অশান্তি থেকে বেঁচে থাকার জন্য শ্বশুর শাশুড়ি এর সাথে কথা বলা বন্ধ রাখলে কি গোনাহগার হবো?
Family Life · Hanafi
Question
আমার শ্বশুর শাশুড়ি বার বার বিভিন্ন কারণে আমার সাথে খুব ছোট ছোট বিষয় নিয়েও বিয়ের পর থেকেই প্রচুর ঝামেলা করে। আমার যদি ভুল নাও থাকে তবুও বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের কথায় আমাকে শাসন করে, কষ্ট দিয়ে বিভিন্ন ধরনের কথা শোনায়। আবার তারাই এই সব আবার পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন সবাইকে বলে আমাকে খারাপ বানায়। যদিও আমার স্বামী আমাকে আলাদা বাসায় রেখেছেন। তারপরেও একই কাজ ছয় বছর ধরে চলতেই আছে। এই সব নিয়ে আমাদের স্বামী স্ত্রীর মধ্যে প্রচুর ঝগড়া ঝাটি হয়। তাদের এ সকল কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে আমাদের সংসারে অশান্তি লেগেই থাকে। এখন আমি আর এইসব সহ্য করতেও পারিনা আবার তাদের কষ্ট হবে ভেবে কিছু বলতেও পারিনা। সকল ধরনের অশান্তি থেকে বাঁচতে চুপ হয়ে আছি। তাদের সাথে বর্তমান কথাবার্তা বন্ধ রেখেছি। একটু দূরত্ব বজায় রেখে চলার চেষ্টা করছি। যদিও এটা আমার মনের মধ্যে ভালো লাগছে না। এখন প্রশ্ন হলো, এটার কারণে আমি গুনাহগার হচ্ছি কিনা বা এটা ঠিক হচ্ছে কিনা? এখন আমার করণীয় কি?মেহেরবানী করে জানালে খুব উপকৃত হতাম।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে কথা বন্ধ করে দেওয়া বা সম্পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদ করা ইসলামে জায়েয নয়; এটি গুনাহের কারণ হতে পারে। তবে তাদের অত্যাচার, কুৎসা রটানো ও সংসারে অশান্তি সৃষ্টির কারণে আপনি তাদের সাথে সরাসরি ঝগড়া-বিতর্কে না জড়িয়ে, ভদ্রভাবে দূরত্ব বজায় রাখা, প্রয়োজনীয় সালাম-কুশল ও হক আদায় করা এবং ধৈর্য ধারণ করা — এটাই শরীয়তসম্মত পথ। একেবারে কথা বন্ধ করে দেওয়া নয়; বরং কম কথা বলা, সংক্ষিপ্ত ও ভদ্র ব্যবহার করা জায়েয। স্বামীকে দোষারোপ না করে ধৈর্য ও হিকমতের সাথে বিষয়টি বুঝানো এবং তাদের জন্য দুআ করা কর্তব্য।
বিস্তারিত উত্তর
১. শ্বশুর-শাশুড়ির মর্যাদা ও হক
ইসলামে শ্বশুর-শাশুড়ি কেবল আত্মীয় নন; তারা স্ত্রীর জন্য মহরম এবং স্বামীর পিতা-মাতা হিসেবে তাদের বিশেষ মর্যাদা ও হক রয়েছে। কুরআনে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ এসেছে:
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا
“তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।”
(সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
رَغِمَ أَنْفُهُ ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُهُ ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُهُ مَنْ أَدْرَكَ أَبَوَيْهِ عِنْدَ الْكِبَرِ أَحَدَهُمَا أَوْ كِلَيْهِمَا فَلَمْ يَدْخُلِ الْجَنَّةَ
“তার নাক ধুলোয় মলিন হোক, তার নাক ধুলোয় মলিন হোক, তার নাক ধুলোয় মলিন হোক — যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতার একজন বা উভয়কে বার্ধক্যে পেল, কিন্তু তাদের সেবা করে জান্নাতে প্রবেশ করল না।”
(সহীহ মুসলিম, হাদিস ২৫৫১)
শ্বশুর-শাশুড়ি সরাসরি পিতা-মাতা নন, তবে স্বামীর পিতা-মাতা হিসেবে তাদের সম্মান ও সদ্ব্যবহারের নির্দেশ শরীয়তে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত স্ত্রীর উপর শ্বশুর-শাশুড়ির হক হলো: সম্মান করা, অশ্লীল ভাষা না বলা, তাদের সামনে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ না করা, এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সেবা-যত্ন করা।
২. “কথা বন্ধ রাখা” কীভাবে বুঝবেন?
