জীবিত পিতামাতা কর্তৃক সন্তানদের মাঝে অসমান সম্পদ বণ্টন
Family Life · Ahle Hadith / Salafi
Question
আরেকটা প্রশ্ন, আমার বাবা আমার ভাই, আমাকে ও বোনকে জমি ও বাড়ি বণ্টন করবেন জীবিত থাকা অবস্থায়। কিন্তু ভাইকে অনেক বেশি দিচ্ছেন, যেমন ভাইকে টোটাল ৪ কোটির সম্পদ দিবেন আর আমাদের ২ বোনকে ৮০ লাখ করে দিবেন, টোটাল ১ কোটি ৬০ লাখের সম্পদ। আমি সমতা জানার পর এটা বলছি কিন্তু মানে নাই। আমাকে ৫ শতক জোরপূর্বক লিখে দিছে, আমি ফিরিয়ে দিতে চাইছি কিন্তু নিবে না। এটা কি আমার জন্য হালাল? যদি তারা কখনো ফিরিয়ে নিতে চান আমার কি দেওয়া জরুরি? আমি না ফিরিয়ে দিলে কি গুনাহগার হব? আমি একসেপ্ট করেছি উনি জোর করে দেওয়ার পর আর যখন বললেন ফিরিয়ে নিবেন না, আমি একসেপ্ট করেছি মনে মনে।
Answer
জীবিত পিতা-মাতার সম্পদ বণ্টন: ইসলামী দৃষ্টিকোণ
প্রথম প্রশ্ন: মায়ের দেওয়া স্বর্ণের অসম বণ্টন
মূল নীতি: জীবিত অবস্থায় সন্তানদের মধ্যে সমতা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ (সমতা) করো।" — সহীহ বুখারী (২৫৮৬), সহীহ মুসলিম (১৬২৩)
নু'মান ইবন বশীর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তাঁর পিতা তাঁকে একটি দাস দান করলে রাসূল ﷺ জিজ্ঞেস করেন: "তোমার সব সন্তানকে কি এটাই দিয়েছ?" তিনি বললেন: না। তখন রাসূল ﷺ বললেন: "তাহলে এটি ফিরিয়ে নাও।" (সহীহ মুসলিম ১৬২৩)
ইমাম ইবন কুদামা, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ ও ইবনুল কাইয়্যিম (রহিমাহুমুল্লাহ) বলেন — পিতামাতার জীবিতকালে সন্তানদের মধ্যে দানে সমতা রাখা ওয়াজিব (মুস্তাহাব নয়)। অসমতা করা জুলুম। (আল-মুগনী, যাদুল মাআদ)
আপনার করণীয় ও হুকুম
১. যে ৪ ভরি ফিরিয়ে দিতে চাচ্ছেন — এটি উত্তম ও সঠিক কাজ। এটি আপনার মায়ের জুলুম সংশোধনের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ বলেন:
"তোমরা ন্যায়বিচার করো, এটাই তাকওয়ার নিকটতর।" (সূরা মায়িদা: ৮)
২. আপনি কি গুনাহগার হবেন? — না, ইনশাআল্লাহ। কারণ:
- আপনি অজ্ঞতাবশত গ্রহণ করেছেন (জাহালত ওজর হিসেবে গ্রহণযোগ্য)
- এখন আপনি সংশোধনের চেষ্টা করছেন
- তবে যতটুকু সমতার অতিরিক্ত (অর্থাৎ ১১-৭ = ৪ ভরি), তা ফিরিয়ে দেওয়া বা ভাই-বোনের সাথে সমন্বয় করা আপনার দায়িত্ব — যদি মা ফিরিয়ে নিতে রাজি না হন, তবে অন্তত ভাই-বোনকে জানিয়ে সমন্বয় করুন বা তাদের হক আদায়ের ব্যবস্থা করুন।
৩. জাকাত প্রসঙ্গে: যে সম্পদ আপনার নিকট বৈধভাবে আছে, তার যাকাত আদায় করা সঠিক হয়েছে। তবে যদি ৪ ভরি প্রকৃতপক্ষে অন্যের হক হয়, তবে তা ফিরিয়ে দেওয়ার পর হিসাব করে নিলে ভালো।
