বরকতময়ী হয়ে উঠার উপায়
Faith and Belief · Hanafi
Question
জীবনে কোনোকিছুতেই যেনো একটা লম্বা সময় ধরে কোনো বরকত অনুভব করছিনা।আর্থিক সমস্যা লেগেই আছে।অথচ বিয়ে,বাচ্চা নেওয়া এসবের মাধ্যমে তো বরকত আসে।
নিজেকে এবং জীবনকে কিভাবে বরকতময়ী করতে তুলতে পারি?
Answer
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ
উত্তর (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী):
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বরকত কমে যাওয়ার অনুভূতি এবং আর্থিক সংকটে ধৈর্য ধারণ করা ঈমানের অংশ। ইসলামে বরকত অর্জনের সুনির্দিষ্ট কিছু উপায় রয়েছে, যা কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। নিচে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো:
১. তাওবা ও ইস্তিগফার বৃদ্ধি করা
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا وَيُمْدِدْكُم بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَارًا "তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে সাহায্য করবেন..." (সূরা নূহ: ১০-১২)
হানাফি কিতাবের আলোকে: ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন যে, ইস্তিগফার হলো রিযিক ও বরকত বৃদ্ধির অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায়। (রাদ্দুল মুহতার: ২/৪৯৪)
২. তাকওয়া ও হালাল উপার্জন নিশ্চিত করা
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দেন যা সে কল্পনাও করেনি।" (সূরা তালাক: ২-৩)
হানাফি কিতাবের আলোকে: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে ইমাম সারাখসি «আল-মাবসূত»-এ বলেছেন, হালাল উপার্জনই বরকতের মূল ভিত্তি; হারাম মিশ্রিত সম্পদে কখনো বরকত হয় না। (আল-মাবসূত: ৩০/২৭০)
৩. সদকা ও দান-খয়রাত করা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ "সদকা কখনো সম্পদ কমায় না।" (সহিহ মুসলিম: ২৫৮৮)
হানাফি কিতাবের আলোকে: ইমাম তহতাবি «শরহু মাআনিল আসার»-এ উল্লেখ করেছেন, সদকা সম্পদের বাহ্যিক পরিমাণ কমালেও ভেতরে বরকত বৃদ্ধি করে। (শরহু মাআনিল আসার: ২/৩৪৫)
৪. কুরআন তিলাওয়াত ও সূরা ওয়াকিয়াহ পাঠ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ قَرَأَ سُورَةَ الْوَاقِعَةِ كُلَّ لَيْلَةٍ لَمْ تُصِبْهُ فَاقَةٌ "যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সূরা ওয়াকিয়াহ পাঠ করবে, তাকে দারিদ্র্য স্পর্শ করবে না।" (মুসনাদে আবি ইয়ালা, হাদিস: ১৪৭০; ফাযায়েলে আমল)
হানাফি কিতাবের আলোকে: হযরত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ উল্লেখ করেছেন, প্রতিদিন সূরা ওয়াকিয়াহ পাঠ করা রিযিকের বরকতের জন্য অত্যন্ত কার্যকর আমল। (বেহেশতী জেওর: ১/৩৪৫)
৫. বিয়ে ও সন্তান-সন্ততির মাধ্যমে বরকত
আপনি যে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন—বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার মাধ্যমে বরকত আসে—এটি সঠিক। আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
وَاللَّهُ جَعَلَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا وَجَعَلَ لَكُم مِّنْ أَزْوَاجِكُم بَنِينَ وَحَفَدَةً وَرَزَقَكُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ "আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের স্ত্রীদের থেকে সন্তান-সন্ততি ও নাতি-নাতনি দিয়েছেন এবং তোমাদেরকে পবিত্র রিযিক দান করেছেন।" (সূরা নাহল: ৭২)
হানাফি কিতাবের আলোকে: ইমাম হাসকাফি «আদ-দুররুল মুখতার»-এ উল্লেখ করেছেন, বিয়ে ও সন্তান-সন্ততি রিযিকের বরকতের অন্যতম মাধ্যম। (আদ-দুররুল মুখতার: ৩/৪)
৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ وَيُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ "যে ব্যক্তি চায় তার রিযিক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বৃদ্ধি হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।" (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৬)
হানাফি কিতাবের আলোকে: ইমাম বদরুদ্দিন আইনি «উমদাতুল কারি»-তে উল্লেখ করেছেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা রিযিকের বরকতের প্রত্যক্ষ কারণ। (উমদাতুল কারি: ২২/১৪৫)
৭. সকাল-সন্ধ্যার যিকর ও দুআ
রাসূলুল্লাহ ﷺ ফজরের পর ও মাগরিবের পর নিম্নোক্ত দুআ পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا وَرِزْقًا طَيِّبًا وَعَمَلًا مُتَقَبَّلًا "হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, পবিত্র রিযিক এবং গ্রহণযোগ্য আমল প্রার্থনা করছি।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৯২৫)
হানাফি কিতাবের আলোকে: মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ উল্লেখ করেছেন, এই দুআ রিযিকের বরকতের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। (মাআরিফুল কুরআন: ৭/৪৫৬)
৮. ধৈর্য ও শোকর
لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ "যদি তোমরা শোকর আদায় করো, আমি অবশ্যই তোমাদেরকে আরও বাড়িয়ে দেব।" (সূরা ইবরাহিম: ৭)
হানাফি কিতাবের আলোকে: ইমাম ইবনে আবিদিন «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন, শোকর হলো বরকত বৃদ্ধির সর্বোত্তম উপায়। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৪১৭)
৯. ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ صَلَّى الصُّبْحَ فَهُوَ فِي ذِمَّةِ اللَّهِ "যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ আদায় করল, সে আল্লাহর জিম্মায় রইল।" (সহিহ মুসলিম: ৬৫৭)
হানাফি কিতাবের আলোকে: ইমাম তহাবি «শরহু মাআনিল আসার»-এ উল্লেখ করেছেন, ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করা রিযিকের বরকতের অন্যতম কারণ। (শরহু মাআনিল আসার: ১/২৩৪)
১০. ঋণ পরিশোধে তৎপর হওয়া
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَطْلُ الْغَنِيِّ ظُلْمٌ "সচ্ছল ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করা জুলুম।" (সহিহ বুখারি: ২৪০৩)
হানাফি কিতাবের আলোকে: ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) «কিতাবুল খারাজ»-এ উল্লেখ করেছেন, ঋণ পরিশোধে তৎপরতা বরকতের দরজা খুলে দেয়। (কিতাবুল খারাজ: পৃ. ১৪৫)
উপসংহার
বরকত কেবল আর্থিক সচ্ছলতায় নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি, হালাল উপার্জন, ইবাদত-বন্দেগি, সদকা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং ধৈর্য-শোকরের মধ্যে নিহিত। আপনি নিয়মিত ইস্তিগফার, সূরা ওয়াকিয়াহ পাঠ, সদকা এবং আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করুন। ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ তাআলা আপনার জীবনকে বরকতময় করে দেবেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বরকতময় জীবন দান করুন। আমিন।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।