ইসলামে সম্পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদ (হিজরান/কাটাছেঁড়া) নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلَاثِ لَيَالٍ
“কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ নয় যে, সে তার ভাইকে তিন রাতের বেশি পরিত্যাগ করবে।”
(সহীহ বুখারী, হাদিস ৬০৭৭; সহীহ মুসলিম, হাদিস ২৫৬০)
তবে কথা কম বলা, দেখা-সাক্ষাৎ কম করা, ঝগড়া এড়াতে দূরত্ব রাখা — এগুলো সম্পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদ নয়; বরং এটি হিকমত ও ধৈর্যের অন্তর্ভুক্ত, যদি উদ্দেশ্য হয় ফিতনা এড়ানো। কিন্তু এর সাথে সালাম দেওয়া, প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নেওয়া, অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া, ঈদে সালাম-কুশল করা — এগুলো ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতারে বলেন, হিজরান (বয়কট) তখনই বৈধ যখন তা দ্বীনি কারণে হয় এবং তাতে উপকার থাকে; ব্যক্তিগত স্বার্থ বা পারিবারিক কলহের কারণে দীর্ঘদিন কথা বন্ধ রাখা নাজায়েয।
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা)
৩. তাদের অত্যাচার ও কুৎসা রটানোর বিধান
শ্বশুর-শাশুড়ি যদি মিথ্যা বলে, কুৎসা রটায়, অপমান করে, অকারণে শাসন করে — তবে এটি তাদের গুনাহ এবং যুলুম। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ
“আর আপনি কখনো মনে করবেন না যে, যালিমরা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল।”
(সূরা ইবরাহিম: ৪২)
তবে তাদের যুলুমের জবাবে আপনি যুলুম করতে পারবেন না। আল্লাহ বলেন:
وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِّثْلُهَا ۖ فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ
“মন্দের প্রতিফল মন্দই, তবে যে ক্ষমা করে ও সংশোধন করে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে।”
(সূরা শূরা: ৪০)
৪. স্বামীর ভূমিকা ও আপনার করণীয়
আপনার স্বামী আপনাকে আলাদা বাসায় রেখেছেন — এটি ইতিবাচক। কিন্তু শ্বশুর-শাশুড়ির অত্যাচারের বিষয়ে স্বামীকে অভিযোগের সুরে নয়, বরং কষ্টের কথা ভদ্রভাবে জানানো আপনার হক। হাদিসে এসেছে, স্ত্রী স্বামীর কাছে তার অধিকারের কথা বলতে পারে। তবে স্বামীকে বাধ্য করা বা শ্বশুর-শাশুড়ির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে বলা ঠিক নয়; বরং ধৈর্য, দুআ ও হিকমতের সাথে বিষয়টি উপস্থাপন করুন।
আপনার করণীয় সংক্ষেপে:
- সম্পূর্ণ কথা বন্ধ করবেন না — সালাম, প্রয়োজনীয় কুশল, অসুস্থতায় খোঁজ — এগুলো চালু রাখুন।
- ঝগড়া-বিতর্ক এড়িয়ে চলুন — তাদের অপমানের জবাবে চুপ থাকুন বা ভদ্রভাবে সরে আসুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِذَا كَانَ أَحَدُكُمْ صَائِمًا فَلَا يَرْفُثْ وَلَا يَجْهَلْ
“তোমাদের কেউ রোজা রাখলে সে অশ্লীল কথা বলবে না, মূর্খতার কাজ করবে না।”
(সহীহ বুখারী, হাদিস ১৮৯৪) - স্বামীর সাথে সম্পর্ক ভালো রাখুন — শ্বশুর-শাশুড়ির কারণে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া যেন না বাড়ে; এতে সংসার ভাঙার আশঙ্কা থাকে।
- তাদের জন্য দুআ করুন — হিদায়াত ও সংশোধনের দুআ করুন; অভিশাপ বা বদদুআ করবেন না।
- প্রয়োজনে বিশ্বস্ত আলেম/পরিবারের বড়দের মাধ্যমে সমাধান — সরাসরি ঝগড়ার পরিবর্তে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিষয়টি তুলুন।
- ধৈর্য ও সওয়াবের আশা — তাদের যুলুমের বিনিময়ে আল্লাহ আপনার জন্য জান্নাতে প্রতিদান রাখবেন। হাদিসে এসেছে:
مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ وَلَا هَمٍّ وَلَا حُزْنٍ وَلَا أَذًى وَلَا غَمٍّ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ
“মুসলিমকে যে কষ্ট, রোগ, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট বা গ্লানি পৌঁছে — এমনকি একটি কাঁটা ফুটলেও — আল্লাহ তার বিনিময়ে তার গুনাহ ক্ষমা করে দেন।”
(সহীহ বুখারী, হাদিস ৫৬৪১; সহীহ মুসলিম, হাদিস ২৫৭৩)
৫. আপনি কি গুনাহগার হচ্ছেন?