৪. মা জীবিত আছেন — তাঁর সম্পত্তি তাঁরই। তিনি চাইলে দিতে পারেন, না দিতে পারেন। কিন্তু সন্তানদের মধ্যে অসমতা করা তাঁর জন্য গুনাহ। আপনি তাঁকে নরমভাবে বুঝানোর চেষ্টা করুন।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: বাবার অসম বণ্টন ও জোরপূর্বক লেখানো ৫ শতক জমি
হুকুম
১. বাবার অসম বণ্টন: বাবা জীবিত থাকলে সন্তানদের মধ্যে সমতা করা ওয়াজিব। ভাইকে ৪ কোটি আর দুই বোনকে ৮০ লাখ করে দেওয়া সুস্পষ্ট জুলুম। তবে বাবার সম্পত্তিতে তাঁর পূর্ণ অধিকার আছে — তিনি না মানলে আপনি জোর করতে পারবেন না। আপনি দায়মুক্ত; গুনাহ বাবার উপর।
২. জোরপূর্বক লেখানো ৫ শতক জমি:
- জোরপূর্বক (ইকরাহ) দান ইসলামে বৈধ নয়। রাসূল ﷺ বলেছেন: "আমার উম্মতের উপর ভুল, বিস্মৃতি ও জোরপূর্বক কাজের (ইকরাহ) দায়িত্ব উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে।" (সুনান ইবন মাজাহ ২০৪৩, সহীহ)
- তবে আপনি যদি তা গ্রহণ করেন এবং বাবা ফিরিয়ে নিতে না চান — এটি আপনার জন্য হালাল। কারণ মালিক (বাবা) স্বেচ্ছায় দান করেছেন, জোর শুধু কাগজে লেখানোর ক্ষেত্রে ছিল, কিন্তু তিনি ফিরিয়ে নিতে অস্বীকার করেছেন — অর্থাৎ তিনি প্রকৃতপক্ষে দানেই সন্তুষ্ট।
৩. ভবিষ্যতে তারা ফিরিয়ে নিতে চাইলে:
- হিবা (দান) সম্পূর্ণ হলে ফিরিয়ে নেওয়া জায়েয নয় — বিশেষত পিতা-মাতা সন্তানকে দান করলে। রাসূল ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি দান করে তা ফিরিয়ে নেয়, সে কুকুরের মতো বমি খায়।" (সহীহ বুখারী ২৬২২)
- তবে পিতার ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রম আছে: পিতা সন্তানকে দান করে ফিরিয়ে নিতে পারেন (সুনান আবু দাউদ ৩৫৩৯, তিরমিজি ১২৯৯ — সহীহ)। কিন্তু মা নন।
- তাই বাবা ফিরিয়ে চাইলে আপনি দিতে বাধ্য নন (শরীয়ত অনুযায়ী), তবে দিলে তা সদকা হিসেবে গণ্য হবে। না দিলে গুনাহগার হবেন না, ইনশাআল্লাহ।
৪. আপনি মনে মনে একসেপ্ট করেছেন — এটি বৈধ। জোরপূর্বক লেখানোর সময় আপনি অসন্তুষ্ট ছিলেন, কিন্তু পরে বাবা ফিরিয়ে নিতে অস্বীকার করেছেন — ফলে দান পূর্ণতা পেয়েছে।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | মায়ের অসম দান | মায়ের জন্য গুনাহ; আপনার ৪ ভরি ফেরানো উত্তম | | ৪ ভরি না ফেরালে | জাহালতের কারণে ওজর, তবে সংশোধন করা কর্তব্য | | বাবার অসম বণ্টন | বাবার জুলুম; আপনি দায়মুক্ত | | জোরপূর্বক ৫ শতক | গ্রহণ করা হালাল; বাবা ফিরিয়ে না চাইলে সমস্যা নেই | | ভবিষ্যতে ফেরানো | বাবার ক্ষেত্রে শরীয়ত অনুমতি দেয়, তবে আপনি বাধ্য নন; না দিলে গুনাহ নেই |
পরামর্শ: উভয় ক্ষেত্রেই নরমভাবে পিতা-মাতাকে বুঝান, দুআ করুন, এবং ভাই-বোনের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখুন। আল্লাহ বলেন: "তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করো।" (সূরা নিসা: ১)
والله أعلم