পারিবারিক জীবনে দেবরের (হাজবেন্ডের ছোট ভাই) সাথে এক রুমে থাকা ও হাত ধরার শরীয়ত বিধান, শাশুড়ির কথায় ধৈর্য, আত্মহত্যার চিন্তা থেকে মুক্তির ইসলামি সমাধান জানতে চাই?
Family Life · Hanafi
Question
আমিন ২৪১২ ব্যাচের একজন শিক্ষার্থি। ইদানিং মানে কয়েক মাস থেকে আমার কিছু সমস্যা হচ্ছে। আমি আমার হাজবেন্ড আর তার ছোট ভাই এক রুমেই থাকি। তার ছোট ভাই এর বয়স 14 চলে। সে কানে শোনেনা এবং কথা বলতে পারেনা। বাকি সব কিছুই সাধারণ মানুষ এর মত (বিবেক,বুদ্ধি, জ্ঞান, চিন্তা ভাবনা)। এক রুম এ থাকতে আমার অনেক প্রবলেম হচ্ছে। 2/3 মাস পর এই জায়গা ছেড়ে আমরা অন্য জায়গায় যাব এজন্য এই বাসা ছাড়া হচ্ছেনা।কিন্তু আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে তাও মানিয়ে নিচ্ছি।
যআবার আমরা 3 জন কোন কাজে বাইরে গেলে তার ভাইয়ের হাত ধরে রাখতে হয় যেহেতু কানে শোনে না। সমস্যা হলো আমি এটা মেনে নিতে পারিনা। আমার কাছে মনে হয় আমি আমার হাজবেন্ড এর সাথে এক রুমেও থাকতে পারছিনা আবার বাইরে গেলেও আমার মনে হয় আমি আলাদা একজন। তাদের পিছন পিছন হাটতে হয়।আবার তার ছোট ভাইটা একটু চালাক টাইপের। সে এমন বিহেভ করে যে আমার কাছে মনে হয় " দেখ তোর হাজবেন্ড আমার হাত ধরে আছে, আমাকে রাস্তা পার করে দিচ্ছে আর তুই পিছন পিছন একাই রাস্তা পার হচ্ছিস এবং হাটছিস"। ওর আচরন আমার কাছে এমনই মনে হয়। আর গ্রামের বাড়িতে আমার শাশুড়ী অনেকের কাছে আমার নাম এ অনেক কিছু বলে বেড়ায় + আমার শশুর এখন আমাদের 3 জনের খরচ বহন করেন,আমাদের যা খরচ দেন তার থেকে 5 হাজার বাড়িয়ে সবাইকে বলে বেড়ান। আবার আমার হাজবেন্ড এখনো পড়ছে,চাকরি শুরু করেনি, তাই ইনডিরেক্টলি অনেকেই অনেক কথা শুনান।এই সব কিছু আমি এখন আর নিতেই পারছিনা। মরে যাওয়ার কথা মনে আসে বার বার। মনে হয় মরে গেলে হয়তো সব ঠিক হবে। আমি কত ধৌর্য ধরবো আমি জানিনা।এ অবস্থায় আমি করতে পারি উস্তাদ? আমার এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা তার ছোট ভাই কে নিয়ে।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার কষ্টের কথা পড়ে খুবই দুঃখ হলো। আপনি যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তা সত্যিই কঠিন। তবে প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে নিই—আত্মহত্যার চিন্তা সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।" (সূরা নিসা: ২৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি নিজেকে হত্যা করবে, সে কিয়ামতের দিন নিজের হাতে নিজেকে হত্যা করতে থাকবে।" (সহীহ বুখারী: ৫৭৭৮)
আপনার মনে যে চাপ ও কষ্ট, তা শয়তানের ওয়াসওয়াসা। দয়া করে এই চিন্তা থেকে সরে আসুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
আপনার প্রশ্নের ফিকহি উত্তর
