স্বামীকে "তুমি আরেকটা বিয়ে করলে আমি মাফ করব না" বলা কি কুফরি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্নোক্ত কথাটি কুফরি নয়
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, প্রশ্নোক্ত কথাটি কুফরি নয়। এটি কুফরি বা ঈমান-বিধ্বংসী কোনো উক্তি নয়; বরং এটি স্ত্রীর অভিমান ও অসন্তোষ প্রকাশের একটি কথামাত্র। তবে এ ধরনের কথা বলা বা স্বামীর বৈধ অধিকারকে চ্যালেঞ্জ করা ইসলামে পছন্দনীয় নয় এবং স্ত্রীর জন্য সংযত থাকা কর্তব্য।
১. কুফরি কী এবং এর সীমা
কুফরি হলো আল্লাহ তাআলা, রাসূলুল্লাহ ﷺ বা দ্বীনের অকাট্য বিষয়কে অস্বীকার করা, অবমাননা করা বা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ ۚ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ
"আর যদি আপনি তাদের জিজ্ঞেস করেন, তারা বলবে: আমরা তো শুধু কথা-বার্তা ও হাসি-তামাশা করছিলাম। বলুন: তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে বিদ্রূপ করছিলে? অজুহাত দেখিও না; তোমরা ঈমান আনার পর কুফরি করে ফেলেছ।" — (সূরা তাওবা: ৬৫-৬৬)
অর্থাৎ কুফরি হয় তখনই, যখন আল্লাহ বা তাঁর দ্বীনের কোনো বিধানকে অস্বীকার, অবজ্ঞা বা ঠাট্টা করা হয়। প্রশ্নোক্ত কথায় আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার করা হয়নি; বরং স্ত্রী তার অভিমান প্রকাশ করেছে মাত্র।
২. স্বামীর একাধিক বিয়ের অধিকার ও স্ত্রীর অনুভূতি
আল্লাহ তাআলা স্বামীকে শর্তসাপেক্ষে একাধিক বিয়ের অনুমতি দিয়েছেন:
فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً
"তোমরা বিবাহ করো নারীদের মধ্যে যাদের পছন্দ হয়—দুই, তিন বা চার। কিন্তু যদি আশঙ্কা করো যে, ইনসাফ করতে পারবে না, তবে একজনকেই।" — (সূরা নিসা: ৩)
এটি আল্লাহর দেওয়া বৈধ অধিকার। তবে এটি কোনো বাধ্যতামূলক আদেশ নয়; বরং অনুমতি। আর ইনসাফের শর্তে তা সীমিত।
স্ত্রীর পক্ষ থেকে "তুমি আরেকটা বিয়ে করলে আমি মাফ করব না" বলা—এটি তার ব্যক্তিগত অনুভূতি ও অভিমানের প্রকাশ। এতে আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার বা অবমাননা করা হয় না; বরং সে তার নিজের অসন্তোষ জানাচ্ছে। তাই এটি কুফরি নয়, ঈমান-বিধ্বংসীও নয়।
৩. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফি ফিকহে কুফরির সংজ্ঞা ও শর্তাবলি আলোচনা করতে গিয়ে ফকিহগণ স্পষ্ট করেছেন যে, কুফরি হয় কেবল তখনই, যখন আল্লাহ বা রাসূল ﷺ-এর প্রতি অবিশ্বাস, অস্বীকার বা অবমাননা প্রকাশ পায়। ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ "বাবুল ইস্তিহযা" ও কুফরির আলোচনায় উল্লেখ করেছেন যে, কোনো মুসলিমের কথা বা কাজকে কুফরি বলতে হলে তাতে দ্বীনের অকাট্য বিষয়ের প্রতি অবজ্ঞা বা অস্বীকার থাকতে হবে; নিছক অভিমান, রাগ বা ব্যক্তিগত অসন্তোষ কুফরি নয়। (রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২০-২২৫ প্রসঙ্গ)
আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বেহেশতী জেওর-এ এবং ইমদাদুল ফাতাওয়া-য় কুফরির আলোচনায় স্পষ্ট করেছেন যে, কুফরি ও গুনাহের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে; প্রতিটি গুনাহ বা প্রতিটি কঠোর কথা কুফরি নয়। (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/৩৫০ প্রসঙ্গ; বেহেশতী জেওর, ঈমান-কুফর অধ্যায়)
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) মাআরিফুল কুরআন-এ সূরা তাওবার ৬৫-৬৬ আয়াতের তাফসীরে উল্লেখ করেছেন যে, কুফরি হয় দ্বীনের মৌলিক বিষয়ের প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রূপ বা অস্বীকারের মাধ্যমে; ব্যক্তিগত রাগ-অভিমানের কথা কুফরি নয়। (মাআরিফুল কুরআন: ৪/৩৬০ প্রসঙ্গ)
৪. তবে এ ধরনের কথা বলা কি ঠিক?
