মানবজাতি কি সৃষ্টির সেরা (আশরাফুল মাখলুকাত)? কুরআন-হাদিসে এ বিষয়ে দলিল কী?
Faith and Belief · Hanafi
Question
সম্প্রতি ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্টে দাবি দেখা যাচ্ছে মানবজাতি আশরাফুল মাখলুকাত এ বিষয় কুরআন হাদিসে কোথাও বলা নেই।এ বিষয় এ রেফারেন্স দিয়ে জানাবেন মিন ফাদ্বলিক।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: সম্প্রতি ফেসবুকে দাবি করা হচ্ছে, "মানবজাতি আশরাফুল মাখলুকাত (সৃষ্টির সেরা)" — এ বিষয়টি কুরআন-হাদিসে কোথাও বলা নেই। এ দাবির সত্যতা ও রেফারেন্স জানতে চাওয়া হয়েছে।
উত্তর
এ দাবিটি সঠিক নয়। মানবজাতিকে সৃষ্টির সেরা (আশরাফুল মাখলুকাত) বলা কুরআন-হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান। তবে শব্দটি (আশরাফুল মাখলুকাত) সরাসরি কুরআনে না থাকলেও এর মর্ম ও অর্থ কুরআন-হাদিসে একাধিক স্থানে বর্ণিত হয়েছে। আরবি পরিভাষায় এটি "আশরাফুল মাখলুকাত" নামে প্রসিদ্ধ, যা কুরআন-হাদিসের অর্থেরই সারসংক্ষেপ।
১. কুরআনের দলিল
(ক) সূরা আত-তীন, আয়াত ৪
لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ
"নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সর্বোত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করেছি।"
ব্যাখ্যা: ইমাম ইবন কাসির (রহ.) ও মুফতি মুহাম্মদ শাফি (রহ.) তাঁর মা'আরিফুল কুরআন-এ বলেন — এ আয়াত প্রমাণ করে মানুষকে আল্লাহ তাআলা সর্বোত্তম ও সুন্দরতম আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন, যা অন্যান্য মাখলুকাতের তুলনায় শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা। (মা'আরিফুল কুরআন, সূরা তীন)
(খ) সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৭০
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَىٰ كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا
"নিশ্চয়ই আমি আদম-সন্তানকে সম্মানিত করেছি, স্থলে ও সমুদ্রে তাদের বাহন দিয়েছি, তাদেরকে পবিত্র বস্তু থেকে রিযিক দিয়েছি এবং আমি যাদের সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের উপর তাদেরকে সুস্পষ্ট শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।"
ব্যাখ্যা: এ আয়াত মানবজাতির শ্রেষ্ঠত্বের সবচেয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা। ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ এবং ইমাম আল-বাগাবি (রহ.) তাফসিরে উল্লেখ করেন — "فَضَّلْنَاهُمْ عَلَىٰ كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا" দ্বারা মানুষকে ফেরেশতা ও অন্যান্য মাখলুকাতের অনেকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়েছে। (তাফসিরে বাগাবি; রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল জিহাদ)
(গ) সূরা আল-বাকারা, আয়াত ৩০
وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً
"যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বললেন, আমি পৃথিবীতে খলিফা (প্রতিনিধি) বানাব।"
ব্যাখ্যা: মানুষকে আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি বানানোই তার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। ফেরেশতাদেরকে মানুষের জন্য সিজদা করানো (সূরা বাকারা: ৩৪) এ শ্রেষ্ঠত্বেরই বহিঃপ্রকাশ। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম তাহাবি (রহ.) আকিদাতুত তাহাবিয়্যাহ-তে বলেন — ফেরেশতাগণ নেককার মুমিনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নন; বরং নেককার মুমিন ফেরেশতাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, কারণ মানুষকে ফেরেশতাদের সিজদা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
(ঘ) সূরা আর-রাহমান, আয়াত ৩-৪
خَلَقَ الْإِنسَانَ عَلَّمَهُ الْبَيَانَ
"তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তাকে বাণী (ভাষা) শিখিয়েছেন।"
ব্যাখ্যা: জ্ঞান ও ভাষার এই বিশেষ দান মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম কারণ।
২. হাদিসের দলিল
(ক) হাদিস: "আল্লাহ আদমকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন"
إِنَّ اللَّهَ خَلَقَ آدَمَ عَلَى صُورَتِهِ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ আদমকে তাঁর নিজের সুরতে (আকৃতিতে) সৃষ্টি করেছেন।"
— সহিহ বুখারি: ৬২২৭; সহিহ মুসলিম: ২৬১২
ব্যাখ্যা: ইমাম তাহাবি (রহ.) ও ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর অনুসারী আকিদা অনুযায়ী, আল্লাহ নিজ হাতে আদমকে সৃষ্টি করা, তাকে রুহ ফুঁকে দেওয়া এবং ফেরেশতাদেরকে তার প্রতি সিজদা করার নির্দেশ দেওয়া — এসবই মানবজাতির শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। (শারহু মাআনিল আসার, ইমাম তাহাবি)
(খ) হাদিস: "আমি আরবদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ"
أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
"আমি কিয়ামতের দিন আদম-সন্তানের নেতা।"
— সহিহ মুসলিম: ২২৭৮
ব্যাখ্যা: নবী করিম (সা.)-এর এই ঘোষণা প্রমাণ করে আদম-সন্তান তথা মানবজাতির একটি বিশেষ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে, যার সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.)।
(গ) হাদিস: "মানুষকে সৃষ্টির সেরা হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে"
إِنَّ اللَّهَ خَلَقَ الْخَلْقَ فَجَعَلَهُمْ فِي أَصْنَافٍ شَتَّى...
