জমি কেনার উদ্দেশ্য দোকান ভাড়া হলে যাকাত আসবে কি?

Zakat and Charity · Hanafi

Question No: 7325
Questioner: Md. Mehadi Hasan
Question Asked: 23 Oct 2026, 11:09 PM
Reviewed & Published: 24 Oct 2026, 01:08 AM
Views: 22
Tokens: 4,372
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু 'আলাইকুম।

জমি কেনার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে দোকান ভাড়া দিয়ে মাসে মাসে টাকা পাওয়া, হয়ত পরে বাসা ভাড়াও দেওয়া। এখন এটার আয় থেকে যাকাত আসবে কিনা, আসলে কিভাবে দিতে হবে?
পাশাপাশি আমার চাকরী আছে।
আবার অনেক সময় বাসা ভাড়া / দোকান ভাড়া নাও থাকতে পারে, খালি পড়ে থাকতে পারে। অথবা হয়ত নিজে কিছু ব্যবসা / ইনকামের জন্য কিছু করলাম।

কোন ক্ষেত্রে কি করা লাগতে পারে? এটা জানার জন্য।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনার জমিটি যেহেতু ভাড়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে কেনা—বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে নয়—সুতরাং এটি যাকাতযোগ্য সম্পদ (নিসাবের অন্তর্ভুক্ত) হিসেবে গণ্য হবে না; বরং এটি স্থাবর সম্পত্তি (عقار) হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে এর থেকে প্রাপ্ত ভাড়ার টাকা এবং আপনার চাকরির বেতন—এসব মিলে যদি নিসাব পরিমাণ (অর্থাৎ ৭.৫ তোলা স্বর্ণ বা ৫২.৫ তোলা রূপার সমমূল্য, যা বর্তমানে সাধারণত রূপার হিসাবে ধরা হয়) সম্পদ এক বছর পূর্ণ হওয়ার সময় আপনার মালিকানায় থাকে, তাহলে মোট নগদ/ব্যবসায়িক সম্পদের ২.৫% যাকাত দিতে হবে। জমির মূল্য বা বাড়ির মূল্য আলাদাভাবে যাকাতে যোগ হবে না।


বিস্তারিত ফিকহি আলোচনা

১. যাকাতযোগ্য সম্পদের সংজ্ঞা ও জমির হুকুম

যাকাত ফরজ হয় এমন সম্পদের উপর, যা নামি (বর্ধনশীল) অথবা ব্যবসার পণ্য (عروض التجارة)। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, শুধু ভাড়া আয়ের উদ্দেশ্যে কেনা জমি বা দোকান عروض التجارة-এর অন্তর্ভুক্ত নয়; কারণ এতে বিক্রয়ের নিয়ত নেই। এগুলো عقار (স্থাবর সম্পত্তি)।

আল-হিদায়া (কিতাবুয যাকাত): “ولا زكاة في العقار الذي لا يبتغى به التجارة”
অর্থ: যে স্থাবর সম্পত্তি ব্যবসার উদ্দেশ্যে রাখা হয়নি, তাতে যাকাত নেই।

রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন, ৩/২৬৯):
“لو اشترى داراً ليسكنها أو ليغلها لا زكاة فيها”
অর্থ: কেউ যদি বসবাস বা ভাড়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি কেনে, তাতে যাকাত নেই।

তবে ভাড়ার টাকা যখন আপনার হাতে আসে এবং তা নিসাবের সাথে মিলে এক বছর পূর্ণ হয়, তখন তা যাকাতযোগ্য নগদ সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে।

২. নিসাব ও হিসাবের পদ্ধতি

  • নিসাব: ৭.৫ তোলা স্বর্ণ (৮৭.৪৮ গ্রাম) অথবা ৫২.৫ তোলা রূপা (৬১২.৩৬ গ্রাম)। বর্তমানে সাধারণত রূপার নিসাব ধরা হয়, কারণ এটি অধিক দরিদ্রদের জন্য উপকারী (ইমাম আবু হানিফার অন্যতম মত এবং ফতোয়ার আলোকে)।

  • হিসাব: বছর শেষে আপনার কাছে থাকা—

    • নগদ টাকা (ভাড়া, বেতন, ব্যবসার আয়),
    • ব্যাংক ব্যালেন্স,
    • ব্যবসার পণ্য (যদি থাকে),
    • প্রাপ্য টাকা (যা আদায়যোগ্য),
    • স্বর্ণ-রূপা (ব্যবহারের জন্য রাখা হলেও নিসাব পূর্ণ হলে যোগ হবে)

    এসবের মোট মূল্য যদি নিসাব পরিমাণ বা তার বেশি হয় এবং এক চন্দ্রবর্ষ অতিক্রম করে, তাহলে ২.৫% যাকাত দিতে হবে।

  • জমি/দোকান/বাড়ির ভাড়া: ভাড়ার টাকা হাতে আসার পর তা আপনার নগদ সম্পদের সাথে যোগ হবে। যদি বছর শেষে মোট নগদ নিসাব পূর্ণ করে, তবে তার উপর যাকাত আসবে। জমির বাজারমূল্য বা বাড়ির মূল্য যাকাতে যোগ হবে না।

