হাদীস পড়ে বিরক্তি, নবী (সা.)-কে নিয়ে বাজে খেয়াল, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস নিয়ে সন্দেহ ও ওয়াসওয়াসা — এসব কি ঈমান বাতিল করে?
Faith and Belief · Hanafi
Question
২) মনে মনে যে বিরক্ত হলাম সেই ইসলামিক পোস্ট টা পড়ে। নবীর হাদিস সেখানে যা লিখা ছিল ওটা নিয়ে৷ এটার জন্য কি ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?
৩) এগুলা ভাবতে ভাবতে মনে মনে আরো বাজে কথা বলে ফেলছি । নবীকে নিয়ে। আল্লাহ মাফ করুক। আমি মনে মনে এগুলা বলতেছি আবার মনে মনেই বলতেছি এমন না, এমন না। মানে এক মনে অইসব কথা আসতেছে, আরেক মনে আমি বলতেছি এমন না, এমন না। এখন আমার খুব খারাপ লাগতেছে হুজুর।আল্লাহ কি আমাকে ধরবেন?
আমার ঈমান কি ঠিক আছে?
৪)এগুলা করার পরে আমি নিজে নিজে ভাবতে থাকি আর মুখে উচ্চারণ করে বলি যে," আমি জাস্ট বিরক্ত হইছি। অন্য কোনো কিছু বলি নাই"। মানে সেই হাদিস টা পড়ে আমার বিরক্ত চলে আসছিলো। তাই এটা আমি মুখে উচ্চারণ করে বলি। নবীর হাদিস পড়ে বিরক্ত হয়ে মুখে এমন উচ্চারণ করা তে কি ঈমানের কোনো সমস্যা হবে?
৫)এখন মুখে "আমি তো জাস্ট বিরক্ত হইছি, অন্য কিছু বলি নাই"। এটা বলে, মনে মনে অন্য কথা বললে কি কোনো সমস্যা হবে? মানে মুখে এই কথা উচ্চারণ করে বললে, আর মনে মনে কার উপর কিসের উপর বিরক্ত হইছি সেটা বললে কি ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?
৬) মুখে উচ্চারণ করে - "আমি তো জাস্ট বিরক্ত হইছি, অন্য কিছু বলি নাই"। এটাই শুধু বলছি। এখন মুখে বলেছি "শুধু বিরক্ত হইছি" কিন্তু মনে মনে অন্য কিছু বলেছি। হাফ মুখে বললে, হাফ মনে মনে বললে । এখন কি মনের টা ধরা হবে? নাকি পুরো বাক্য স্পষ্ট ভাবে মুখে উচ্চারণ করলেই ধরা হবে?
৭)এতক্ষন মনে হচ্ছিল সব তো মনে মনেই বললাম। কোনো সমস্যা হবে না ইন শা আল্লাহ। কিন্তু এখন এই একটা কথা মুখে উচ্চারণ করে ফেলছি তাই চিন্তা হচ্ছে। আমি যে মুখে উচ্চারণ করে বললাম "আমি তো জাস্ট বিরক্ত হইছি, অন্য কিছু বলি নাই"। এখানে কার উপর কিসের উপর বিরক্ত হইছি সেটা উচ্চারণ করি নাই। এখন শুধু এটুকু কথা " আমি জাস্ট বিরক্ত হইছি " উচ্চারণ করার জন্য আমার ঈমানে কোনো সমস্যা হয়েছে?
৮) হাদিস পড়ে সেটা নিয়ে বিরক্ত হওয়া আমার কাছে অনেক বড় অপরাধ মনে হচ্ছে। কারন নবী যেটা বলেছেন সেটা পড়ে বিরক্ত কেন আসবে? আমার ঈমান কি ঠিক আছে?
৯)
আসলে একদিন রাতে আমি মোবাইল দেখতেছিলাম। তখন আমি হঠাৎ করেই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস নিয়ে বাজে একটা কথা বলে ফেলি। পরে সেটা আমি মনে মনে বলি নাকি মুখেই বলছি আমার মনে পড়ে না। আমার হাসবেন্ড আমার পাশে শুয়ে ছিল। আমার যতদুর মনে পড়ে আমি হয়তো মনে মনেই বলি। কারন আমাকে তো পুরা বাক্য উচ্চারণ করতে হবে। সেই কথা টা বলার জন্য। আমি তো পুরা বাক্য উচ্চারণ করি নাই মুখে। এভাবে নিজেকে বুঝ দেই। কিন্তু আমি এখনো নিশ্চিত না আমি মনে মনে বললাম নাকি মুখে মুখে বললাম। একবার মনে হয় মুখে উচ্চারণ করেছি। আবার মনে হয় করিনি। আমার ঈমান কি ঠিক আছে?
