স্ত্রী হিসাবে করনীয়
Family Life · Hanafi
Question
আমার প্রশ্ন হলো আল্লাহ তো মানুষের সাধ্যের বাহিরে কিছু চাপিয়ে দেন না! কিন্তু আমি তো এই মানসিক অশান্তির নিতে পারি না! আমি তো নিজেকে কন্টোল করতে পারি না! আমার এখানে কি করনীয়? আমি কিভাবে নিজেকে এই কষ্ট থেকে বাচাতে পারি? আমি অনেক বার তারসাথে এসব সমস্যা নিয়ে কথা বলেছি রুলস তৈরি করেছি কিছুতেই কিছু হয় নাই ! আমি কি তার উপর বোঝা? আমার এই কন্না করা কষ্ট পাওয়া কি তার জন্য অতিরিক্ত ? স্ত্রী হিসাবে কি আমি আমার স্বামির এতোটুকু ভালোবাসা পাই না?আমার কষ্ট পাওয়া খারাপ লাগার কোন দাম নেই? আমাকে ভালো রাখা কি তার দায়িত্ব না? বিয়েকে গালি দেওয়া এভাবে আঘাত করে কথা বলা কি গুনাহ না?আমি নিজেকে কিভাবে কষ্ট পাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারি? আমি মানুষ আমি কি ভুল করতে পারি না? একজন মানুষ হিসাবে সারাদিন চেষ্টা করার পর যখন দোষ শুনা লাগে তখন কি আমার কষ্ট পাওয়া স্বাভাবিক না?
Answer
স্ত্রী হিসেবে করণীয়: দাম্পত্য জীবনের মানসিক কষ্ট ও তার সমাধান
ভূমিকা
বোন, আপনার প্রশ্নটি পড়ে বুঝতে পারছি আপনি গভীর মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ের অধিকার ও সম্মান রক্ষা করেছে। আপনার অনুভূতি ও কষ্ট স্বাভাবিক, এবং ইসলামে এগুলোর মূল্য আছে। নিচে কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দিচ্ছি।
১. আল্লাহর বাণী: সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপানো হয় না
لَا يُكَلِّفُ اللّٰهُ نَفْسًا اِلَّا وُسْعَهَا "আল্লাহ কারো উপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপান না।" — (সূরা বাকারা: ২৮৬)
فَاِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا، اِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا "নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে, নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে।" — (সূরা ইনশিরাহ: ৫-৬)
ব্যাখ্যা (মা'আরিফুল কুরআন, মুফতি মুহাম্মদ শাফী রহ.): আল্লাহর এই ঘোষণা মানে—আপনার এই কষ্ট অসহনীয় নয়, আল্লাহ আপনার ধৈর্যের সীমা জানেন। তবে কষ্ট পাওয়া নিষিদ্ধ নয়; কষ্ট পাওয়া মানুষের স্বভাব। আল্লাহ চাপিয়ে দেন না, কিন্তু পরীক্ষা দেন—যাতে ধৈর্যের প্রতিদান পান।
২. স্বামীর প্রতি স্ত্রীর অধিকার: ইসলাম কী বলে?
(ক) সদাচরণ ও ভালোবাসার নির্দেশ
وَعَاشِرُوْهُنَّ بِالْمَعْرُوْفِ "তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" — (সূরা নিসা: ১৯)
هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَاَنْتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ "তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক।" — (সূরা বাকারা: ১৮৭)
মা'আরিফুল কুরআনে মুফতি মুহাম্মদ শাফী (রহ.) লেখেন: "পোশাক যেমন শরীরকে ঢেকে রাখে, শীত-গরম থেকে রক্ষা করে, তেমনি স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সম্মান, দোষ-গোপন ও নিরাপত্তার মাধ্যম।"
(খ) হাদীস: উত্তম স্বামী কে?