৩. ভাড়া না পাওয়া বা খালি পড়ে থাকার অবস্থা

  • ভাড়া না পাওয়া: যে মাসের ভাড়া এখনো আদায় হয়নি, তা প্রাপ্য (receivable) হিসেবে গণ্য। ইমাম আবু হানিফার মতে, প্রাপ্য ভাড়া যদি আদায়যোগ্য হয় এবং বছর পূর্ণ হওয়ার সময় আপনার সম্পদের সাথে যোগ করলে নিসাব পূর্ণ হয়, তবে তা-ও যাকাতে যোগ হবে। তবে আদায় না হওয়া পর্যন্ত যাকাত দিতে বাধ্য নন; আদায়ের পর বিগত বছরের যাকাত দিতে হবে (যদি নিসাব পূর্ণ হয়)।
  • খালি পড়ে থাকা: জমি বা দোকান খালি থাকলে তার যাকাত নেই; কারণ এটি স্থাবর সম্পত্তি। তবে যদি আপনি জমিটি বিক্রয়ের নিয়তে কিনে থাকেন, তাহলে তা ব্যবসার পণ্য হিসেবে গণ্য হবে এবং প্রতি বছর তার বাজারমূল্যের ২.৫% যাকাত দিতে হবে। আপনার ক্ষেত্রে যেহেতু ভাড়ার উদ্দেশ্য, তাই বিক্রয়ের নিয়ত না থাকলে যাকাত নেই।

৪. চাকরি ও ব্যবসার আয়

  • চাকরির বেতন এবং ব্যবসার আয়—সবই নগদ সম্পদ। বছর শেষে মোট নগদ নিসাব পূর্ণ করলে যাকাত ফরজ।
  • যদি আপনি নিজে ব্যবসা করেন, তবে ব্যবসার পণ্য (মাল) এবং নগদ—সব মিলিয়ে হিসাব করবেন।

৫. যাকাত দেওয়ার পদ্ধতি

  • বছর পূর্ণ হওয়ার দিনে (হিজরি চন্দ্রবর্ষ) আপনার মোট যাকাতযোগ্য সম্পদের ২.৫% হিসাব করে যাকাতের উপযুক্ত ৮ শ্রেণির (কুরআন ৯:৬০) যে কোনো এক বা একাধিককে দিতে হবে। সাধারণত ফকির, মিসকিন, ঋণগ্রস্ত, মুসাফির ইত্যাদি।
  • চাইলে একবারে দিতে পারেন, অথবা বছর শেষে হিসাব করে কিস্তিতে দিতে পারেন; তবে বছর পূর্ণ হওয়ার আগে অগ্রিম যাকাত দেওয়া জায়েজ (যদি নিসাব পূর্ণ হয়)।

৬. বিশেষ নোট

  • বাড়ি/দোকান ভাড়া থেকে আয়: ভাড়ার টাকা যদি আপনি মাসিক খরচে ব্যবহার করেন এবং বছর শেষে কিছুই অবশিষ্ট না থাকে, তাহলে যাকাত ফরজ হবে না। তবে যদি সঞ্চয় থাকে এবং নিসাব পূর্ণ হয়, তবে যাকাত আসবে।
  • ঋণ: আপনার উপর যদি ঋণ থাকে (যা পরিশোধ করতে হবে), তবে বছর শেষে নগদ সম্পদ থেকে ঋণ বাদ দিয়ে নিসাব হিসাব করবেন (ইমাম আবু হানিফার মতে, ঋণ বাদ দেওয়া যায়)।
  • স্বর্ণ-রূপা: যদি নিসাব পরিমাণ স্বর্ণ বা রূপা থাকে, তবে তা যোগ হবে; ব্যবহারের জন্য রাখা গহনাও ইমাম আবু হানিফার মতে যাকাতে যোগ হবে।

সারসংক্ষেপ

| বিষয় | যাকাতের হুকুম | |------|----------------| | ভাড়ার উদ্দেশ্যে কেনা জমি/দোকান/বাড়ি | যাকাত নেই (স্থাবর সম্পত্তি) | | ভাড়ার টাকা (হাতে আসার পর) | নগদ সম্পদ; নিসাব পূর্ণ হলে যাকাত | | চাকরির বেতন | নগদ সম্পদ; নিসাব পূর্ণ হলে যাকাত | | ব্যবসার পণ্য | ব্যবসার পণ্য হিসেবে যাকাত | | খালি পড়ে থাকা জমি/দোকান | যাকাত নেই (বিক্রয়ের নিয়ত না থাকলে) | | প্রাপ্য ভাড়া | আদায়ের পর হিসাব; নিসাব পূর্ণ হলে যাকাত | | বাড়ি/জমির বাজারমূল্য | যাকাতে যোগ হবে না |

পরামর্শ: প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট হিজরি তারিখ (যেমন রমজানের ১ তারিখ) নির্ধারণ করে আপনার সমস্ত নগদ, ব্যাংক ব্যালেন্স, ব্যবসার মাল, স্বর্ণ-রূপা এবং প্রাপ্য টাকা হিসাব করে নিসাব পূর্ণ হলে ২.৫% যাকাত আদায় করুন। জমি/বাড়ির মূল্য আলাদা করবেন না।


والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.