আমার ঈমান আর বিবাহিত জীবন কি ঠিক আছে?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 7253
Questioner: Md Nasir
Question Asked: 22 Oct 2026, 03:09 PM
Reviewed & Published: 22 Oct 2026, 03:18 PM
Views: 21
Tokens: 10,279
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১)আসলে একদিন রাতে আমি মোবাইল দেখতেছিলাম। তখন আমি হঠাৎ করেই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস নিয়ে বাজে একটা কথা বলে ফেলি। পরে সেটা আমি মনে মনে বলি নাকি মুখেই বলছি আমার মনে পড়ে না। আমার হাসবেন্ড আমার পাশে শুয়ে ছিল। আমার যতদুর মনে পড়ে আমি হয়তো মনে মনেই বলি। কারন আমাকে তো পুরা বাক্য উচ্চারণ করতে হবে। সেই কথা টা বলার জন্য। আমি তো পুরা বাক্য উচ্চারণ করি নাই মুখে। এভাবে নিজেকে বুঝ দেই। কিন্তু আমি এখনো নিশ্চিত না আমি মনে মনে বললাম নাকি মুখে মুখে বললাম। একবার মনে হয় মুখে উচ্চারণ করেছি। আবার মনে হয় করিনি। আমার ঈমান কি ঠিক আছে?

২)  এখন আজকে একটা ভিডিও দেখতেছিলাম। সেখানেও বিশ্বাস নিয়ে একটা কথা ছিল। এটা শুনেই আমার সেদিন আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস নিয়ে কি বলেছিলাম সেটা মনে হয়ে যায়। আর সেটা মনে মনে নাকি মুখেই বললাম এটাও মনে হয়ে যায়। এটা নিয়ে টেনশন এ পড়ে যাই। বুকের ভিতর অনেক খারাপ লাগে।
এটা নিয়ে ভাবতে থাকি। ভাবতে ভাবতে মুখ হা করে এক দুই বার চেক করে দেখি। মানে মুখ হা করে বড় বড় শাস নেই। আর মনে মনে সেই কথা টা আবার বলি নিশ্বাস এর সাথে। দেখতে কোনো সাউন্ড হয় কিনা। কিন্তু আমি নিশ্বাস এর সাউন্ড ছাড়া কোন সাউন্ড শুনতে পাই নাই। এভাবে চেক করার কারনে কি কোনো সমস্যা হবে?

৩)  যতবারই ভাবি আর চেক করবো না। ততবারই কোনো না কোন ভাবে চেক করি। যেমন - মুখ হা করে জোরে জোরে শাস নেই। তখন ফিস ফিস করে কথা বল লে যেমন সাউন্ড হয়, এমন একটা সাউন্ড হয় নিশ্বাস এর । এই সাউন্ড এর সাথে সাথে আমি সেই বাজে কথা টা মনে মনে বলি। দেখতে। কোনো উচ্চারণ হয় কিনা।
এখন আমার ঈমান কি ঠিক আছে?

৪) হুজুর ধরেন কোনো ওসওয়াসা নাই, কিছু নাই, একদম সুস্থ। কেউ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস নিয়ে সেই বাজে কথা টা অবচেতন মনে মুখে উচ্চারণ করে বলে ফেললো, মানে সে তার সজ্ঞান এর মধ্য নাই। আর এখন পযন্ত জানেও না তার মুখ দিয়ে এমন কথা বের হয়ে গিয়েছিল কিনা। যদি এমন ভাবে কোনো বাজে কথা মুখ দিয়ে বলে ফেলে আর সে এখন অবদি না জানে তাহলে তার ঈমানে কি কোনো সমস্যা হবে? 

৫) আর যদি সুস্থ জ্ঞান আছে কিন্তু কোনো হতাশা, কান্নাকাটি করে, হঠাৎ করেই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস নিয়ে এমন বাজে কথা এমন বলে ফেলে মুখে উচ্চারণ করে, আর সাথে সাথে মাফ চায় তখন তার ঈমানের কি হবে?

৬) আমার ঈমান আর বিবাহিত জীবন কি ঠিক আছে?
৭) আমি কি আপনাদের উত্তর এর উপর আমল।করতে পারবো?

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নগুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং আপনার মনের অবস্থা বোঝা যাচ্ছে। আপনি যে চিন্তায় ভুগছেন, এটি ইসলামে 'ওয়াসওয়াসা' (শয়তানের কুমন্ত্রণা) হিসেবে পরিচিত। শয়তান আপনার ঈমান নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করতে চায়। প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে নিন: আপনার ঈমান ঠিক আছে, ইনশাআল্লাহ। আপনি কুফরির (অবিশ্বাসের) নিয়তে বা ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাসের কথা বলেননি; বরং এটি ছিল হঠাৎ মনে আসা একটি বাজে চিন্তা বা শয়তানের প্ররোচনা, যা আপনি ভয় পেয়ে দূর করতে চেয়েছেন।

নিচে আপনার প্রশ্নগুলোর ধারাবাহিক উত্তর দেওয়া হলো:

১) মুখে বলেছি নাকি মনে মনে বলেছি—এই সন্দেহ হলে ঈমান কি ঠিক আছে?