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের (স্ত্রীর) কাছে সর্বোত্তম।" — (তিরমিজি: ৩৮৯৫, ইবনে মাজাহ: ১৯৭৭)
اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا "নারীদের ব্যাপারে তোমাদের সদুপদেশ দিচ্ছি (তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করো)।" — (সহীহ বুখারী: ৫১৮৬, সহীহ মুসলিম: ১৪৬৮)
لَا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً، إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ "কোন মুমিন পুরুষ তার মুমিন স্ত্রীকে ঘৃণা করবে না; যদি তার কোন স্বভাব অপছন্দ হয়, তবে অপর স্বভাবে সন্তুষ্ট হবে।" — (সহীহ মুসলিম: ১৪৬৯)
ইমাম নববী (রহ.) এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন: "স্ত্রীর একটি দোষ দেখে তাকে সম্পূর্ণ ঘৃণা করা জায়েয নয়; কারণ তার মধ্যে অন্য অনেক গুণ থাকতে পারে।" (শরহে মুসলিম)
(গ) হাদীস: স্ত্রীর কান্না ও দুর্বলতার প্রতি সহানুভূতি
الرَّاحِمُونَ يَرْحَمُهُمُ الرَّحْمَنُ، ارْحَمُوا مَنْ فِي الْأَرْضِ يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ "দয়াশীলদের প্রতি রহমান দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া করো, তাহলে আসমানবাসী তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।" — (তিরমিজি: ১৯২৪, আবু দাউদ: ৪৯৪১)
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) 'বেহেশতী জেওর'-এ লেখেন: "স্ত্রীর প্রতি কঠোরতা, তার কান্না-কষ্টকে তুচ্ছ করা ইসলামের শিক্ষা নয়। স্বামীকে স্ত্রীর প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে।"
৩. বিয়ে-কে গালি দেওয়া ও কষ্টদায়ক কথা বলা—এটা কি গুনাহ?
হ্যাঁ, এটা গুনাহ। কারণ:
-
বিয়ে আল্লাহর নির্দেশ ও নবী (সা.)-এর সুন্নত। বিয়ে-কে গালি দেওয়া আল্লাহর বিধান ও সুন্নতকে তুচ্ছ করা।
وَمِنْ اٰيٰتِهٖۤ اَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِّنْ اَنْفُسِكُمْ اَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوْۤا اِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَّوَدَّةً وَّرَحْمَةً "তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও, আর তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।" — (সূরা রূম: ২১)
-
স্ত্রীকে কষ্ট দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
وَلَا تُمْسِكُوْهُنَّ ضِرَارًا لِّتَعْتَدُوْا "তাদেরকে কষ্ট দেওয়ার জন্য আটকে রাখো না।" — (সূরা বাকারা: ২৩১)
-
হাদীস: নবী (সা.) বলেছেন—
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ "নিজে কষ্ট পাবে না, অন্যকেও কষ্ট দেবে না।" — (ইবনে মাজাহ: ২৩৪১)
ইবনে আবিদীন (রহ.) 'রাদ্দুল মুহতার'-এ (কিতাবুন নিকাহ) লেখেন: "স্বামীর জন্য স্ত্রীকে অকারণে কষ্ট দেওয়া, গালি দেওয়া বা অপমান করা হারাম।"
ফতোয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী) ও ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভী) — উভয়েই স্পষ্ট: "স্ত্রীর সাথে দুর্ব্যবহার, তার অনুভূতিকে তুচ্ছ করা, তাকে অপমান করা ইসলামে নিষিদ্ধ।"
৪. আপনার কষ্ট পাওয়া কি স্বাভাবিক? এর দাম কি আছে?