১০) এখন আজকে একটা ভিডিও দেখতেছিলাম। সেখানেও বিশ্বাস নিয়ে একটা কথা ছিল। এটা শুনেই আমার সেদিন আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস নিয়ে কি বলেছিলাম সেটা মনে হয়ে যায়। আর সেটা মনে মনে নাকি মুখেই বললাম এটাও মনে হয়ে যায়। এটা নিয়ে টেনশন এ পড়ে যাই। বুকের ভিতর অনেক খারাপ লাগে।
এটা নিয়ে ভাবতে থাকি। ভাবতে ভাবতে মুখ হা করে এক দুই বার চেক করে দেখি। মানে মুখ হা করে বড় বড় শাস নেই। আর মনে মনে সেই কথা টা আবার বলি নিশ্বাস এর সাথে। দেখতে কোনো সাউন্ড হয় কিনা। কিন্তু আমি নিশ্বাস এর সাউন্ড ছাড়া কোন সাউন্ড শুনতে পাই নাই। এভাবে চেক করার কারনে কি কোনো সমস্যা হবে?
১১) যতবারই ভাবি আর চেক করবো না। ততবারই কোনো না কোন ভাবে চেক করি। যেমন - মুখ হা করে জোরে জোরে শাস নেই। তখন ফিস ফিস করে কথা বল লে যেমন সাউন্ড হয়, এমন একটা সাউন্ড হয় নিশ্বাস এর । এই সাউন্ড এর সাথে সাথে আমি সেই বাজে কথা টা মনে মনে বলি। দেখতে। কোনো উচ্চারণ হয় কিনা।
এখন আমার ঈমান কি ঠিক আছে?
১২) হুজুর ধরেন কোনো ওসওয়াসা নাই, কিছু নাই, একদম সুস্থ। কেউ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস নিয়ে সেই বাজে কথা টা অবচেতন মনে মুখে উচ্চারণ করে বলে ফেললো, মানে সে তার সজ্ঞান এর মধ্য নাই। আর এখন পযন্ত জানেও না তার মুখ দিয়ে এমন কথা বের হয়ে গিয়েছিল কিনা। যদি এমন ভাবে কোনো বাজে কথা মুখ দিয়ে বলে ফেলে আর সে এখন অবদি না জানে তাহলে তার ঈমানে কি কোনো সমস্যা হবে?
১৩) আমার ঈমান আর বিবাহিত জীবন কি ঠিক আছে?
১৪) আপনাদের উত্তর এর উপর আমল করতে পারবো?
