“স্বামী হিন্দু মেয়ের সাথে পরকীয়া করলে ইসলাম কী বলে? হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করা কি জায়েয? স্বামীর ঈমান কি ঠিক আছে?

Family Life · Hanafi

Question No: 7238
Questioner: Khadija
Question Asked: 22 Oct 2026, 06:49 AM
Reviewed & Published: 22 Oct 2026, 08:45 AM
Views: 29
Tokens: 6,113
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার স্বামী একটা হিন্দু মেয়ের সাথে পরকীয়া করে। আমি যাতে জানতে না পারি, সেজন্য ওর নাম সেভ করেছে “M Jannat” দিয়ে। আমি বলেছিলাম, হিন্দু মেয়েদের নাম মুসলিম নামে সেভ করা যায় না, এতে ঈমানে সমস্যা হয়। আমার স্বামী বলে, ও আমার স্ত্রী, দ্বিতীয় বিয়ে করেছি। কিন্তু মেয়েটার আগের হিন্দু স্বামীর প্রোফাইলে এখনো মেয়েটার সাথে প্রোফাইল পিকচার আছে। আমার মনে হয়, এখনো তাদের ডিভোর্স হয়নি।

আমি কী আমল করব, যাতে আমার স্বামীকে এই পরকীয়া থেকে ফিরিয়ে আনতে পারি? আর আমার স্বামীর কি ঈমান ঠিক আছে? সে আরও বলে, সে দুজনকে নিয়ে থাকতে চায়। কিন্তু আমি বলেছি, তুমি ওকে নিয়ে থাকো, আমি আমার মতো একা থাকি, কিন্তু ডিভোর্স দিও না। সে আমাকে জোর করে রেখে দিয়েছে। আমি বুঝতে পারছি না, কী করব।

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুতর। আপনার কষ্ট ও দ্বিধা আমি বুঝতে পারছি। নিচে কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দিচ্ছি।


১. প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহী বিষয়: হিন্দু মেয়ের সাথে বিয়ের দাবি

আপনার স্বামী বলছে সে হিন্দু মেয়েটিকে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। কিন্তু ইসলামী শরীয়তে মুসলিম পুরুষের জন্য কিতাবী (ইহুদী-খ্রিস্টান) ছাড়া অন্য অমুসলিম নারী—অর্থাৎ হিন্দু, বৌদ্ধ, অগ্নিপূজারী ইত্যাদি—কে বিয়ে করা জায়েয নয়। এ বিষয়ে কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

«وَلَا تَنكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّىٰ يُؤْمِنَّ» “তোমরা মুশরিক নারীদের সাথে বিয়ে করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে।” (সূরা বাকারা: ২২১)

ইমাম আবু হানীফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর সর্বসম্মত মত হলো, মুসলিম পুরুষ কিতাবী নারীকে বিয়ে করতে পারবে, কিন্তু মুশরিক (হিন্দু, বৌদ্ধ, নাস্তিক ইত্যাদি) নারীকে পারবে না। (আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ; রাদ্দুল মুহতার, ৩/১৪০; ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/২৮৪)

সুতরাং আপনার স্বামী যদি সত্যিই হিন্দু মেয়ের সাথে বিয়ে করে থাকে, তবে সেই বিয়ে ইসলামী শরীয়তে বাতিল ও অবৈধ। এটি বিয়ে নয়, বরং যিনা-সমপর্যায়ের হারাম সম্পর্ক। আর যদি মেয়েটি ইসলাম গ্রহণ না করে থাকে, তাহলে তার সাথে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া আপনার স্বামীর জন্য কবীরা গুনাহ।

তবে হ্যাঁ, যদি মেয়েটি সত্যিকারভাবে ইসলাম গ্রহণ করে এবং শরীয়তের শর্তানুযায়ী বিয়ে হয়, তাহলে বিয়ে বৈধ হতে পারে। কিন্তু আপনার বর্ণনা অনুযায়ী মেয়েটির আগের হিন্দু স্বামীর সাথে এখনো প্রোফাইল পিকচার থাকা এবং ডিভোর্স না হওয়ার সম্ভাবনা—এসব থেকে বোঝা যায়, বিষয়টি শরীয়তসম্মত বিয়ের মতো নয়।


