সুস্থ হওয়ার শর্তে প্রতি মাসে ১০০০ টাকা দানের মানত করার পর পূর্ণ করা সম্ভব না হলে করণীয় কি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
ওস্তাদ, আমি একজন সরকারি চাকুরীজীবি। ৭-৮ বছর আগে আমি একবার অসুস্থ হই। তখন আমি মানত করি যে, আমি যদি সুস্থ হই এ সমস্যা টা থেকে তাহলে আমি প্রতিমাসে আমার বেতন থেকে ১০০০ টাকা করে আল্লাহর রাস্তায় দান করে যাবো। কিন্তু পরবর্তীতে আমি সুস্থ হওয়ার পর ১০০০ টাকা করে হয়তো ২/১ মাস দেওয়ার পর আর কন্টিনিউ দান করতে পারি নি। এবং আমি কিছু পারিবারিক ঋণ ও ঝামেলায় পরে যাই। আমার আর নিয়মিত ১০০০ টাকা দান দেওয়া হয় নি। অনেক সময় ১০০০ টাকা কষ্টও মনে হয়।
এখন আমি চাচ্ছিলাম এভাবে ফিক্সড না করে আমি আমার সাধ্যমতো আল্লাহর রাস্তায় দান করতে। তাহলে আমার পূর্ববর্তী কসম/মানতের কাফফারা কি হবে?
এ বিষয়টা নিয়ে চিন্তার কারণে আমি ইবাদত ও অন্যান্য আমলে শান্তি পাচ্ছি না। আমার কাছে মনে হয় আমি তো অনেক বড় নাফরমানি করেছি আল্লাহর তাছাড়া ঐ ওয়াদা না রাখাতে আমার তো কিছুই কবুল হচ্ছে না।
আর এ ধরনের মানত জায়েজ আছে কি না? আমরা অসুস্থ হলে বা অন্য কোন বিপদের মুহুর্তে কিভাবে মানত /সাহায্য করতে পারি?
জাযাকাল্লাহ খইরন
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
জবাব
আপনার মনের ব্যাকুলতা, আল্লাহর দরবারে জবাবদিহিতার অনুভূতি এবং ইবাদতে একাগ্রতা ফিরে পাওয়ার আকুলতা অত্যন্ত অনুধাবনযোগ্য। শরীআতে কঠিন পরিস্থিতি বা ওজরের সময় বান্দার জন্য সহেজ সমাধান রাখা হয়েছে। অহেতুক দুশ্চিন্তা বা শয়তানের ওয়াসওয়াসায় ভুগে নিজের ওপর ইবাদতকে কঠিন করার প্রয়োজন নেই।
আপনার উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট ফিকহী সমাধান ফাতাওয়া ও ফিকহে হানাফীর প্রামাণ্য কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বরসহ নিচে বিস্তারিত পেশ করা হলো:
১. মানত পরিবর্তন করা ও পূর্বের বকেয়া মানতের ফিকহী সমাধান ও কাফফারা:
-
মানত পূরণ করার মূল বিধান:
আপনি যখন অসুস্থ অবস্থায় মানত করেছিলেন—"সুস্থ হলে প্রতিমাসে ১০০০ টাকা করে আল্লাহর রাস্তায় দান করব"—এবং আল্লাহ তাআলা আপনাকে আরোগ্য দান করেছেন, তখন ফিকহে হানাফীসহ সর্বসম্মত শরীআতের বিচারে আপনার জন্য সেই মানত পূরণ করা ওয়াজিব (অবশ্যক) হয়ে গিয়েছিল।
(পবিত্র কুরআন: “তারা যেন তাদের মানতসমূহ পুরো করে।” - সূরা আল-হাজ্জ: ২৯; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২১৭)। -
বর্তমান অনটন/ঋণ ও মানত পরিবর্তনের ফিকহী নিয়ম:
যেহেতু পরবর্তীতে পারিবারিক ঋণ ও আর্থিক ঝামেলার কারণে আপনার পক্ষে নিয়মিত প্রতিমাসে ১০০০ টাকা দান করা সম্ভব হয়নি বা বর্তমানে তা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে, তাই ফিকহের আলোক আপনার জন্য ২টি বিকল্প শরয়ী সমাধান রয়েছে:১. প্রথম সমাধান (ক্বাযা ও সাধ্যানুযায়ী আদায়): অতীতে যে মাসগুলোতে আপনি টাকা দিতে পারেননি, সেগুলোকে আপনার ওপর আল্লাহর পাওনা ধরে নিয়ে আপনার সাধ্য অনুযায়ী যখন যতটুকু সম্ভব হয় (যেমন: মাসে ৫০০, ৩০০ বা সামর্থ্য অনুযায়ী) দান করে পেছনের বকেয়া মানত আস্তে আস্তে আদায় করে দিতে পারেন ।
২. দ্বিতীয় সমাধান (মানতের কাফফারা দেওয়া): যদি আপনি পারিবারিক ঋণগ্রস্ত হওয়ার কারণে বা স্থায়ী আর্থিক কষ্টের কারণে প্রতিমাসে ফিক্সড ১০০০ টাকা মানত বজায় রাখতে একেবারেই অক্ষম হন, তবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদীস—“মানতের কাফফারা হলো কসমের কাফফারা” (সহীহ মুসলিম)—এর আলোকে আপনি একবার কসমের কাফফারা (কফফারায়ে ইয়ামীন) আদায় করে এই নির্দিষ্ট ফিক্সড মানতের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত হতে পারেন। কাফফারা দেওয়ার পর থেকে আপনি ফিক্সড না রেখে নিজের সাধ্যমতো নফল সাদাকা দান করতে পারবেন। -
