পারিশ্রমিক হিসেবে কোরবানির মাংস কি কাউকে দেয়া যাবে?
Qurbani-Slaughtering · Hanafi
Question
যদি এটা "গরিবের ভাগ থেকে খুশি হয়ে দিচ্ছি" বলে উনাদের দেই, তাহলে কি জায়েয হবে?
Answer
উত্তর
প্রশ্নের সারমর্ম:
কসাইকে কুরবানীর কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে টাকার সাথে নির্দিষ্ট পরিমাণ গোশত (যেমন ৩ কেজি) দেওয়ার শর্ত করা হচ্ছে। কসাই বলছে, গোশত না দিলে কাজ করবে না; তবে বলছে যে গোশতটি “খুশি হয়ে” দিতে হবে, পারিশ্রমিক হিসেবে নয়। এ অবস্থায় গোশত দেওয়া জায়েয হবে কি? আর যদি “গরিবের ভাগ থেকে খুশি হয়ে” দেওয়া হয়, তাহলে কি জায়েয হবে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
এই শর্তে গোশত দেওয়া জায়েয নয়। কারণ কসাইয়ের কাজের বিনিময়ে গোশত নির্ধারণ করা বা শর্ত করা শরী‘আতে নিষিদ্ধ। এমনকি যদি কসাই একে “খুশি হয়ে দেওয়া” বলে, কিন্তু বাস্তবে তা কাজ করার শর্ত হয়, তবুও তা পারিশ্রমিকের পর্যায়ভুক্ত হবে। আর গরিবের ভাগ থেকে দেওয়াও জায়েয হবে না, কারণ তা গরিবের হক। হ্যাঁ, যদি কসাই নিজে গরিব হয় এবং তাকে কোনো শর্ত ছাড়া খুশি করে গোশত দেওয়া হয়, তবে তা জায়েয হতে পারে; কিন্তু প্রশ্নের বর্ণনায় শর্ত থাকায় তা বৈধ নয়।
বিস্তারিত বিধান ও দলিল
১. কুরবানীর গোশত পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া নিষিদ্ধ
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ قَتَلَ شَاةً فَلْيَمْسِكْهَا بِسَلْخِهَا، وَلَا يُعْطِيَنَّ الْجَازِرَ مِنْهَا شَيْئًا
“যে ব্যক্তি (কুরবানীর) বকরি যবেহ করবে, সে যেন তার চামড়া নিজে রেখে দেয় এবং কসাইকে তার থেকে কিছু না দেয়।”
(মুসলিম, হাদীস: ১৯৭৩; আবু দাউদ, হাদীস: ২৮২৩)
ইমাম ইবনে হুমাম (রহ.) বলেন:
“কুরবানীর পশু যবেহকারীকে তার মজুরি হিসেবে গোশত, চামড়া বা অন্য কিছু দেওয়া জায়েয নয়। কারণ এটা মজুরির অন্তর্ভুক্ত হবে, আর কুরবানীর গোশত বিক্রি বা বিনিময় করা নিষিদ্ধ।”
(ফাতহুল কাদীর, ৮/৪৮; রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২৭)
২. শর্তযুক্ত “খুশি হয়ে দেওয়া”ও পারিশ্রমিকের পর্যায়ভুক্ত
যদি কসাই কাজ করার শর্ত হিসেবে গোশত দাবি করে, তবে তা “খুশি হয়ে দেওয়া” নামে হলেও বাস্তবে তা মজুরি-ই। শরী‘আতে বস্তুগত বিনিময়ের ক্ষেত্রে নামের চেয়ে প্রকৃত অর্থ বিবেচিত হয়।
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৪; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৪৪)
৩. গরিবের ভাগ থেকে দেওয়া জায়েয নয়
কুরবানীর গোশত তিন ভাগে ভাগ করা সুন্নাত: এক-তৃতীয়াংশ নিজের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ আত্মীয়-প্রতিবেশীকে হাদিয়া, এবং এক-তৃতীয়াংশ গরিব-মিসকীনকে সদকা। গরিবের ভাগ থেকে কসাইকে দেওয়া যাবে না, যদি না কসাই নিজে গরিব হয় এবং তা শর্তহীনভাবে সদকা হিসেবে দেওয়া হয়। কিন্তু এখানে শর্ত থাকায় তা বৈধ হবে না।
(বাহেশতী জেওর, ৩/৪৬২; ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৮৪)
৪. হানাফী কিতাবের মূলনীতি
- আল-হিদায়া: “কসাইকে কুরবানীর গোশত বা চামড়া মজুরি হিসেবে দেওয়া জায়েয নয়। কারণ এটি বিক্রয়ের মতো, আর কুরবানীর বস্তু বিক্রি নিষিদ্ধ।”
- রদ্দুল মুহতার: “যদি কসাই গোশতের বিনিময়ে কাজ করতে রাজি হয়, তবে তা নাজায়েয। তবে কাজ শেষে তাকে খুশি করে কিছু দেওয়া আলাদা বিষয়, তা জায়েয; কিন্তু শর্ত সাপেক্ষে নয়।”
- ফাতাওয়া শামী: “যবেহকারীর মজুরি টাকা বা অন্য কোনো বস্তু হতে পারে, তবে কুরবানীর গোশত বা চামড়া নয়।”
সুপারিশ ও উত্তম পদ্ধতি
- কসাইকে তার কাজের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পারিশ্রমিক হিসেবে নির্ধারণ করুন।
- কাজ শেষে কোনো শর্ত ছাড়া তাকে কিছু গোশত হাদিয়া দিতে চাইলে তা নিজের ভাগ থেকে দিন, গরিবের ভাগ থেকে নয়।
- কসাই যদি গরিব হয়, তবে গরিবের ভাগ থেকেও তাকে শর্তহীনভাবে সদকা করা যেতে পারে, তবে প্রশ্নের মতো শর্ত সাপেক্ষে নয়।