড়ি,তাহলে কি আওয়াল ওয়াক্তে পড়া হবে?

৫) উপরক্তো সময়গুলোর যদি কোনো ওযর বা কারণ ছাড়াই সলাতে লেইট করি, তাহলেও কি তা আওয়াল ওয়াক্তে সলাতের সওয়াব থেকে বন্ঞিত হবো? যেমন: গল্প করা, কথা বলা, কুরআন পড়ে শুনানো।

৬) আওয়াল ওয়াক্তে সলাত লেইট করার জন্য বৈধ ওযরগুলো কি কি?

৭) আওয়াল ওয়াক্তে সলাত পড়ার ফজিলতগুলো কি কি?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।


১) ৫ ওয়াক্ত সালাতের ওয়াক্ত হওয়ার পর পরই সালাতে দাঁড়িয়ে গেলেই কি শুধু আওয়াল ওয়াক্ত ধরা হবে?

উত্তর: না, আওয়াল ওয়াক্ত কেবল আযান বা ওয়াক্ত শুরু হওয়ার প্রথম ১-২ সেকেন্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সালাতের পুরো সময়সীমাকে ফুকাহায়ে কেরাম মূলত তিনটি অংশে বিভক্ত করেছেন: আওয়াল ওয়াক্ত (প্রথমাংশ), আওসাত ওয়াক্ত (মধ্যাংশ) এবং আখির ওয়াক্ত (শেষাংশ)।

তাছাড়া, পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের ক্ষেত্রে হানাফী ফিকহ অনুযায়ী সালাত আদায়ের 'মুস্তাহাব উত্তম সময়' ভিন্ন ভিন্ন:

  • ফজর: পুরুষদের জন্য সুবহে সাদিকের পর একটু ফর্সা হওয়া পর্যন্ত বিলম্ব করে পড়া মুস্তাহাব (ইসফার), তবে নারীদের জন্য আযানের পর সুবহে সাদিকের প্রথমাংশেই (অন্ধকার থাকতে) ঘরে সালাত পড়া মুস্তাহাব।
  • যোহর: গ্রীষ্মকালে প্রচন্ড গরমের তীব্রতা কমানোর জন্য সামান্য বিলম্বে পড়া এবং শীতকালে আযানের পর দ্রুত প্রথমাংশেই পড়া মুস্তাহাব।
  • আসর: সূর্য মলিন ও লালচে হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সামান্য বিলম্বে পড়া মুস্তাহাব।
  • মাগরিব: ওয়াক্ত হওয়ার পরপরই অবিলম্বে আওয়াল ওয়াক্তে দ্রুত পড়া মুস্তাহাব।
  • এশা: রাতের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত বিলম্বে পড়া মুস্তাহাব।

কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:

  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৮৪–১৮৫ (অধ্যায়: সালাত, ২য় অনুচ্ছেদ: 'ওয়াক্তের ফযীলতের বিবরণ')।
  • নূরুল ঈযাহ: বাংলা সংস্করণ, পৃষ্ঠা: ৫৩–৫৫ (অধ্যায়: সালাত, 'ফরয সালাতের ওয়াক্তসমূহ')।

২) ওয়াক্ত হওয়ার ৩/৪ মিনিট পর সালাতে দাঁড়ালে কি আওয়াল ওয়াক্তে হয়েছে বলে গণ্য হবে?

উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই এটি আওয়াল ওয়াক্তে (প্রথমাংশে) পড়া হয়েছে বলেই গণ্য হবে।

ওয়াক্ত শুরু হওয়ার ৩-৪ মিনিট পর সালাতে দাঁড়ালে তা নিঃসন্দেহে আওয়াল ওয়াক্তের অন্তর্ভুক্ত। কারণ সালাতের জন্য অযু করা, পাক-পবিত্র হওয়া, সতরের পোশাক পরিধান করা এবং জামা'আতের প্রস্তুতি গ্রহণ করা ওয়াক্তের স্বাভাবিক কাজের অংশ।

কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:

  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৮৪–১৮৫।
  • নূরুল ঈযাহ: বাংলা সংস্করণ, পৃষ্ঠা: ৫৩–৫৪।

৩) ১০-১৫ মিনিট লেইট করলে কি আওয়াল ওয়াক্তে সালাত হিসেবে গণ্য হবে?