হ্যাঁ, সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং ইসলামে এর মূল্য আছে।
-
আপনি মানুষ, ভুল করা আপনার স্বভাব। নবী (সা.) বলেছেন—
كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَّاءٌ، وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ "প্রত্যেক আদম-সন্তান ভুল করে; আর উত্তম ভুলকারী সেই, যে তাওবা করে।" — (তিরমিজি: ২৪৯৯)
-
কান্না করা দুর্বলতা নয়, এটি আল্লাহর রহমতের নিদর্শন। নবী (সা.) বলেছেন—
إِنَّ هَذِهِ الْقُلُوبَ لَتَرِقُّ "নিশ্চয়ই এই অন্তরগুলো কোমল হয় (কেঁদে ওঠে)।" — (আবু দাউদ: ৪৭৭৬)
-
আপনার কষ্টের প্রতিদান আছে। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন—
إِذَا ابْتَلَيْتُ عَبْدِي بِحَبِيبَتَيْهِ فَصَبَرَ عَوَّضْتُهُ مِنْهُمَا الْجَنَّةَ "যখন আমি আমার বান্দাকে তার দুটি চোখ (দৃষ্টি) হারিয়ে পরীক্ষা করি, আর সে ধৈর্য ধরে, আমি তাকে জান্নাতের প্রতিদান দেব।" — (সহীহ বুখারী: ৫৬৫৮)
আপনার কান্না, কষ্ট, ধৈর্য—সব আল্লাহর কাছে গণনা হচ্ছে। আপনার কষ্টের দাম আল্লাহর কাছে আছে।
৫. স্ত্রী হিসেবে আপনি কি স্বামীর ভালোবাসা পাওয়ার হকদার?
হ্যাঁ, অবশ্যই। ইসলামে স্বামীর উপর স্ত্রীর অধিকার:
- সদাচরণ ও ভালোবাসা — সূরা নিসা: ১৯
- ভরণপোষণ (নফকা) — সূরা বাকারা: ২৩৩; হাদীস: "তোমরা তাদের খাওয়াবে যেমন নিজে খাও, পরিধান করাবে যেমন নিজে পরিধান করো।" (আবু দাউদ: ২১৪৩)
- সম্মান ও মর্যাদা — নবী (সা.) বলেছেন: "স্ত্রী স্বামীর কাছে বন্দিনী নয়, আমানত।" (বুখারী, কিতাবুন নিকাহ)
- আবেগের প্রতি সম্মান — ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: "স্বামী স্ত্রীর আবেগ-অনুভূতির প্রতি লক্ষ্য রাখবে; তার কান্না-কষ্টকে তুচ্ছ করবে না।" (রাদ্দুল মুহতার)
আপনি তার বোঝা নন। আপনি তার স্ত্রী, তার আমানত, তার জান্নাতের সাথী। আপনার কষ্ট পাওয়া "অতিরিক্ত" নয়—এটা আপনার স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি।
৬. এখন আপনি কী করবেন? (করণীয়)
(ক) নিজের মানসিক শান্তির জন্য
-
সালাত ও দু'আয় মনোযোগ দিন। বিশেষ করে ফজর ও তাহাজ্জুদে আল্লাহর কাছে আপনার স্বামীর হৃদয় নরম করার দু'আ করুন।
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ "হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকে আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন।" — (সূরা ফুরকান: ৭৪)
-
যিকির বাড়ান। "لا حول ولا قوة إلا بالله"، "حسبي الله ونعم الوكيل" বেশি পড়ুন। এতে মানসিক চাপ কমে।
-
কান্না চেপে রাখবেন না। কান্না করা নিষিদ্ধ নয়; বরং একাকী আল্লাহর কাছে কেঁদে মন হালকা করুন। নবী (সা.)-ও কেঁদেছেন।
-
নিজের যত্ন নিন। ঘুম, খাওয়া, হাঁটা—শরীর সুস্থ রাখুন। মানসিক চাপে শরীরও ভাঙে।
(খ) স্বামীর সাথে সম্পর্কের জন্য
-
