জীবিত অবস্থায় সন্তানদের মাঝে সম্পদ বণ্টনে বৈষম্য করার ইসলামি বিধান ও এর সমাধান
Family Life · Ahle Hadith / Salafi
Question
পরে আমি সমতার হাদিস জানলে বাবাকে বলি, 'আমি তোমাকে জমি ফিরিয়ে দেই, তুমি সমতা করো, তাছাড়া গুনাহগার হবে।' উনি শুনেন নাই, উনি ফিরিয়ে নিবেন না এবং আমাকে ৩ শতক পরে লিখে দিবেন। এখন আমি বুঝানোর পরও উনি অস্বীকার করছেন। যেহেতু উনি ফিরিয়ে নিবেন না, তাই আমিও একসেপ্ট করেছি মনে মনে। এখন প্রশ্ন হলো, এটা কি আমার জন্য হালাল? আর এটা পরে উনারা ফিরিয়ে নিতে চাইলে আমি যদি ফিরিয়ে না দেই, আমি কি গুনাহগার হব?"
Answer
জীবিত অবস্থায় সন্তানদের মধ্যে সম্পদ বণ্টনে বৈষম্য: ইসলামি বিধান ও সমাধান
উত্তর
না, এ বণ্টন হালাল নয়। পিতার জীবিত থাকা অবস্থায় সন্তানদের মধ্যে এরূপ বৈষম্যমূলক দান ইসলামে নিষিদ্ধ (হারাম/গুনাহের কাজ)। তবে আপনার জন্য এ সম্পদ "হারাম" বলা যাবে না—কারণ সম্পদের মালিকানা এখনো পিতার, এবং তিনি যা দিয়েছেন তা তাঁর পক্ষ থেকে একটি দান (হিবা)। কিন্তু পিতাই গুনাহগার হচ্ছেন। আর ভবিষ্যতে ভাই-বোনেরা সমতা দাবি করলে আপনি ফিরিয়ে দিতে বাধ্য নন—কারণ আপনি জুলুম করেননি, জুলুম করেছেন পিতা।
১. মূল দলিল: নু'মান ইবনে বশীর (রাঃ)-এর হাদিস
নু'মান ইবনে বশীর (রাঃ) বলেন, তাঁর পিতা তাঁকে একটি দাস দান করেছিলেন। তিনি নবী ﷺ-এর কাছে গেলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন:
أَكُلَّ وَلَدِكَ أَعْطَيْتَ مِثْلَ هَذَا؟ "তুমি কি তোমার সব সন্তানকে এ রকমই দিয়েছ?" তিনি বললেন: না। তখন নবী ﷺ বললেন: فَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْدِلُوا بَيْنَ أَوْلَادِكُمْ "তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করো।" — সহিহ বুখারি ২৫৮৬, সহিহ মুসলিম ১৬২৩
অন্য বর্ণনায়:
فَارْجِعْهُ — "এটা ফিরিয়ে নাও।" — সহিহ মুসলিম ১৬২৩
শায়খ ইবনে উসাইমিন (রহ.) বলেন, এ হাদিস প্রমাণ করে সন্তানদের মধ্যে দানে সমতা রাখা ওয়াজিব (ফরজ), এবং বৈষম্য করা হারাম। (আশ-শারহুল মুমতি', ১১/২৫৪)
শায়খ ইবনে বায (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল পুত্র-কন্যাদের মধ্যে দানে বৈষম্য সম্পর্কে; তিনি বলেন, এটি জায়েয নয়, বরং ওয়াজিব হলো সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করা—পুত্র-কন্যা উভয়ের ক্ষেত্রে, কারণ হাদিসে "সন্তান" শব্দটি সাধারণ। (মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে বায, ২০/৩০৯)
২. পুত্র-কন্যার মধ্যে সমতা: কতটুকু?
