সহিহ বুখারির হাদিসে আবু বকর (রা.) কর্তৃক দেবী (লাত)কে গালি দেওয়ার বর্ণনা আছে কি? মুশরিকদের উপাস্যদের গালি দেওয়ার হুকুম কি কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে?
Faith and Belief · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
সহিহ বুখারি ২৭৩১ নম্বর হাদিসের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
সহীহ বুখারীর ২৭৩১ নম্বর হাদীসে বর্ণিত হুদাইবিয়ার সন্ধির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর উক্তি এবং ইসলামে অনর্থক বা সাধারণ অবস্থায় কাফেরদের দেব-দেবীকে গালমন্দ করার শরয়ী বিধান নিচে বিস্তারিত উপস্থাপন করা হলো:
১. সাধারণ অবস্থায় কাফেরদের উপাস্য ও দেব-দেবীকে গালি দেওয়ার শরয়ী বিধান:
- সাধারণ নিয়ম (নিষিদ্ধ): ইসলামি শরীআতে সাধারণ অবস্থায় কোনো অমুসলিম বা কাফেরদের দেব-দেবী ও পূজনীয় বস্তুকে গালমন্দ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও নাজায়েয।
- কুরআনের অকাট্য নির্দেশ:
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:«وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ»
(অর্থ: "তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে যাদের তারা ডেকে থাকে (উপাসনা করে), তাদেরকে গালমন্দ করো না; তা না হলে তারা না জেনে শত্রুতাবশত আল্লাহকেও গালমন্দ করবে।") [সূরা আল-আন'আম: ১০৮] - ফিকহী মূলনীতি (সাদ্দুদ যারায়ে):
ফিকহে হানাফীর মূলনীতি অনুযায়ী—যে কাজের ফলে কাফেররা আল্লাহ তা'আলা বা দ্বীনকে গালমন্দ করার সুযোগ পাবে, সে কাজ করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
(গ্রন্থসূত্র: দরসুল ফিকহ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৯০)।
২. সহীহ বুখারীর (২৭৩১) হাদীসের প্রেক্ষাপট ও ঘটনার বিবরণ:
হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় কুরাইশদের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হয়ে এসেছিল উরওয়া ইবনে মাসুদ ছাকাফী। সে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবায়ে কেরামকে মানসিক চাপ দেওয়া এবং হেয় করার উদ্দেশ্যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভাষায় বলেছিল:
"হে মুহাম্মদ! তুমি কি তোমার স্বজাতিকে ধ্বংস করতে চাও? আর যদি পরিস্থিতি উল্টো হয়, তবে আল্লাহর কসম! আমি তোমার চারপাশে এমন সব চেহারা ও অখ্যাত লোকজন দেখছি, যারা যুদ্ধের সময় তোমাকে ছেড়ে পালিয়ে যাবে।"
সাহাবায়ে কেরামের অকৃত্রিম ঈমান, ভালোবাসা ও ত্যাগের প্রতি এই চরম মিথ্যা ও অবমাননাকর বক্তব্যের জবাবে হযরত আবু বকর (রা.) অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে অনাচারী ও বাতেলের অহংকার চূর্ণ করার জন্য তৎকালীন আরবের প্রবাদতুল্য শক্ত ভাষায় প্রতিবাদ করে বলেছিলেন:
«امْصُصْ بَظْرَ اللَّاتِ، أَنَحْنُ نَدَعُهُ وَنَنَّخِلِي عَنْهُ؟»
(অর্থ: "যা, গিয়ে 'লাত' (দেবী)-এর চুষে নে! আমরা কি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে ছেড়ে পালিয়ে যাব?")
৩. মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে হযরত আবু বকর (রা.)-এর এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা ও বৈধতা:
মুহাদ্দিসীন ও ফুকাহায়ে কেরাম (যেমন: হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী ও আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রাহ.) এই হাদীসের ব্যাখ্যায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী দিক স্পষ্ট করেছেন:
১. বাতেলের অহংকার চূর্ণ করা: উরওয়া যখন সাহাবায়ে কেরামকে হেয় করছিল এবং নিজের জাহেলী সমাজ ও মূর্তিপূজার অহংকার দেখাচ্ছিল, তখন হযরত আবু বকর (রা.) তাদের কথিত দেবী 'লাত'-এর আসল অসারতা ও অপমানজনক রূপ উরওয়ার সামনে তুলে ধরেন। ২. রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নীরব সমর্থন: হযরত আবু বকর (রা.) যখন এই চরম কঠোর বাক্যটি বলেন, তখন সেখানে উপস্থিত রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে বারণ করেননি বা এটি বলাকে অন্যায় বলেননি। ৩. বিশেষ পরিস্থিতিতে বাতেলকে লাঞ্ছিত করার অনুমতি: বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম বলেন—সাধারণ অবস্থায় গালি দেওয়া নিষিদ্ধ হলেও, যখন কোনো কাফের বা শত্রু প্রকাশ্যে রাসুলুল্লাহ (ﷺ), ইসলাম বা মুসলিমদের চরম অবমাননা করে, তখন তার অহংকার চূর্ণ করতে এবং তার অসার মূর্তির হাকীকত প্রকাশ করতে কঠোর ভাষা প্রয়োগ করা শরীআতে জায়েয।
সারসংক্ষেপ:
- অনর্থক বা সাধারণ অবস্থায় অমুসলিমদের দেব-দেবীকে গালি দেওয়া শরীআতে হারাম ও নিষিদ্ধ [১৪]।
- তবে বুখারীর ২৭৩১ নম্বর হাদীসের ঘটনাটি কোনো সাধারণ গালিগালাজ ছিল না; বরং তা ছিল সত্যের চরম অবমাননার জবাবে বাতেলকে লাঞ্ছিত করা এবং রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর ডিফেন্স (সুরক্ষা) করার একটি ব্যতিক্রমী ও বিশেষ প্রেক্ষাপট। এটি সাধারণ জীবনে গালি দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে না, বরং বাতেলের ঔদ্ধত্য চূর্ণ করার বিশেষ উদাহরণ।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর: ১. দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৯০: (অধ্যায়: নিষিদ্ধের মাধ্যম ও সাদ্দুদ যারায়ে — মূর্তিপূজারীদের সামনে মূর্তিকে গালমন্দ করার ফিকহী নিষেধাজ্ঞা)।
আল্লাহ ভালো জানেন।