যদি আপনি সম্পূর্ণ কথা বন্ধ করে দেন, সালাম-কুশল ও প্রয়োজনীয় হক ছেড়ে দেন — তবে হ্যাঁ, এতে গুনাহের আশঙ্কা আছে। কিন্তু যদি আপনি ঝগড়া এড়াতে কম কথা বলেন, দূরত্ব রাখেন, কিন্তু সালাম-কুশল ও ভদ্র ব্যবহার বজায় রাখেন — তবে এটি গুনাহ নয়; বরং এটি ধৈর্য ও হিকমতের অন্তর্ভুক্ত। আপনার মনের অস্বস্তি স্বাভাবিক; এটি আপনার নرمতার প্রমাণ। তবে ইসলামে হক আদায় ও সম্পর্কচ্ছেদ না করা — দুটোই জরুরি।
সারকথা: সম্পূর্ণ কথা বন্ধ নয়; বরং ভদ্রভাবে কম কথা, সালাম-কুশল চালু, ঝগড়া এড়ানো, স্বামীর সাথে সম্পর্ক ভালো রাখা, দুআ করা — এটাই আপনার করণীয়। আল্লাহ তাওফিক দিন। আমিন।
সংক্ষিপ্ত ফতোয়া (আরবিতে)
الجواب: لا يجوز للمرأة أن تهجر والدي زوجها هجرانًا كاملًا، بل يجب عليها حفظ حرمتهم وإلقاء السلام عليهم والسؤال عنهم عند الحاجة، لأن الهجران الكامل للمسلم حرام كما في الحديث: «لا يحل لمسلم أن يهجر أخاه فوق ثلاث ليال» (صحيح البخاري: ٦٠٧٧). نعم، يجوز لها أن تقلل الكلام معهم وتتباعد عن مجالس الخصام والفتنة إذا كانوا يظلمونها ويؤذونها، بشرط أن لا تترك السلام والكلام الضروري وحقوقهم الشرعية. وعليها أن تصبر وتحتسب، وتشتكي إلى الله، وتذكر زوجها بأسلوب حسن لا بالتشاجر، ولا تدعُ عليهم بل تدعُ لهم بالهداية. والله أعلم.
References (Hanafi Kitab)
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ৬ — কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা: হিজরানের বিধান ও শর্ত।
- ফাতাওয়া আলমগিরি (ফাতাওয়া হিন্দিয়া), খণ্ড ৫ — কিতাবুল কারাহিয়্যাহ: আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিধান।
- আল-হিদায়া (মারগিনানি), কিতাবুল আদব — আত্মীয় ও প্রতিবেশীর হক।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী), খণ্ড ৪ — পারিবারিক কলহ ও শ্বশুর-শাশুড়ির হক সম্পর্কে।
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি), খণ্ড ২ — পারিবারিক সম্পর্ক ও হিজরান প্রসঙ্গে।
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি), সূরা বনী ইসরাইল ২৩-২৪ ও সূরা শূরা ৪০-এর তাফসির।
- সহীহ বুখারী: ১৮৯৪, ৫৬৪১, ৬০৭৭; সহীহ মুসলিম: ২৫৫১, ২৫৬০, ২৫৭৩।
আল্লাহ ভালো জানেন।