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
নাসীহতপূর্ণ প্রশ্নের জন্য জাযাকাল্লাহু খাইরান। আপনার প্রশ্নগুলো মূলত ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা) ও الوسواس الخناس-এর প্রভাবে সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমেই একটি মূলনীতি বুঝে নিন, যা ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ এবং মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) «মা'আরিফুল কুরআন»-এ স্পষ্ট করেছেন:
মনে আসা খারাপ চিন্তা বা ওয়াসওয়াসা যতক্ষণ মুখে উচ্চারণ বা অন্তরে বিশ্বাস-সমর্থন (اعتقاد) না হয়, ততক্ষণ তা ঈমানের কোনো ক্ষতি করে না। (রাদ্দুল মুহতার: ১/৩৪৭; মা'আরিফুল কুরআন, সূরা নাসের তাফসীর)
হাদীসে এসেছে, সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) আরয করলেন: "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা অন্তরে এমন কথা অনুভব করি, যা বলতে আমরা খুবই অপছন্দ করি।" নবী (সা.) বললেন: «ذَاكَ صَرِيحُ الْإِيمَانِ» — "এটাই খাঁটি ঈমানের আলামত।" (সহীহ মুসলিম: ১৩২; মুসনাদে আহমাদ: ২/১৭৭) অর্থাৎ শয়তানের কুমন্ত্রণা আসা এবং তা অপছন্দ করা ঈমানের প্রমাণ, ঈমানের ক্ষতি নয়।
এখন আপনার প্রশ্নগুলোর ধারাবাহিক উত্তর:
১) হাদীস পড়ে বিরক্তি আসা ও পরে অনুতপ্ত হওয়া: হাদীস পড়ে হঠাৎ মনে বিরক্তি বা অস্বস্তি আসা — এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা। কিন্তু আপনি পরে অনুতপ্ত হয়েছেন, আল্লাহকে ভয় করেছেন — এটাই ঈমানের আলামত। অনুতপ্ত হওয়া ঈমানের ক্ষতি নয়; বরং তাওবার দরজা খোলা।
২) পোস্ট পড়ে মনে বিরক্তি: শুধু মনে বিরক্তি আসা বা অস্বস্তি বোধ করা — এতে ঈমানের কোনো সমস্যা হয় না। কারণ এটি ইচ্ছাকৃত অস্বীকার (إنكار) নয়, বরং ওয়াসওয়াসা। ইমাম তাহাবী (রহ.) «আল-আকীদা আত-তাহাবিয়্যাহ»-তে বলেন, অন্তরে খারাপ খেয়াল আসা ঈমান বাতিল করে না, যতক্ষণ তা মুখে বা কর্মে রূপ না নেয়।
৩) নবী (সা.)-কে নিয়ে মনে বাজে কথা আসা এবং "এমন না, এমন না" বলে প্রতিরোধ করা: এটি ক্লাসিক ওয়াসওয়াসা। আপনি যেহেতু মনে মনে তা প্রত্যাখ্যান করছেন ("এমন না, এমন না"), এটি ঈমানের ক্ষতি করে না; বরং এটাই ঈমানের প্রমাণ। আল্লাহ তাআলা বলেন: «وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ» — "আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি এবং তার অন্তর যা কুমন্ত্রণা দেয় তা আমি জানি।" (সূরা কাফ: ১৬) আল্লাহ আপনার প্রতিরোধ জানেন, ভয় পাবেন না।
৪) মুখে "আমি জাস্ট বিরক্ত হয়েছি, অন্য কিছু বলি নাই" বলা: এতে ঈমানের কোনো সমস্যা নেই। এটি আপনার নির্দোষতা প্রকাশ। হাদীসের শিক্ষার প্রতি বিরক্তি নয়, বরং ওয়াসওয়াসার বিরক্তি — এটাই বাস্তবতা।
৫) মুখে নির্দোষতা বলে মনে মনে আসল কারণ বলা: এতেও ঈমানের সমস্যা নেই, কারণ আপনি নবী (সা.)-কে বা হাদীসকে অস্বীকার করছেন না; বরং নিজের ওয়াসওয়াসার অবস্থা বর্ণনা করছেন।
৬) আধা মুখে, আধা মনে — কোনটি ধরা হবে: শরীয়তের মূলনীতি হলো — মুখে উচ্চারিত স্পষ্ট শব্দই ধরা হয়; অন্তরের খেয়াল ধরা হয় না। ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন, কুফরির শব্দ মুখে উচ্চারিত হলে হুকুম হয়, শুধু মনে মনে হলে নয় — তবে ইচ্ছাকৃত বিশ্বাস করলে ভিন্ন কথা। (রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২৩) আপনার ক্ষেত্রে যেহেতু আপনি নিজের নির্দোষতা উচ্চারণ করছেন, কোনো সমস্যা নেই।
৭) শুধু "আমি জাস্ট বিরক্ত হয়েছি" উচ্চারণ করা: এতে ঈমানের কোনো সমস্যা হয়নি। কারণ বিরক্তি কিসের উপর — তা আপনি অস্বীকার করেননি; বরং ওয়াসওয়াসার বিরক্তি। আর "বিরক্ত" শব্দটি কুফরি শব্দ নয়।