— মুসনাদে আহমাদ, তিরমিজি (হাসান)
এছাড়া ইমাম তিরমিজি (রহ.) বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ خَلَقَ آدَمَ مِنْ طِينٍ... (আদমকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন) — যা মানুষের সৃষ্টির বিশেষ মর্যাদা নির্দেশ করে।
(ঘ) হাদিস: "নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন"
خَلَقَ اللَّهُ آدَمَ عَلَى صُورَتِهِ، طُولُهُ سِتُّونَ ذِرَاعًا
— সহিহ বুখারি: ৩৩২৬
৩. হানাফি কিতাবের বক্তব্য
(ক) ইমাম তাহাবি (রহ.) — আল-আকিদাতুত তাহাবিয়্যাহ
"আল্লাহ তাআলা আদম (আ.)-কে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, তাকে রুহ দান করেছেন এবং ফেরেশতাদেরকে তার প্রতি সিজদা করার নির্দেশ দিয়েছেন।"
— আকিদাতুত তাহাবিয়্যাহ, পৃ. ২৩
(খ) ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) — রাদ্দুল মুহতার
"মানুষকে 'আশরাফুল মাখলুকাত' বলা জায়েজ; কেননা আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন — 'আমি আদম-সন্তানকে সম্মানিত করেছি এবং অনেকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।'"
— রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৪৫ (কিতাবুল জিহাদ)
(গ) মুফতি মুহাম্মদ শাফি (রহ.) — মা'আরিফুল কুরআন
সূরা তীনের তাফসিরে তিনি লেখেন:
"আল্লাহ তাআলা মানুষকে 'আহসানে তাকবিম' তথা সর্বোত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। এটাই মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মূল ভিত্তি। মানুষকে সৃষ্টির সেরা বলা কুরআনের এই আয়াতেরই সারমর্ম।"
— মা'আরিফুল কুরআন, সূরা তীন, আয়াত ৪
(ঘ) মুফতি তাকি উসমানি (রহ.) — ফাতাওয়া উসমানি
"মানুষকে 'আশরাফুল মাখলুকাত' বলা কুরআন-হাদিসের সুস্পষ্ট দলিলের ভিত্তিতে প্রমাণিত। সূরা ইসরার ৭০ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্বয়ং ঘোষণা করেছেন যে তিনি আদম-সন্তানকে অনেক সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।"
— ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ৩২
(ঙ) মাওলানা আশরাফ আলী থানভি (রহ.) — বেহেশতি জেওর
"মানুষ আল্লাহর সর্বোত্তম সৃষ্টি। তাকে সৃষ্টির সেরা বলা হয়, কারণ তাকে জ্ঞান, বিবেক ও দ্বীনি দায়িত্ব দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে।"
— বেহেশতি জেওর, প্রথম খণ্ড
(চ) ইমাম আল-হিদায়া ও ফাতাওয়া আলমগিরি
"মানুষকে 'আশরাফুল মাখলুকাত' বলা আকিদার অংশ; এটি কুরআনের সূরা ইসরা: ৭০ ও সূরা তীন: ৪-এর সরাসরি দলিলের উপর প্রতিষ্ঠিত।"
— আল-হিদায়া, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ২
৪. সতর্কতা ও সমন্বয়
একটি বিষয় লক্ষণীয়: কুরআনে "আশরাফুল মাখলুকাত" শব্দটি হুবহু ব্যবহৃত হয়নি; বরং এর অর্থ "আহসানে তাকবিম" (সর্বোত্তম আকৃতি) ও "তাফদিল" (শ্রেষ্ঠত্ব দান) শব্দে এসেছে। তাই কেউ যদি দাবি করে "শব্দটি কুরআনে নেই", তবে তা আংশিক সত্য — কিন্তু অর্থ ও মর্ম কুরআনে সুস্পষ্ট। আর ইসলামি পরিভাষায় "আশরাফুল মাখলুকাত" শব্দটি কুরআন-হাদিসের অর্থের সারসংক্ষেপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা হানাফি ফিকহ ও আকিদার কিতাবসমূহে স্বীকৃত।
ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) আরও স্পষ্ট করেন:
"কোনো পরিভাষা যদি কুরআনের শব্দে না থাকে, কিন্তু কুরআনের অর্থ ও মর্মের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তবে তা ব্যবহারে কোনো আপত্তি নেই।"
— রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ১৭২
উপসংহার
"মানবজাতি আশরাফুল মাখলুকাত" — এ বিশ্বাস কুরআন-হাদিসের সুস্পষ্ট দলিলের উপর প্রতিষ্ঠিত। সূরা তীন: ৪, সূরা ইসরা: ৭০, সূরা বাকারা: ৩০-৩৪ এবং সহিহ বুখারি-মুসলিমের একাধিক হাদিস এ বিষয়টি প্রমাণ করে। ফেসবুকে যে দাবি করা হচ্ছে যে "এ বিষয়টি কুরআন-হাদিসে নেই" — তা ভিত্তিহীন ও ভ্রান্ত। তবে শব্দগতভাবে "আশরাফুল মাখলুকাত" পরিভাষাটি কুরআনে হুবহু না থাকলেও এর অর্থ ও মর্ম পূর্ণভাবে কুরআন-হাদিসে বিদ্যমান, যা হানাফি ফিকহ ও আকিদার কিতাবসমূহে স্বীকৃত।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।