উত্তর: হ্যাঁ, ওয়াক্ত শুরু হওয়ার ১০-১৫ মিনিট পর পড়া হলেও তা আওয়াল ওয়াক্তের (প্রথমাংশের) পরিধিতেই গণ্য হবে।

যেহেতু সাধারণ ওয়াক্তের মেয়াদ প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা হয়ে থাকে, তাই প্রথম ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে সালাত শুরু করলে তা প্রথমাংশের মধ্যেই থাকে এবং আওয়াল ওয়াক্তের সওয়াব অর্জিত হয়।

কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:

  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৮৪–১৮৫।
  • নূরুল ঈযাহ: বাংলা সংস্করণ, পৃষ্ঠা: ৫৩।

৪) ৩০ মিনিট বা ১ ঘণ্টা পর পড়লে কি আওয়াল ওয়াক্তে পড়া হবে?

উত্তর: ৩০ মিনিট বা ১ ঘণ্টা পর সালাত পড়লে তা সালাতের 'আওসাত ওয়াক্ত' (মধ্যাংশ) বা পরবর্তী অংশে গণ্য হতে পারে।

তবে শরী'আতে যে সকল সালাত বিলম্বে পড়া মাসনূন বা মুস্তাহাব (যেমন: গ্রীষ্মকালে যোহর, আসর বা এশার সালাত), সেগুলোতে ৩০ মিনিট বা ১ ঘণ্টা পর পড়া হলে তা মুস্তাহাব সময় অনুযায়ী সালাত আদায় হবে এবং পূর্ণ সুন্নাতসম্মত সওয়াব পাওয়া যাবে। ওয়াক্তের ভেতরে সালাত আদায় হলে ফরয আদায় হয়ে যাবে।

কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:

  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৮৪–১৮৫।
  • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৩৩–১৩৪।

৫) কোনো ওযর বা কারণ ছাড়াই সালাতে লেইট করলে কি আওয়াল ওয়াক্তের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবো?

উত্তর: অহেতুক আলসেমি, কথা বলা, আড্ডা দেওয়া বা অলসতার কারণে কোনো শর'ঈ কারণ ছাড়াই সালাতে বিলম্ব করা অপছন্দনীয় (মাকরূহ)।

  • সওয়াবের বিষয়: ওজর ছাড়া অলসতা করে সালাত পিছিয়ে দিলে আওয়াল ওয়াক্তের যে বিশেষ অতিরিক্ত ফযীলত ও সওয়াব রয়েছে, তা থেকে মানুষ বঞ্চিত হয়। তবে ওয়াক্ত পার না হয়ে থাকলে সালাত আদায় সঠিক হয়ে যাবে এবং মূল ফরয সালাতের দায়িত্ব আদায় হবে।
  • শর'ঈ কাজের বিষয়: কিন্তু যদি দ্বীনী শিক্ষা দান, কুরআন তিলাওয়াত শেখানো বা দ্বীনী নসীহতের মতো শর'ঈ কোনো কল্যাণকর কাজের কারণে সালাতের প্রথম সময় পার হয়ে যায়, তবে তা শর'ঈ ওজর বলে বিবেচিত হবে এবং গুনাহ হবে না।

কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:

  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৮৪ ও ১৮৬–১৮৭।
  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ২৫তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩২০–৩২৫।

৬) আওয়াল ওয়াক্তে সালাত লেইট করার বৈধ শর'ঈ ওজরসমূহ কি কি?