২. আপনার স্বামীর ঈমান সম্পর্কে

আপনার স্বামী বলছে “সে দুজনকে নিয়ে থাকতে চায়” এবং হিন্দু মেয়ের নাম মুসলিম নামে সেভ করছে। এ বিষয়ে কয়েকটি দিক লক্ষণীয়:

ক) ঈমানের মূল ভিত্তি: কোনো মুসলিম যদি হিন্দু-মুশরিক মেয়ের সাথে অবৈধ সম্পর্ককে হালাল মনে করে, তবে তা কুফরী। কিন্তু যদি সে জেনে-বুঝে গুনাহ করছে এবং হারামকে হারাম জেনেও করছে, তবে সে ফাসিক (গুনাহগার), কাফির নয়। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হুদুদ; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩২৭)

খ) নাম পরিবর্তন করে লুকানো: হিন্দু মেয়ের নাম মুসলিম নামে সেভ করা নিজে ঈমান নষ্টের কারণ নয়, বরং এটি মিথ্যা ও ধোঁকা। তবে আপনি ঠিক বলেছেন—এটি ঈমানের জন্য বিপদের লক্ষণ, কারণ এতে হারাম সম্পর্ককে স্বাভাবিক ও বৈধ মনে করার প্রবণতা তৈরি হয়।

গ) “দুজনকে নিয়ে থাকতে চায়”: ইসলামে একসাথে দুই স্ত্রী রাখা বৈধ, কিন্তু শর্ত হলো উভয়ের সাথে বৈধ বিয়ে হওয়া এবং সমান অধিকার দেওয়া। হিন্দু মেয়ের সাথে অবৈধ সম্পর্ক রেখে দুইজনকে নিয়ে থাকার ইচ্ছা ইসলামসম্মত নয়। এটি দ্বীনদারীর পরিপন্থী।

সুতরাং সরাসরি বলা যাবে না যে তার ঈমান নষ্ট হয়ে গেছে—এটি আল্লাহই ভালো জানেন। কিন্তু তার কর্মকাণ্ড ঈমানের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং তাকে দ্রুত তাওবা করতে হবে।


৩. আপনি কী আমল করবেন?

ক) দোয়া ও ইস্তিগফার

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:

«وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ» “তোমাদের প্রতিপালক বলেছেন: আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।” (সূরা গাফির: ৬০)

আপনি নিয়মিত আপনার স্বামীর হেদায়েতের জন্য দোয়া করুন। বিশেষ করে তাহাজ্জুদের সময়, ফজরের পর এবং প্রতিটি নামাজের পর। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ» “দোয়াই ইবাদত।” (তিরমিজী: ৩৩৭২)

খ) সবর ও ধৈর্য

আল্লাহ বলেন:

«وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ» “তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” (সূরা আনফাল: ৪৬)

আপনি রাগের বশে এমন কিছু বলবেন না যা পরিস্থিতি আরও খারাপ করে দেয়। আপনার স্বামীকে হিকমতের সাথে বোঝানোর চেষ্টা করুন।

গ) দ্বীনি জ্ঞান ও আলেমের পরামর্শ

স্থানীয় বিশ্বস্ত আলেম বা মুফতির সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন। প্রয়োজনে পারিবারিক মধ্যস্থতাকারী (উভয় পক্ষের সম্মানিত ব্যক্তি) নিয়োগ করুন।

ঘ) নিজের হক আদায় ও সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব

আপনার নিজের ও সন্তানদের (যদি থাকে) অধিকার আদায়ে সচেষ্ট থাকুন। ইসলামে স্ত্রীর ভরণপোষণ, বাসস্থান ও সম্মান পাওয়ার অধিকার রয়েছে। (রাদ্দুল মুহতার, ৩/৫৭৩)

ঙ) স্বামীর জন্য দোয়া

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«مَنْ لَا يَشْكُرُ النَّاسَ لَا يَشْكُرُ اللَّهَ» “যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।” (আবু দাউদ: ৪৮১১)

আপনি আপনার স্বামীর হেদায়েতের জন্য দোয়া করুন, তবে তার গুনাহকে কখনো সমর্থন করবেন না।


৪. ডিভোর্স সম্পর্কে আপনার সিদ্ধান্ত

আপনি বলেছেন, “তুমি ওকে নিয়ে থাকো, আমি একা থাকি, কিন্তু ডিভোর্স দিও না।” এ বিষয়ে ফিকহী দৃষ্টিকোণ:

  • স্ত্রী নিজে ডিভোর্স দিতে পারে না (হানাফী মতে), তবে খুলা (স্বামীর সম্মতিতে বিনিময়ের মাধ্যমে বিচ্ছেদ) বা আদালতের মাধ্যমে ফাসখ চাওয়ার অধিকার রয়েছে, যদি স্বামী শরীয়তবিরোধী কাজে লিপ্ত থাকে বা স্ত্রীর অধিকার নষ্ট করে।
  • আপনার স্বামী যদি হিন্দু মেয়ের সাথে অবৈধ সম্পর্ক রাখে, তবে এটি আপনার জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক ও দ্বীনি দিক থেকে ক্ষতিকর। তবে আপনি ডিভোর্স না চাইলে জোর করা যাবে না—এটি আপনার সিদ্ধান্ত।
  • তবে মনে রাখবেন, শরীয়তের দৃষ্টিতে আপনার স্বামীর সেই সম্পর্ক বৈধ নয়। আপনি চাইলে স্থানীয় ইসলামী আদালত বা মুফতির মাধ্যমে পরামর্শ নিয়ে ফাসখ-এর আবেদন করতে পারেন।

৫. আপনার স্বামীকে ফিরিয়ে আনার জন্য কিছু বাস্তব পরামর্শ

  1. শান্তভাবে কথা বলুন: রাগ না করে বোঝান যে, হিন্দু মেয়ের সাথে সম্পর্ক ইসলামে হারাম এবং এটি তার ঈমান ও আখিরাতের জন্য বিপদ।
  2. আলেমের সাহায্য নিন: কোনো বিশ্বস্ত আলেমকে দিয়ে তাকে বোঝানোর ব্যবস্থা করুন।
  3. তার পরিবারের সম্মানিত সদস্যদের সম্পৃক্ত করুন: পিতা-মাতা বা বড় ভাই-বোনের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করুন।
  4. নিজের দ্বীনি আমল বাড়ান: নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ ও দোয়া বাড়িয়ে দিন। আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
  5. সন্তানদের (যদি থাকে) দ্বীনি تربیت-এ মনোযোগ দিন।
  6. অতিরিক্ত অভিযোগ বা তর্ক এড়িয়ে চলুন: এতে সম্পর্ক আরও খারাপ হতে পারে।

৬. একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

আপনার স্বামী যদি বলে “সে দুজনকে নিয়ে থাকতে চায়” এবং হিন্দু মেয়ের সাথে সম্পর্ক চালিয়ে যায়, তবে এটি আপনার উপর জুলুম। ইসলামে স্ত্রীর উপর জুলুম করা হারাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ» “ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতিগ্রস্তও করা যাবে না।” (ইবনে মাজাহ: ২৩৪১)

আপনি চাইলে স্থানীয় ইসলামী স্কলার বা পারিবারিক সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে আদালতের আশ্রয় নিন।


সারসংক্ষেপ

  • হিন্দু মেয়ের সাথে আপনার স্বামীর বিয়ের দাবি শরীয়তসম্মত নয়, যদি মেয়েটি মুসলিম না হয়।
  • তার ঈমান সম্পর্কে সরাসরি ফতোয়া দেওয়া যায় না, তবে তার কাজ ঈমানের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ; তাকে তাওবা করতে হবে।
  • আপনি দোয়া, সবর, আলেমের পরামর্শ ও পারিবারিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করুন।
  • ডিভোর্স না দেওয়ার সিদ্ধান্ত আপনার, তবে শরীয়তবিরোধী সম্পর্কের ক্ষেত্রে আপনি ফাসখ-এর অধিকার রাখেন।
  • আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন; তিনি সর্বশক্তিমান ও ন্যায়বিচারক।

আল্লাহ তাআলা আপনার স্বামীকে হেদায়েত দান করুন, আপনার সংসারকে শান্তি ও বারাকায় ভরে দিন এবং আপনাকে সবর ও ইমানের সাথে ধৈর্য ধারণ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।


বিঃদ্রঃ এটি একটি সাধারণ ফিকহী পরামর্শ। আপনার ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিস্তারিত জানার জন্য স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতি বা ইসলামী আদালতের সাথে সরাসরি পরামর্শ করার অনুরোধ রইল। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.