শিক্ষক ক্লাসে প্রবেশ করলে শিক্ষার্থীদের দাঁড়িয়ে সম্মান করা কি হারাম?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি একজন শিক্ষার্থী। আমি ইউটিউব এ বিভিন্ন জায়গায় দেখেছি যে ক্লাসরুমে যখন শিক্ষক প্রবেশ করেন তখন শিক্ষার্থীরা যে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করে এই কাজটা নাকি হারাম। আমাদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা না দাড়ালে খুব মনোক্ষুণ্ন হন। ওনারা মনে করেন ওনাদের অসম্মান করা হয় না দাড়ালে।
এই বিষয় টা কি পাপ? তাহলে আমার কি করা উচিত??
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের সারমর্ম
প্রশ্নটি হলো—শিক্ষক ক্লাসরুমে প্রবেশ করলে শিক্ষার্থীদের দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করা কি হারাম বা পাপ? প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা না দাঁড়ালে মনোক্ষুণ্ন হন; এমতাবস্থায় শিক্ষার্থীর করণীয় কী?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
শিক্ষককে সম্মান ও ইজ্জত করা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তবে দাঁড়ানোর বিষয়টি নিয়ে শরীয়তের বিধান হলো:
- নিছক সম্মানসূচক দাঁড়ানো (কিয়াম) নিজে থেকে হারাম নয়; বরং এটি তখন হারাম/মাকরূহ হয় যখন তাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীসে নিষিদ্ধ "কিয়াম" তথা অহংকারী ব্যক্তির সামনে দাঁড়ানোর মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়, অথবা তাতে রিয়া/লোকদেখানো বা অহংকারের উদ্দেশ্য থাকে।
- শিক্ষকের প্রতি সম্মানার্থে দাঁড়ানো — এতে যদি শিক্ষকের অহংকার সৃষ্টি না হয় এবং শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্য নিছক সম্মান হয়, তবে তা নিষিদ্ধ নয়; বরং উত্তম আদব হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে হাদীসে এসেছে, সাহাবায়ে কিরাম রাসূল ﷺ-এর জন্য দাঁড়াতেন না, কারণ তিনি তা অপছন্দ করতেন—এটি ছিল তাঁর বিনয়ের কারণে।
- যে দাঁড়ানোকে হারাম বলা হয়—সেটি সাধারণত ওই ধরনের দাঁড়ানোকে বোঝায় যেখানে মানুষকে নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করা হয়, যা হাদীসে নিষিদ্ধ। শিক্ষকের প্রতি সম্মানসূচক দাঁড়ানো এর অন্তর্ভুক্ত নয়।
দলিল ও ব্যাখ্যা
১. হাদীস
- রাসূল ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি চায়, মানুষ তার সামনে দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান করুক, সে যেন জাহান্নামে নিজের স্থান তৈরি করে নিল।" (সুনানে তিরমিযী, হাদীস ২৭৫৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৫২২৯—ইমাম তিরমিযী হাসান বলেছেন)
- এ হাদীসের মর্ম হলো—মানুষকে নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে নিজের বড়ত্ব ও অহংকার প্রকাশ করা নিষিদ্ধ। শিক্ষার্থীদের সম্মানসূচক দাঁড়ানো এর অন্তর্ভুক্ত নয়, যদি শিক্ষকের উদ্দেশ্য অহংকার না হয়।
- অন্য হাদীসে: "তোমরা আমার জন্য দাঁড়িয়ো না, যেমন বড়লোকদের জন্য দাঁড়ানো হয়।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৫২৩০)
- এটি রাসূল ﷺ-এর বিনয়ের প্রকাশ; তিনি তাঁর জন্য বিশেষভাবে দাঁড়ানো অপছন্দ করতেন। এটি প্রমাণ করে—দাঁড়ানো নিজে থেকে হারাম নয়, বরং ব্যক্তির অবস্থা ও উদ্দেশ্যের উপর নির্ভরশীল।
২. ফিকহে হানাফীর বিধান
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন, ৬/৩৮২-৩৮৩, দারুল ফিকর) ও ফাতাওয়া আলমগীরী (৫/৩৪৮) -এ উল্লেখ আছে, কারও সম্মানার্থে দাঁড়ানো যদি তাতে অহংকার প্রকাশ না হয়, তবে তা জায়েয; আর যদি অহংকার প্রকাশ পায়, তবে নিষিদ্ধ।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী, ৪/২৭৬) -এ বলা হয়েছে: "কোনো ব্যক্তিকে সম্মানার্থে দাঁড়ানো যদি তার অহংকারের কারণ হয়, তবে তা নিষিদ্ধ; অন্যথায় জায়েয।"
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী, ৩/৫৬৭) -এও অনুরূপ বিধান উল্লেখ আছে—সম্মানসূচক দাঁড়ানো নিষিদ্ধ নয়, তবে অহংকারের উদ্দেশ্য থাকলে নিষিদ্ধ।
৩. শিক্ষকের প্রতি সম্মান
- হাদীসে এসেছে: "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে কুরআন শেখে ও শেখায়।" (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫০২৭)
- শিক্ষককে সম্মান করা ইসলামের শিক্ষা। ইমাম বুখারী (রহ.) তাঁর উস্তাদ ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহকে অত্যন্ত সম্মান করতেন এবং তাঁর সামনে বিনয় প্রকাশ করতেন।
- মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী, ১/৪৫৬) -এ উল্লেখ আছে, উস্তাদকে সম্মান করা ইলমের বরকতের কারণ।
আপনার করণীয়
- শিক্ষকদের সম্মান করুন—এটি ইসলামের নির্দেশ। দাঁড়ানো যদি আপনার প্রতিষ্ঠানের রীতি হয় এবং তাতে শিক্ষকের অহংকার সৃষ্টি না হয়, তবে দাঁড়ানোতে দোষ নেই; বরং এটি আদব।
- যদি শিক্ষকরা অহংকারবশত দাঁড়ানো দাবি করেন এবং না দাঁড়ালে অপমান বোধ করেন, তবে আপনার উচিত—নরমভাবে বোঝানো, তবে বিতর্কে না জড়ানো। আপনি দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করতে পারেন, কারণ এতে আপনার ইবাদত ও আদবেরই অংশ; আর শিক্ষকের অহংকারের দায়িত্ব তাঁর নিজের।
- যদি কেউ দাঁড়ানোকে হারাম বলে—তাকে বলুন, বিধানটি উদ্দেশ্য ও অবস্থার উপর নির্ভরশীল; সাধারণভাবে সম্মানসূচক দাঁড়ানো হারাম নয়।
- নিয়ত ঠিক রাখুন—দাঁড়ানোর সময় নিয়ত করুন শিক্ষকের সম্মান ও ইলমের বরকত লাভের; রিয়া বা লোকদেখানো থেকে বাঁচুন।
উপসংহার
শিক্ষককে সম্মানার্থে দাঁড়ানো সাধারণভাবে হারাম নয়; বরং এটি আদব ও সম্মানের অন্তর্ভুক্ত, যদি তাতে অহংকার বা রিয়ার উদ্দেশ্য না থাকে। হ্যাঁ, যদি দাঁড়ানোকে বাধ্যতামূলক করে অহংকার প্রকাশ করা হয়, তবে তা নিষিদ্ধ। আপনার করণীয় হলো—শিক্ষকদের সম্মান করা, দাঁড়ানোতে নিয়ত ঠিক রাখা, এবং কাউকে হারাম-হালাল ফতোয়া দিতে গিয়ে বিতর্কে না জড়ানো। আল্লাহ তাওফিক দান করুন।
والله أعلم بالصواب