উত্তর: সালাত প্রথমাংশ থেকে সামান্য বিলম্ব করার বৈধ শর'ঈ ওজরসমূহ হলো:

  1. সালাতের পূর্বশর্তসমূহ পূরণের তাগিদ: অযু বা গোসল করা, শরীর ও কাপড়ের নাজাসাত (নাপাকী) ধুয়ে পরিষ্কার করা, বস্ত্র পরিধান করা বা সতরের ব্যবস্থা করা।
  2. জামা'আতের অপেক্ষা ও উপস্থিতি: জামা'আতে সালাত আদায়ের জন্য মসজিদে গমন করা বা মুসল্লীদের উপস্থিতির জন্য অপেক্ষা করা।
  3. প্রাকৃতিক প্রয়োজন ও শারীরিক অবস্থা: প্রস্রাব বা পায়খানার তীব্র বেগ থাকা অবস্থায় সালাতে না দাঁড়িয়ে আগে তা নিবৃত্ত করা।
  4. খাবারের উপস্থিতি: ক্ষুধা থাকা অবস্থায় সামনে তৃপ্তিদায়ক খাবার উপস্থিত থাকলে সালাতে মন একাগ্র রাখার স্বার্থে আগে আহার গ্রহণ করা।
  5. শর'ঈ মুস্তাহাব সময়সীমা রক্ষা করা: যেমন—গ্রীষ্মকালে যোহরের তীব্র তাপ কমানো, আসর সূর্য লাল হওয়ার পূর্বে পড়া, এশা রাতের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত পিছিয়ে পড়া, অথবা জুমুআ ও ঈদের জামা'আতের প্রস্তুতি গ্রহণ করা।
  6. রোগ-ব্যাধি, সফর ও দ্বীনী ইলম চর্চা: চরম অসুস্থতা, সফরকালীন কষ্ট, বা দ্বীনী ইলম শিক্ষা ও নসীহতে ব্যস্ত থাকা।

কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:

  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৮৪–১৮৭ ও ১৮৮।
  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ২২তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৭৫–৭৮; এবং ২৫তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩২০–৩২৫।

৭) আওয়াল ওয়াক্তে সালাত পড়ার ফযীলতসমূহ কি কি?

উত্তর: আওয়াল ওয়াক্তে (বা নির্দেশিত মুস্তাহাব সময়ে) সালাত আদায়ের হাদীস ও ফিকহের কিতাবে বর্ণিত প্রধান ফযীলতসমূহ হলো:

  1. আল্লাহর নিকট সর্বশ্রেষ্ঠ ও প্রিয় আমল: হাদীস শরীফে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা.) বর্ণিত রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল— "আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমল কোনটি?" তিনি উত্তর দিয়েছিলেন: "ওয়াক্তের শুরুতে সালাত আদায় করা" (الصلاة في أول وقتها)।
  2. আল্লাহ তা'আলার বিশেষ সন্তুষ্টি লাভ: নবী করীম ﷺ ইরশাদ করেছেন— "প্রথম ওয়াক্তে সালাত আদায় করা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করায়, আর শেষ ওয়াক্তে সালাত আদায় করা আল্লাহর ক্ষমা লাভ করায়"।
  3. আল্লাহর জিম্মাদারী ও নিরাপত্তা অর্জন: আওয়াল ওয়াক্তে সালাত আদায়কারী ব্যক্তি বান্দা হিসেবে আল্লাহর সার্বক্ষণিক জিম্মাদারি ও হিফাযতে প্রবেশ করে।
  4. অলসতা ও মুনাফিকীর আলামত থেকে মুক্তি: সময় হওয়া মাত্রই আল্লাহর হুকুম পালনে সচেষ্ট হওয়া ঈমানের সততা নির্দেশ করে এবং অলসতা দূর করে।

কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:

  • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৩৮ (উদ্ধৃতি: মুসান্নাফে আব্দুর রায্যাক ২/৫৩০; সুনানে তিরমিযী ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৮০; আল-মু'জামুল কাবীর)।
  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৮৪–১৮৫ (অধ্যায়: সালাত, 'ওয়াক্তের ফযীলত')।
  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ২৫তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩২০–৩২৫।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.