শান্ত সময়ে কথা বলুন। ঝগড়ার সময় নয়; বরং যখন তিনি শান্ত, তখন ভদ্রভাবে আপনার অনুভূতি জানান। "আমি তোমাকে ভালোবাসি, কিন্তু তুমি যখন এভাবে বলো, আমি খুব কষ্ট পাই" — এভাবে বলুন, অভিযোগ নয়।
-
তার জিদের সময় চুপ থাকুন। রাগের মুহূর্তে তর্ক করলে ঝগড়া বাড়ে। নবী (সা.) বলেছেন—
إِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَسْكُتْ "যখন তোমাদের কেউ রাগে, সে চুপ থাকুক।" — (মুসনাদ আহমাদ: ২১৩৭)
-
তার ভালো দিকগুলো স্মরণ করুন। শয়তান দাম্পত্যে ফাটল ধরায়। তার ছোট ছোট ভালো কাজগুলো মনে করুন।
-
একজন বিশ্বস্ত আলেম/পরিবারের বড়কে মধ্যস্থতা করতে বলুন। যদি সরাসরি কথা বলে সমাধান না হয়, তবে সম্মানিত কেউ (যেমন তার বাবা-মা বা আপনার পরিবারের বড়) বুঝিয়ে বলতে পারেন। কুরআনে আছে—
فَابْعَثُوْا حَكَمًا مِّنْ اَهْلِهٖ وَحَكَمًا مِّنْ اَهْلِهَا "তোমরা তার (স্বামীর) পরিবার থেকে একজন বিচারক ও তার (স্ত্রীর) পরিবার থেকে একজন বিচারক পাঠাও।" — (সূরা নিসা: ৩৫)
(গ) নিজের কষ্ট নিয়ন্ত্রণের জন্য
-
কষ্টের সময় ওযু করুন, নামাজে দাঁড়ান। নবী (সা.) রাগ ও দুঃখের সময় ওযু ও নামাজের নির্দেশ দিয়েছেন। (আবু দাউদ: ৪৭৮৪)
-
কষ্টকে আল্লাহর কাছে সঁপে দিন। "হে আল্লাহ, আমি অসহায়, আমার কষ্ট তুমি দেখছ। তুমি আমার জন্য উত্তম ব্যবস্থা করো।"
-
নিজেকে দোষ দেবেন না। আপনি ভুল করতে পারেন—এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আপনার মূল্য কমে না। আল্লাহ আপনাকে ভালোবাসেন।
-
মানসিক চাপ বেশি হলে একজন মুসলিম কাউন্সেলর/আলেমের পরামর্শ নিন। এটি দুর্বলতা নয়, বরং সুন্নত—নবী (সা.) নিজেও পরামর্শ নিতেন।
৭. বিশেষ সতর্কতা: আত্মহত্যার চিন্তা
আপনি লিখেছেন "মরে যেতে ইচ্ছে করে"। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক চিন্তা। ইসলামে আত্মহত্যা সম্পূর্ণ হারাম—
وَلَا تَقْتُلُوْۤا اَنْفُسَكُمْ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيْمًا "নিজেদের হত্যা করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু।" — (সূরা নিসা: ২৯)
এই চিন্তা এলে সাথে সাথে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান, ওযু করুন, নামাজ পড়ুন, এবং কোনো বিশ্বস্ত মানুষকে (মা, বোন, বান্ধবী, আলেম) জানান। আপনার জীবন আল্লাহর আমানত—এটি রক্ষা করা আপনার দায়িত্ব।
৮. সারসংক্ষেপ ও শেষ কথা
| প্রশ্ন | উত্তর | |---|---| | আল্লাহ কি সাধ্যের বাইরে চাপান? | না, কিন্তু পরীক্ষা দেন—ধৈর্যের প্রতিদান আছে। | | আমার কষ্ট পাওয়া স্বাভাবিক? | হ্যাঁ, সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও ইসলামে মূল্যবান। | | আমি কি তার বোঝা? | না, আপনি তার আমানত ও জান্নাতের সাথী। | | বিয়ে-কে গালি দেওয়া গুনাহ? | হ্যাঁ, কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও গুনাহ। |