১. দেবর (হাজবেন্ডের ছোট ভাই) এর সাথে এক রুমে থাকা
শরীয়তের বিধান: প্রাপ্তবয়স্ক বা বালেগ হওয়ার নিকটবর্তী (মুরাহিক) দেবরের সাথে একান্তে (খালওয়াত) থাকা বা একই রুমে পর্দা ছাড়া থাকা সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমরা নারীদের কাছে প্রবেশ করা থেকে বেঁচে থাকো।" এক ব্যক্তি বলল: "হে আল্লাহর রাসূল! দেবর সম্পর্কে কী বলেন?" তিনি বললেন: "দেবর তো মৃত্যু।" (সহীহ বুখারী: ৫২৩২, সহীহ মুসলিম: ২১৭২)
ইমাম নববী রহ. এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন: "দেবর সম্পর্কে সতর্কতা অন্যান্য গায়র মাহরামের চেয়ে বেশি, কারণ সে সাধারণত ঘরে প্রবেশ করতে পারে এবং তার সম্পর্কে মানুষ তেমন সন্দেহ করে না।" (শরহে মুসলিম)
আপনার করণীয়: ১৪ বছরের দেবর ইতিমধ্যে বালেগ হওয়ার নিকটবর্তী (মুরাহিক)। তার সাথে এক রুমে পর্দা ছাড়া থাকা আপনার জন্য জায়েজ নেই। আপনার স্বামীকে বুঝিয়ে বলুন—এটি আপনার ব্যক্তিগত অস্বস্তির বিষয় নয়, বরং শরীয়তের হুকুম। যদি ২-৩ মাস পর সরার কথা হয়, তবে এই সময়ের জন্য ঘরে পর্দার ব্যবস্থা করুন (যেমন: পর্দা টাঙানো, আলাদা বিছানা, ঘরে থাকার সময় পূর্ণ পোশাক ইত্যাদি)। সম্ভব হলে এই সময়ের মধ্যে অন্য ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করুন।
২. বাইরে যাওয়ার সময় দেবরের হাত ধরা
শরীয়তের বিধান: বালেগ/মুরাহিক দেবরের সাথে সরাসরি শরীর স্পর্শ করা (হাত ধরা) নাজায়েজ। তবে আপনার প্রশ্নে বিষয়টি হলো—আপনার স্বামী তার হাত ধরে রাখেন, আপনি নন। স্বামী তার প্রতিবন্ধী ভাইয়ের হাত ধরে রাস্তা পার করানো—এটি স্বামীর জন্য জায়েজ ও দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত (প্রতিবন্ধী ভাইয়ের খেদমত)। এতে আপনার কোনো গুনাহ নেই।
আপনার মানসিক কষ্টের বিষয়টি: আপনার মনে হচ্ছে দেবর "দেখাচ্ছে" যে স্বামী তার হাত ধরে আছে আর আপনি পিছনে একা। বোন, এটি সম্ভবত আপনার মনে হওয়া (ওয়াসওয়াসা)—কারণ একজন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী/বধির-মূক ব্যক্তির এমন "দেখানোর" সচেতন উদ্দেশ্য থাকার সম্ভাবনা কম। শয়তান আপনার মনে সন্দেহ ও কষ্ট ঢুকাচ্ছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চায়।" (সূরা মায়িদা: ৯১)
সমাধান: বাইরে গেলে আপনি আপনার স্বামীর পাশে থাকুন বা তার অন্য হাত ধরুন। অথবা দেবরের অন্য পাশে আপনি থাকুন। এতে আপনার একাকীত্বের অনুভূতি কমবে।
৩. শাশুড়ির কথা বলা ও শ্বশুরের খরচের বিষয়
এটি ফিকহি বিষয় নয়, বরং সামাজিক ও মানসিক বিষয়। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে:
- কাউকে অপমান বা হেয় করার উদ্দেশ্যে কথা বলা গীবত ও হারাম। তবে শাশুড়ি যদি আপনার সম্পর্কে মিথ্যা বা বাড়িয়ে বলে, তা বুহতান (মিথ্যা অপবাদ)—যা কবিরা গুনাহ।