কসম/মানতের কাফফারা আদায়ের নিয়ম:
কাফফারা হলো—১০ জন মিসকীনকে দু'বেলা পেট পুরে খানা খাওয়ানো অথবা ১০ জন মিসকীনকে স্বাভাবিক পরিধানের পোশাক দান করা (অথবা প্রত্যেক মিসকীনকে ১টি করে সাদকাতুল ফিতরের সমপরিমাণ টাকা/গম দান করা)। আর যদি আপনি এতটুকু আর্থিক সামর্থ্যও না রাখেন, তবে টানা ৩টি রোযা রাখতে হবে।(গ্রন্থসূত্র: ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২১৬–২১১৭; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া, ১৪শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫৮ & ৭০) ।
২. অনুতাপ, মনোকষ্ট ও ইবাদত কবুল হওয়া না হওয়ার সংশয় নিরসন:
- ইবাদত কবুল না হওয়ার ভয় ভুল ও শয়তানের প্ররোচনা:
আপনার মনে যে চিন্তা আসছে—"আমি বড় নাফরমানি করেছি, আমার তো কিছুই কবুল হচ্ছে না"—এটি সম্পূর্ণ অহেতুক ভয় এবং শয়তানের প্ররোচনা/ওয়াসওয়াসা। - পাপমুক্তির উপায় (তাওবা ও এস্তেগফার):
ইসলামে অনটন বা ওজরের কারণে মানত পূরণে বিলম্ব হলে বান্দা যখন অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে তাওবা ও এস্তেগফার করে এবং কাফফারা বা সাধ্যমতো আদায়ের ব্যবস্থা করে, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেন। - আপনার ফরয নামায, কায়মনোবাক্যে দুআ ও অন্যান্য আমল ইনশাআল্লাহ আল্লাহর দরবারে কবুল হবে। মানতের এই সমস্যার কারণে আপনার অন্যান্য ইবাদত বাতিল বা অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। তাই মন থেকে অহেতুক গ্লানি ঝেড়ে ফেলে প্রফুল্ল মনে ইবাদত চালিয়ে যান।
৩. অসুস্থতায় এমন শর্তযুক্ত মানত করার শরয়ী হুকুম ও সুন্নাহসম্মত বিকল্প পদ্ধতি:
-
শর্তযুক্ত মানতের শরয়ী হুকুম (মাকরূহ কিন্তু কার্যকর):
কোনো নিয়ামত বা বিপদ মুক্তির সাথে শর্ত জুড়ে মানত করা (যেমন: "সুস্থ হলে ১০০০ টাকা দেব") ফিকহের বিচারে মাকরূহ বা অপছন্দনীয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন: “মানত কারো ভাগ্য পরিবর্তন করে না; বরং এর মাধ্যমে কৃপণের কাছ থেকে কিছু মাল বের করা হয়” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
তবে মাকরূহ হওয়া সত্ত্বেও কেউ যদি এমন মানত করে ফেলে এবং শর্ত পূরণ হয় (সুস্থ হয়ে যায়), তখন তা আদায় করা ওয়াজিব হয়ে যায়। -
অসুস্থতা বা বিপদের সময় সুন্নাহসম্মত সাহায্য চাওয়ার পথ:
ভবিষ্যতে কোনো অসুস্থতা বা বিপদের মুখোমুখি হলে শর্তযুক্ত মানত না করে নিচের ৩টি সুন্নাহসম্মত পথ অবলম্বন করা উত্তম ও বরকতময়:১. নগদ শর্তহীন সাদাকা দেওয়া: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন: “তোমাদের রোগীদেরকে সাদাকার মাধ্যমে চিকিৎসা করো” (শুআবুল ঈমান, বায়হাকী)। বিপদ বা রোগের শুরুতে কোনো শর্ত ছাড়া আল্লাহর ওয়াস্তে সাধ্যমতো সাদাকা দেওয়া সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ।
২. আকুল দুআ ও সালাতুল হাজত: দুই রাকাআত সালাতুল হাজত পড়ে আল্লাহর দরবারে কান্না ও বিনয়ের সাথে আরোগ্য প্রার্থনা করা।
৩. মাসনুন দোয়া ও রুকইয়াহ: কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত দুআসমূহ পাঠ করা ও ঝাড়ফুঁক (রুকইয়াহ) করা।(গ্রন্থসূত্র: ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২১৫–২১৭; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া, ১৪শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৬২–৭০; দরসুল ফিকহ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৬৯)।
আল্লাহ ভালো জানেন।