উত্তর: ইসলামি ফিকহের একটি মূলনীতি হলো: "الیقین لا یزول بالشک" (নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা দূর হয় না)। আপনার ঈমানের ব্যাপারে নিশ্চিত বিষয় হলো আপনি মুসলিম এবং আপনি কুফরি কথায় বিশ্বাস করেন না। আপনি সন্দেহ করছেন যে মুখে বলেছিলেন কি না। যেহেতু আপনি নিশ্চিত নন যে আপনি মুখে উচ্চারণ করেছিলেন, তাই শুধু সন্দেহের কারণে আপনার ঈমান বাতিল হবে না। তাছাড়া আপনি যদি মুখে উচ্চারণও করে থাকেন, কিন্তু আপনার অন্তরে সেই কথার প্রতি বিশ্বাস না থাকে এবং আপনি তা ঘৃণা করেন, তবে তা কুফরি হবে না; বরং এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা হিসেবে গণ্য হবে।

রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৩৯-২৪০: "لا يكفر من تكلم بكلمة الكفر هازلا أو غافلا..." (যে ব্যক্তি ঠাট্টা বা অসতর্কতাবশত কুফরের কথা বলে, সে কাফির হয় না, যদি তার অন্তরে বিশ্বাস না থাকে)।
  • ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৩৫: ওয়াসওয়াসার কারণে মুখ থেকে বের হওয়া কথায় ঈমান নষ্ট হয় না, যতক্ষণ না অন্তরে বিশ্বাস স্থাপন করা হয়।

২) মুখ খুলে শ্বাস নিয়ে চেক করা এবং শব্দ না পাওয়া—এতে কি কোনো সমস্যা হবে?

উত্তর: আপনি মুখ খুলে শ্বাস নিয়ে চেক করেছেন যে কোনো শব্দ হচ্ছে কি না। এটি শুধু একটি পরীক্ষা ছিল। এতে আপনার ঈমানের কোনো ক্ষতি হয়নি। আপনি শ্বাসের শব্দ ছাড়া অন্য কোনো শব্দ পাননি, যা প্রমাণ করে আপনি মুখে উচ্চারণ করেননি। তবে বারবার এভাবে চেক করা শয়তানের ওয়াসওয়াসার অংশ। এটি আপনার মানসিক শান্তি নষ্ট করছে। আপনার উচিত এই ধরনের চেক করা বন্ধ করা এবং আল্লাহর উপর ভরসা করা।

রেফারেন্স:

  • ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৪: "الوسوسة لا تضر إذا لم يستقر في القلب" (ওয়াসওয়াসা ক্ষতি করে না, যতক্ষণ না তা অন্তরে স্থিত হয়)।

৩) বারবার চেক করা এবং শ্বাসের সাথে বাজে কথা মনে মনে বলা—ঈমান কি ঠিক আছে?

উত্তর: আপনি শ্বাসের শব্দের সাথে সাথে সেই বাজে কথাটি মনে মনে বলছেন, এটি শুধু আপনার মনের ভেতরের চিন্তা। মুখে উচ্চারণ না করলে এবং অন্তরে বিশ্বাস না করলে এটি ঈমানের কোনো ক্ষতি করে না। বরং আপনি যেহেতু ভয় পাচ্ছেন এবং এটি দূর করতে চাচ্ছেন, এটি প্রমাণ করে আপনার ঈমান সুরক্ষিত আছে। শয়তান আপনাকে কষ্ট দিতে চায়। আপনি এই চেক করা বন্ধ করুন এবং "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ে শয়তান থেকে আশ্রয় চান।

রেফারেন্স:

  • বাহিশতী জেওর, ঈমান ও আকাইদ অধ্যায়: "মনে মনে কুফরির চিন্তা আসলে ঈমান নষ্ট হয় না, যতক্ষণ না মুখে উচ্চারণ বা অন্তরে বিশ্বাস করা হয়।"
  • মা'আরিফুল কুরআন, সূরা নাসের তাফসীর: শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতে হবে।

৪) অবচেতন মনে মুখে বাজে কথা বলে ফেলা এবং না জানা—ঈমানের কি হবে?