৮) হাদীস পড়ে বিরক্ত হওয়া বড় অপরাধ মনে হওয়া: এটি শয়তানের ধোঁকা। আপনি অনুতপ্ত — এটাই যথেষ্ট। আল্লাহ তাআলা বলেন: «إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ» — "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন।" (সূরা বাকারা: ২২২) তাওবা করুন, শয়তানকে নিরাশ করুন। আপনার ঈমান ইন শা আল্লাহ ঠিক আছে।
৯) রাতে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস নিয়ে বাজে কথা — মনে না মুখে, সন্দেহ: শরীয়তের মূলনীতি: সন্দেহের ভিত্তিতে ঈমান বাতিল হয় না। (আল-আশবাহ ওয়ান নাযাইর; রাদ্দুল মুহতার: ১/২৮৭) যতক্ষণ নিশ্চিত না হন যে মুখে উচ্চারণ করেছেন, ততক্ষণ ঈমান ঠিক আছে ধরে নিন। আর যদি ভুলেও মুখে বলে থাকেন, সাথে সাথে তাওবা করুন — আল্লাহ গফুরুর রাহীম।
১০ ও ১১) মুখ খুলে শ্বাস নিয়ে চেক করা, ফিসফিস করে বলা: এটি ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা নয়, বরং ওয়াসওয়াসাকে প্রশ্রয় দেওয়া। এতে ঈমানের কোনো ক্ষতি হয় না, কারণ আপনি বিশ্বাস করেননি; শুধু পরীক্ষা করছেন। কিন্তু এই চেক করা বন্ধ করুন — এটি শয়তানের ফাঁদ। নবী (সা.) বলেছেন: «لَا يَزَالُ النَّاسُ يَسْأَلُونَ حَتَّى يُقَالَ هَذَا خَلَقَ اللَّهُ الْخَلْقَ فَمَنْ خَلَقَ اللَّهَ» — "লোকেরা প্রশ্ন করতে থাকবে, এমনকি বলবে: আল্লাহ সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, তাহলে আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে?" (সহীহ বুখারী: ৭২৯৬) তখন বলতে হবে: «آمَنْتُ بِاللَّهِ» — "আমি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি।" (সহীহ মুসলিম: ১৩৪) অর্থাৎ ওয়াসওয়াসা এলে চেক নয়, বরং ঈমানের ঘোষণা দিন এবং তা উপেক্ষা করুন।
১২) অবচেতন মনে মুখে বাজে কথা বলে ফেলা এবং না জানা: যদি সত্যিই অচেতন/নিদ্রিত/বেহুঁশ অবস্থায় হয়, তবে শরীয়তে তা ধরা হয় না — কারণ তখন ইচ্ছা ও জ্ঞান থাকে না। হাদীসে এসেছে: «رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثٍ...» — "তিন শ্রেণি থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে: নিদ্রিত, শিশু ও পাগল।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৪০৩) আর যদি জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও ভুলে বলে ফেলেন, সাথে সাথে তাওবা করুন — আল্লাহ ক্ষমাশীল।
১৩) আপনার ঈমান ও বিবাহিত জীবন: ইন শা আল্লাহ আপনার ঈমান ঠিক আছে, কারণ আপনি ওয়াসওয়াসাকে ঘৃণা করেন ও অনুতপ্ত হন। আর বিবাহিত জীবনও ঠিক আছে — স্বামীর সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখুন, তাকে এ ব্যাপারে অযথা জিজ্ঞাসাবাদ করবেন না। স্ত্রীর প্রতি সদাচরণ ঈমানের অংশ। নবী (সা.) বলেছেন: «خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ» — "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই, যে তার পরিবারের প্রতি সর্বোত্তম।" (সুনানে তিরমিযী: ৩৮৯৫)
১৪) উত্তরের উপর আমল: হ্যাঁ, ইন শা আল্লাহ আমল করতে পারবেন। সংক্ষেপে আমল:
- ওয়াসওয়াসা এলে চেক করা বন্ধ করুন, "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম" পড়ুন।
- "আমি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি" বলে চিন্তা সরিয়ে দিন।
- নবী (সা.)-এর প্রতি দরুদ পড়ুন, কুরআন তিলাওয়াত বাড়ান।
- অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করুন, অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করবেন না।
- প্রয়োজনে অভিজ্ঞ মুফতি/আলেমের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
আল্লাহ তাআলা আপনার ঈমান হেফাজত করুন এবং ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তি দিন। আমীন।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।