বাবার সামনে লজ্জাস্থ্যসহ সারা শরীর উন্মুক্ত করা কি গুনাহ? মা-বাবার দাম্পত্য সম্পর্কে কোনো সমস্যা হবে কি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
ফতোয়া: বাবার সামনে শরীর উন্মুক্ত হওয়ার বিধান
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
প্রশ্নের সারমর্ম
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—বাবার সামনে লজ্জাস্থ্যসহ সমস্ত শরীর উন্মুক্ত হয়ে গেলে গুনাহ হবে কি? এবং এতে মা-বাবার দাম্পত্য সম্পর্কে কোনো সমস্যা হবে কি?
১. প্রথম প্রশ্নের উত্তর: বাবার সামনে লজ্জাস্থানসহ পুরো শরীর উন্মুক্ত হলে কি গুনাহ হবে?
এখানে দুইটি ভিন্ন পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে:
-
ক) যদি ইচ্ছাকৃতভাবে বা বিনা ওজরে উন্মুক্ত করা হয়:
ইসলামি শরীআতে মাহরাম পুরুষের (যেমন পিতা) সামনে একজন নারীর ফরয সতর হলো নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ (অর্থাৎ নাভি থেকে হাঁটু ও লজ্জাস্থান আবৃত রাখা ফরয)। সুতরাং কোনো শারীরিক ওজর বা চিকিৎসা ব্যতীত ইচ্ছা করে অথবা অনর্থক বাবার সামনে লজ্জাস্থান বা নাভি থেকে হাঁটুর অংশ অনাবৃত করা কঠোরভাবে হারাম ও কবিরা গুনাহ। -
খ) যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে বা চিকিৎসার ওজরে ঘটে থাকে:
যদি নিজের অজান্তে, অনিচ্ছাকৃতভাবে, অসাবধানতাবশত কিংবা প্রসূতি অবস্থা, গুরুতর অসুস্থতা বা চিকিৎসাজনিত চরম বাধ্যবাধকতার (জরুরত) কারণে সতরের অংশ প্রকাশ পেয়ে যায়, তবে এতে বিন্দুমাত্র কোনো গুনাহ হবে না ।
ফিকহের সর্বসম্মত মূলনীতি হলো: «الضرورات تبيح المحظورات» (জরুরত বা চিকিৎসা বাধ্যবাধকতা নিষিদ্ধ বিষয়কেও সাময়িকভাবে ক্ষমাযোগ্য করে তোলে) [৩৮৩, ৩৮৪]। অনিচ্ছাকৃত ঘটনার জন্য আল্লাহর দরবারে তওবা-এস্তেগফার করলেই ক্ষমা পাওয়া যায়।
২. দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর: এতে কি মা-বাবার বৈবাহিক সম্পর্কে কোনো সমস্যা হবে?
উত্তর: না, এতে মা-বাবার বৈবাহিক সম্পর্কের ওপর বিন্দুমাত্র কোনো খারাপ প্রভাব পড়বে না এবং মা-বাবার বিবাহ ভাঙবে না [১৪৫, ১৪৬, ১৪৭]।
- ফিকহী কারণ ও ব্যাখ্যা:
১. ইসলামি ফিকহে 'হুরমতে মুসাহারা' (যার কারণে বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙে হারাম হয়ে যায়) সাব্যস্ত হওয়ার জন্য অকাট্য শর্ত হলো—পিতা কর্তৃক স্বীয় কন্যার অভ্যন্তরীণ লজ্জাস্থানের দিকে ঠিক ওই মুহূর্তে কামভাব বা তীব্র যৌন উত্তেজনা (شهوة) সহকারে দৃষ্টিপাত করা।
২. স্রেফ অসাবধানতাবশত শরীর উন্মুক্ত হয়ে পড়া, অনিচ্ছাকৃত হঠাৎ নজর যাওয়া, কিংবা প্রসূতি/অসুস্থ অবস্থায় স্বাভাবিক সেবা বা চিকিৎসার সময় কোনো প্রকার কামভাব ছাড়া নজর পড়ার কারণে কখনোই হুরমতে মুসাহারা সাব্যস্ত হয় না।
৩. তাই এ জাতীয় কাল্পনিক ভয় বা সন্দেহ শয়তানের সৃষ্টি করা অহেতুক ওয়াসওয়াসা ছাড়া আর কিছুই নয়। আপনার মা-বাবার বিবাহ বন্ধন পূর্বের ন্যায় শতভাগ সহীহ, নিরাপদ ও বহাল রয়েছে ।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৫ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৩২৭ (অধ্যায়: কিতাবুল কারাহিয়্যাহ, ৮ম পরিচ্ছেদ: সতর ও দৃষ্টিপাতের বিবরণ): (মাহরামের সামনে নারীর সতরের সীমানা নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত হওয়া এবং চিকিৎসার ওজরে সতর দেখার বাধ্যবাধকতার বিধান)।
২. দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৩৮৩–৩৮৪ (অধ্যায়: আধুনিক চিকিৎসা ও সতর খোলার ফিকহী সীমারেখা): (চিকিৎসাজনিত প্রয়োজন ও জরুরতে সতর খোলার শরয়ী শিথিলতা)।
- পৃষ্ঠা: ৩৭০–৩৭২ (অধ্যায়: সতরের শরয়ী গুরুত্ব): (বিনা ওজরে সতর অনাবৃত রাখার নিষেধাজ্ঞা)।
৩. দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৪৫–১৪৮ (অধ্যায়: হুরমতে মুসাহারাত: কিছু জটিলতা ও সমাধান): (পিতার দৃষ্টিপাতের কারণে হুরমতে মুসাহারা সাব্যস্ত হওয়ার কঠোর শর্তাবলী, কামভাবের শর্ত এবং অহেতুক সন্দেহে বিবাহ না ভাঙার অকাট্য সিদ্ধান্ত)।
৪. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৯শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৭০ (অধ্যায়: বাবুল হিজাব): (কামভাব ছাড়া অনাকাঙ্ক্ষিত দৃষ্টিপাত বা সেবা-চিকিৎসার ক্ষেত্রে হুরমতে মুসাহারা সাব্যস্ত না হওয়া)।
والله أعلم بالصواب