- শ্বশুর আপনার স্বামীর পিতা—তিনি ছেলের খরচ বহন করছেন, এটি তাঁর দয়া ও দায়িত্ব। তবে তিনি বাড়িয়ে বলে লোক দেখানো করলে তা তাঁর নিজের আমলের বিষয়; আপনি ধৈর্য ধরুন।
- আপনার স্বামী পড়াশোনা করছেন, চাকরি করেননি—এটি সাময়িক। ইনশাআল্লাহ ভালো হবে।
কুরআনের নির্দেশনা: আল্লাহ তাআলা বলেন:
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা বাকারা: ১৫৩)
৪. আপনি কী করতে পারেন—ব্যবহারিক ও শরীয়তসম্মত পরামর্শ
- আত্মহত্যার চিন্তা সম্পূর্ণ বর্জন করুন। এটি শয়তানের প্ররোচনা। আপনার জীবন আল্লাহর আমানত।
- স্বামীর সাথে খোলামেলা কথা বলুন। তাকে বলুন—দেবরের সাথে এক রুমে থাকা শরীয়তসম্মত নয় এবং আপনার মানসিক কষ্ট হচ্ছে। এটি আপনার "অভিমান" নয়, বরং দ্বীনি দায়িত্ব।
- পর্দার ব্যবস্থা করুন যতদিন একই ঘরে থাকতে হয়—পর্দা, আলাদা বিছানা, পূর্ণ পোশাক।
- বাইরে যাওয়ার সময় স্বামীর পাশে থাকুন, দেবরের সাথে একা হাঁটবেন না।
- শাশুড়ির কথায় কান দেবেন না—এটি আপনার ঈমান ও মানসিক শান্তির জন্য ক্ষতিকর। তার কথা আল্লাহর কাছে হিসাব হবে, আপনার নয়।
- নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া বাড়িয়ে দিন। বিশেষ করে সকাল-সন্ধ্যার জিকির ও "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" বেশি পড়ুন।
- প্রয়োজনে একজন বিশ্বস্ত আলেমা/মহিলা কাউন্সেলরের সাথে কথা বলুন অথবা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
- ২-৩ মাস পর সরার পরিকল্পনা দৃঢ়ভাবে ধরে রাখুন এবং স্বামীকে এই ব্যাপারে দায়বদ্ধ করুন।
উপসংহার
বোন, আপনি যে কষ্টে আছেন তা আল্লাহ জানেন। কিন্তু সমাধান আত্মহত্যা নয়—বরং ধৈর্য, দোয়া এবং শরীয়তসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ। আপনার স্বামীকে বলুন—দেবরের সাথে এক রুমে থাকা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ নয়, এটি আপনার অধিকার। আর আপনার শাশুড়ির কথায় মন খারাপ করবেন না—আল্লাহ সব দেখছেন।
আল্লাহ তাআলা আপনার কষ্ট দূর করুন এবং আপনার সংসারে শান্তি ও বরকত দান করুন। আমিন। আল্লাহ ভালো জানেন।
তথ্যসূত্র:
- সহীহ বুখারী: ৫২৩২, ৫৭৭৮
- সহীহ মুসলিম: ২১৭২
- সূরা নিসা: ২৯; সূরা বাকারা: ১৫৩; সূরা মায়িদা: ৯১
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন) — খালওয়াত ও পর্দার অধ্যায়
- ফাতাওয়া আলমগিরি — পর্দা ও মাহরাম সম্পর্কিত মাসায়েল
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী রহ.) — পারিবারিক ও পর্দা বিষয়ক
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি) — পারিবারিক সম্পর্ক ও পর্দা
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী রহ.) — পর্দার বিধান
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ.) — সূরা নিসা ও বাকারার তাফসীর