উত্তর: যদি কেউ সজ্ঞান না থাকে (যেমন ঘুমন্ত, অচেতন বা মানসিকভাবে অসুস্থ) এবং মুখ থেকে বাজে কথা বের হয়ে যায়, তবে তার ঈমানের কোনো ক্ষতি হবে না। কারণ ইসলামে দায়িত্ব শুধু সজ্ঞান ও ইচ্ছাকৃত কাজের উপর। হাদিসে এসেছে: "رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثٍ..." (তিন ব্যক্তির উপর থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে: ঘুমন্ত ব্যক্তি, শিশু এবং পাগল)। সুতরাং, অবচেতন মনে কিছু বলা হলে তা মুয়াখাযা (জবাবদিহি) হবে না।

রেফারেন্স:

  • সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৪০৩: "رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثٍ: عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ..."
  • আল-হিদায়া, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৯০: "لا يؤاخذ المجنون والنائم..." (পাগল ও ঘুমন্ত ব্যক্তি দায়বদ্ধ নয়)।

৫) সুস্থ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও হতাশা বা কান্নাকাটি করে মুখে বাজে কথা বলা এবং সাথে সাথে মাফ চাওয়া—ঈমানের কি হবে?

উত্তর: যদি কেউ হতাশায় বা আবেগের বশে মুখে কুফরির কথা বলে ফেলে, কিন্তু সাথে সাথে অনুতপ্ত হয় এবং মাফ চায়, তবে তার ঈমান নষ্ট হবে না, যদি সে অন্তরে সেই কথার প্রতি বিশ্বাস না রাখে। তবে তাকে অবশ্যই তাওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন: "إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ" (নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন)। [সূরা বাকারা: ২২২]

রেফারেন্স:

  • ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৭৪: "إذا قال كلمة الكفر ثم تاب قبلت توبته" (কুফরের কথা বলার পর তাওবা করলে তা কবুল হয়)।
  • রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৪১: "التوبة من الكفر مقبولة" (কুফর থেকে তাওবা কবুল হয়)।

৬) আমার ঈমান আর বিবাহিত জীবন কি ঠিক আছে?

উত্তর: ইনশাআল্লাহ, আপনার ঈমান ঠিক আছে। আপনি যেহেতু কুফরির বিশ্বাস করেন না, বরং ভয় পান এবং অনুতপ্ত হন, এটি প্রমাণ করে আপনার অন্তরে ঈমান বিদ্যমান। আপনার বিবাহিত জীবনও ঠিক আছে। আপনার স্বামীর সাথে সম্পর্কের কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়, কারণ আপনি কোনো পাপ কাজ করেননি। শয়তানের ওয়াসওয়াসা আপনার মনের শান্তি নষ্ট করছে। আপনি আপনার স্বামীর সাথে এ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে পারেন এবং তাকে বলতে পারেন যে আপনি শয়তানের ওয়াসওয়াসায় ভুগছেন। তার সহযোগিতা আপনার জন্য উপকারী হবে।

রেফারেন্স:

  • মা'আরিফুল কুরআন, সূরা নাস: "শয়তান মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়, যা ঈমানদারকে কষ্ট দেয়। কিন্তু ঈমানদার আল্লাহর স্মরণে তা দূর করে।"

৭) আমি কি আপনাদের উত্তরের উপর আমল করতে পারব?

উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই। আপনি নিম্নলিখিত আমলগুলো করতে পারেন: ১. তাওবা করুন: আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের চিন্তা থেকে আশ্রয় চান। ২. ওয়াসওয়াসা উপেক্ষা করুন: যখনই এমন বাজে চিন্তা আসবে, সাথে সাথে "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন এবং সেই চিন্তা নিয়ে ভাবা বন্ধ করুন। ৩. চেক করা বন্ধ করুন: মুখ খুলে শ্বাস নিয়ে পরীক্ষা করা বন্ধ করুন। এটি শয়তানের ফাঁদ। আপনি যত চেক করবেন, শয়তান তত আপনাকে সন্দেহে ফেলবে। ৪. আল্লাহর উপর ভরসা করুন: আল্লাহ তাআলা বলেন: "وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ" (যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট)। [সূরা তালাক: ৩] ৫. স্বামীর সাথে আলোচনা করুন: আপনার স্বামীকে আপনার অবস্থা বুঝিয়ে বলুন এবং তার কাছ থেকে মানসিক সমর্থন নিন। ৬. দোয়া করুন: "আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযান, ওয়া আউযুবিকা মিনাল আজযি ওয়াল কাসাল..." (হে আল্লাহ, আমি দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে আপনার আশ্রয় চাই...)।

সতর্কতা: আপনার অবস্থা যদি খুব বেশি খারাপ হয় এবং আপনি মানসিকভাবে অসুস্থ বোধ করেন, তবে একজন ভালো মুসলিম কাউন্সেলর বা ডাক্তারের পরামর্শ নিন। ইসলাম মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়ার নির্দেশ দেয়।

রেফারেন্স:

  • ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৩৬: "الوسوسة من الشيطان، فاستعذ بالله منها" (ওয়াসওয়াসা শয়তানের পক্ষ থেকে, তাই তা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাও)।
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৫: "لا تلتفت إلى الوساوس، فإنها من الشيطان" (ওয়াসওয়াসার দিকে মনোযোগ দিও না, কারণ তা শয়তানের পক্ষ থেকে)।

আল্লাহ তাআলা আপনার ঈমানকে মজবুত করুন এবং শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.