এখানে দুটি মাসআলা:
(ক) পুত্র ও কন্যার মধ্যে সমান দান: জমহুর ফকিহদের মতে জীবিত অবস্থায় দানে পুত্র-কন্যাকে সমান দিতে হবে, কারণ হাদিসে "আওলাদ" (সন্তান) শব্দ সাধারণ। ইবনে কুদামা (রহ.) এ মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। (আল-মুগনি, ৬/৫১)
(খ) তবে উত্তরাধিকারের নিয়ম ভিন্ন: মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারে পুত্র দ্বিগুণ পাবে (সূরা নিসা ১১)। কিন্তু জীবিত অবস্থার দান উত্তরাধিকার নয়—এটি হিবা, যেখানে সমতা ওয়াজিব।
শায়খ আল-আলবানি (রহ.) ও শায়খ ইবনে উসাইমিন (রহ.)-এর মতও এটিই—জীবিত দানে পুত্র-কন্যা সমান। (সিলসিলা সহিহা সংক্রান্ত আলোচনা; ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব)
বিশেষ নোট: আপনার বাবার ক্ষেত্রে তো পুত্র-কন্যার সমতার প্রশ্নই আসে না—তিনি পুত্রকে ৪ কোটি আর দুই কন্যাকে মোট ১ কোটি ৬০ লাখ দিচ্ছেন। এটি স্পষ্ট জুলুম ও হারাম।
৩. শায়খ ইবনে তাইমিয়্যাহ ও ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)-এর মত
ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন, সন্তানদের মধ্যে দানে বৈষম্য করা জুলুম, আর আল্লাহ জুলুম হারাম করেছেন। তিনি বলেন, "সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করা ওয়াজিব; এ বিষয়ে মুসলিমদের ইজমা রয়েছে।" (মাজমুউল ফাতাওয়া, ৩১/২৯৭)
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, নবী ﷺ নু'মানের পিতার দান বাতিল করে দিয়েছিলেন, যা প্রমাণ করে এ ধরনের বৈষম্যমূলক হিবা নাজায়েয ও বাতিলযোগ্য। (ইগাসাতুল লাহফান)
৪. আপনার নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন ১: এ সম্পদ কি আপনার জন্য হালাল?
হ্যাঁ, আপনার জন্য হালাল। কারণ:
- সম্পদের প্রকৃত মালিক পিতা; তিনি যা দিয়েছেন তা তাঁর পক্ষ থেকে হিবা।
- জুলুমের দায় পিতার উপর, আপনার উপর নয়—আপনি দাবি করেননি, বরং বাধা দিয়েছেন ও ফিরিয়ে দিতে চেয়েছেন।
- আপনি ইতিমধ্যে পিতাকে সতর্ক করেছেন—এটি আপনার দায়িত্ব পালন। আল্লাহ বলেন:
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ — "তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করো।" (সূরা তাগাবুন ১৬)
আপনি সামর্থ্য অনুযায়ী নসিহত করেছেন; পিতা না মানলে তার গুনাহ তারই।
প্রশ্ন ২: ভবিষ্যতে তারা ফিরিয়ে নিতে চাইলে না দিলে কি গুনাহগার হব?
না, গুনাহগার হবেন না। কারণ:
- সম্পদ এখন আপনার মালিকানায়—পিতা বৈধভাবে (যদিও গুনাহের সাথে) লিখে দিয়েছেন; মালিকানা স্থানান্তরিত হয়েছে।
- জুলুম আপনি করেননি—বৈষম্য করেছেন পিতা। আপনি ফিরিয়ে দিতে বাধ্য নন।
- তবে ঐক্য ও কল্যাণের স্বার্থে ভাই-বোন মিলে সমতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা উত্তম; সম্ভব হলে পিতার সাথে পুনরায় আলোচনা করুন বা পরিবারের বিজ্ঞ আলিম/মুরুব্বির মধ্যস্থতা নিন।
সতর্কতা: পিতার অবাধ্যতা বা সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েয নয়। সূরা লুকমান ১৪ ও সহিহ বুখারি ৫৯৭১ অনুযায়ী পিতার সাথে সদাচরণ ও নম্র ভাষায় নসিহত চালিয়ে যান।
৫. করণীয় (ব্যবহারিক পরামর্শ)
- পিতাকে আরেকবার নম্রভাবে বোঝান—হাদিসটি দেখান, শায়খদের ফতোয়া উল্লেখ করুন।
- পরিবারের বিজ্ঞ আলিম বা মুরুব্বিকে মধ্যস্থতাকারী করুন।
- সমতা প্রতিষ্ঠা হলে সবাই মিলে নতুন করে বণ্টন করুন—এতে সবাই বরকত পাবে।
- যদি পিতা না মানেন—আপনার উপর দায় নেই; তবে ভাই-বোনের সম্পর্ক রক্ষা করুন এবং ভবিষ্যতে উত্তরাধিকারের সময় শরিয়তের নিয়ম (পুত্র দ্বিগুণ) প্রযোজ্য হবে।
- দুআ করুন পিতার হিদায়াতের জন্য।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |---|---| | পিতার বৈষম্যমূলক বণ্টন | হারাম/গুনাহ—পিতার দায় | | আপনার প্রাপ্ত সম্পদ | আপনার জন্য হালাল | | ফিরিয়ে না দিলে গুনাহ | না—কারণ জুলুম আপনার নয় | | করণীয় | নম্র নসিহত, মধ্যস্থতা, সম্পর্ক রক্ষা |
মূল দলিল: সহিহ বুখারি ২৫৮৬, সহিহ মুসলিম ১৬২৩; সূরা নিসা ১১; সূরা তাগাবুন ১৬।