যদিও এটি কুফরি নয়, তবুও স্ত্রীর জন্য এ ধরনের কঠোর কথা বলা বা স্বামীর বৈধ অধিকারকে চ্যালেঞ্জ করা ইসলামে পছন্দনীয় নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ تَسْأَلَ زَوْجَهَا الطَّلَاقَ
"যে নারী আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, তার জন্য বৈধ নয় যে, সে তার স্বামীর কাছে তালাক চাইবে।" — (সুনানে আবু দাউদ: ২১৭৪; সুনানে তিরমিজি: ১১৮৭)
অন্য হাদিসে এসেছে:
أَيُّمَا امْرَأَةٍ سَأَلَتْ زَوْجَهَا الطَّلَاقَ مِنْ غَيْرِ بَأْسٍ فَحَرَامٌ عَلَيْهَا رِيحُ الْجَنَّةِ
"যে নারী কোনো কারণ ছাড়াই তার স্বামীর কাছে তালাক চায়, তার জন্য জান্নাতের সুগন্ধি হারাম হয়ে যায়।" — (সুনানে আবু দাউদ: ২২২৬; সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৫৫)
তবে প্রশ্নোক্ত কথাটি তালাক চাওয়া নয়; বরং ভবিষ্যতে দ্বিতীয় বিয়ে করলে মাফ না করার ঘোষণা। এটি অভিমানের কথা। স্ত্রীর উচিত সংযত থাকা, স্বামীর সাথে সদাচরণ করা এবং নিজের অনুভূতি শালীনভাবে প্রকাশ করা। আর স্বামীর উচিত স্ত্রীর অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো এবং তার সম্মতি ও সন্তুষ্টি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ের মতো সিদ্ধান্ত না নেওয়া—যদিও তা বৈধ, তবুও পারিবারিক শান্তি ও ইনসাফের দিক থেকে সতর্কতা কাম্য।
৫. উপসংহার
- প্রশ্নোক্ত কথাটি কুফরি নয়, ঈমান-বিধ্বংসীও নয়।
- এটি অভিমান ও অসন্তোষ প্রকাশের একটি কথামাত্র; আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার বা অবমাননা করা হয়নি।
- তবে স্ত্রীর জন্য এ ধরনের কঠোর কথা বলা উচিত নয়; সংযত থাকা ও শালীনভাবে অনুভূতি প্রকাশ করা কর্তব্য।
- স্বামীরও উচিত স্ত্রীর অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো এবং পারিবারিক শান্তি রক্ষা করা।
তবে সতর্কতা: যদি কেউ আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার করে বলে যে, "একাধিক বিয়ে করা ইসলামে বৈধ নয়" বা "আল্লাহর এই বিধান ভুল/অন্যায়"—তাহলে তা কুফরি হবে। কিন্তু প্রশ্নোক্ত কথায় তা নেই; বরং ব্যক্তিগত অভিমান প্রকাশ পেয়েছে মাত্র।
সংক্ষিপ্ত সারমর্ম
স্বামীকে "তুমি আরেকটা বিয়ে করলে আমি মাফ করব না" বলা কুফরি নয়; এটি অভিমানের কথা। আল্লাহ স্বামীকে একাধিক বিয়ের অনুমতি দিলেও তা বাধ্যতামূলক নয়, এবং স্ত্রীর অনুভূতির প্রতি সম্মান রাখা কর্তব্য। তবে আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার বা অবমাননা করলেই কুফরি হবে—নিছক অভিমান বা অসন্তোষে নয়।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।